তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প: তাপের জাদুতে পদার্থের বদল
তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ৪: পদার্থ
অধ্যায় ৭: তাপের জাদুতে পদার্থের বদল
লেখক: আশরাফ উল আসাদ
সেদিন বিজ্ঞান ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই সবাই ফারজানা মরিয়ম ম্যাডামের টেবিলের দিকে তাকিয়ে ছিল।
টেবিলের ওপর একটি স্বচ্ছ গ্লাস, একটি বাটিতে বরফ, একটি পানির বোতল এবং কয়েকটি বেলুন রাখা ছিল।
নুসরাত জাহান বলল, “ম্যাডাম আজ নিশ্চয়ই আবার কোনো পরীক্ষা করবেন।”
আনিশা মারজান বলল, “গত ক্লাসের প্রশ্নটার উত্তরও হয়তো আজ পাব।”
মেফতাহুল জান্নাত গম্ভীর মুখে বলল, “আমি কিন্তু আজ কোনো বেলুন ফাটার পরীক্ষায় অংশ নেব না।”
আবাবিল আল আলিফ হেসে বলল, “তুমি তো গতবার নিজেই বেলুন নিয়ে খেলতে গিয়ে সেটি ফাটিয়েছিলে!”
মেফতাহুল বলল, “সেটা ছিল বৈজ্ঞানিক দুর্ঘটনা!”
সবাই হেসে উঠল।
ঠিক তখনই ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেন।
তিনি বললেন, “আজ আমরা জানব, তাপ কীভাবে পদার্থের অবস্থার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।”
সাফুয়ান বলল, “মানে বরফ, পানি আর বাষ্পের গল্প?”
“ঠিক তাই,” বললেন ম্যাডাম।
বরফের প্রথম রহস্য
ম্যাডাম বাটির ভেতর থেকে একটি বরফের টুকরো তুলে ধরলেন।
“এটি কোন ধরনের পদার্থ?”
সবাই একসঙ্গে বলল, “কঠিন পদার্থ!”
“কেন?”
আসাদুল্লাহ আল গালিব বলল, “কারণ এর নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন আছে।”
ম্যাডাম বললেন, “খুব ভালো।”
তিনি বরফের টুকরোটি একটি প্লেটে রেখে দিলেন।
“এখন কেউ এটিকে স্পর্শ করবে না। শুধু পর্যবেক্ষণ করবে।”
মরিয়ম আক্তার বলল, “কিন্তু কিছুক্ষণ পর তো বরফ গলে যাবে।”
“ঠিক,” বললেন ম্যাডাম।
“এখন প্রশ্ন হলো—কেন?”
অপেক্ষার পরীক্ষা
সবাই চুপ করে বরফের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক মিনিট পর নুসরাত বলল, “বরফের গায়ে পানি দেখা যাচ্ছে!”
ম্যাডাম বললেন, “তোমরা কী মনে করছ?”
আনিশা বলল, “বরফ গলছে।”
“কঠিন বরফ তরল পানিতে পরিণত হচ্ছে।”
ম্যাডাম বোর্ডে লিখলেন—
কঠিন → তরল
তার নিচে লিখলেন—
বরফ → পানি
তিনি বললেন, “পরিবেশ থেকে তাপ পাওয়ার কারণে বরফ গলে যেতে পারে।”
তাপ কোথা থেকে আসে?
আবু তালহা হাত তুলে বলল, “ম্যাডাম, তাপ কোথা থেকে আসে?”
“খুব ভালো প্রশ্ন,” বললেন ম্যাডাম।
“সূর্য আমাদের পৃথিবীর প্রধান তাপের উৎসগুলোর একটি।”
“এছাড়া আগুন, চুলা, বৈদ্যুতিক যন্ত্রসহ বিভিন্ন উৎস থেকেও তাপ পাওয়া যায়।”
ম্যাডাম জানালার বাইরে সূর্যের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “সূর্যের তাপ আমাদের চারপাশের অনেক পরিবর্তনের পেছনে কাজ করে।”
নুসরাত বলল, “তাই রোদে রাখা বরফ দ্রুত গলে যায়?”
“হ্যাঁ।”
পানি থেকে বাষ্প
ম্যাডাম এবার একটি পাত্রে পানি নিলেন।
নিরাপদভাবে পানি গরম করার ব্যবস্থা করা হলো।
শিক্ষার্থীরা দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর পানির ওপর থেকে বাষ্প উঠতে দেখা গেল।
সাফুয়ান বলল, “পানি থেকে বাষ্প তৈরি হচ্ছে!”
ম্যাডাম বললেন, “হ্যাঁ।”
“পানি তাপ পেলে তার কিছু অংশ জলীয় বাষ্পে পরিণত হতে পারে।”
তিনি বোর্ডে লিখলেন—
তরল → বায়বীয়
মেফতাহুল বলল, “পানি তাহলে আকাশে উড়ে গেল!”
ম্যাডাম হেসে বললেন, “বৈজ্ঞানিকভাবে বললে পানি জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসে মিশে যেতে পারে।”
অদৃশ্য ভ্রমণকারী
ম্যাডাম বললেন, “জলীয় বাষ্প সাধারণত চোখে দেখা যায় না।”
আবাবিল বলল, “কিন্তু গরম পানির ওপর সাদা সাদা কিছু দেখা যায়!”
ম্যাডাম বললেন, “গরম পানির ওপর যে সাদা মেঘের মতো অংশ দেখা যায়, তার মধ্যে ক্ষুদ্র পানিকণা থাকতে পারে।”
“জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হলে পানির ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে।”
মরিয়ম বলল, “অর্থাৎ পানি যেন অদৃশ্য হয়ে আবার অন্যভাবে ফিরে আসে!”
ম্যাডাম বললেন, “তোমার কথাটা সুন্দর।”
ঠান্ডা ঢাকনার পরীক্ষা
ম্যাডাম এবার একটি ঠান্ডা ধাতব ঢাকনা গরম পানির পাত্রের ওপরে ধরলেন।
কিছুক্ষণ পর ঢাকনার নিচে ছোট ছোট পানির ফোঁটা দেখা গেল।
নুসরাত বলল, “ম্যাডাম, এখানে পানি এল কীভাবে?”
ম্যাডাম বললেন, “গরম পানি থেকে তৈরি হওয়া জলীয় বাষ্প ঠান্ডা ঢাকনার সংস্পর্শে এসে আবার পানিতে পরিণত হয়েছে।”
সাফুয়ান বলল, “তাহলে বায়বীয় → তরল!”
“ঠিক।”
তিন ধাপের গল্প
ম্যাডাম বোর্ডে একটি বড় তীরচিহ্ন আঁকলেন।
তিনি লিখলেন—
বরফ → পানি → জলীয় বাষ্প
তারপর নিচে লিখলেন—
কঠিন → তরল → বায়বীয়
তিনি বললেন, “এই তিনটি অবস্থার মধ্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে।”
আসাদুল্লাহ বলল, “আবার উল্টো দিকেও যেতে পারে?”
“অবশ্যই,” বললেন ম্যাডাম।
“জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে পানি হতে পারে এবং পানি আরও ঠান্ডা হলে বরফ হতে পারে।”
ফ্রিজের রহস্য
মরিয়ম বলল, “ম্যাডাম, আমাদের বাসায় ফ্রিজে পানি রেখে বরফ বানানো হয়।”
“ঠিক।”
“তাহলে ঠান্ডা করার ফলে পানি কঠিন অবস্থায় যায়।”
ম্যাডাম বললেন, “সঠিক।”
আবু তালহা বলল, “আর ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে রাখলে সেটি আবার গলে পানি হয়।”
“হ্যাঁ।”
“এটাই কঠিন ও তরল অবস্থার পরিবর্তনের সহজ উদাহরণ।”
মেফতাহুলের নতুন আবিষ্কার
মেফতাহুল হঠাৎ হাত তুলল।
“ম্যাডাম, আমার একটা আবিষ্কার হয়েছে!”
ম্যাডাম বললেন, “কী আবিষ্কার?”
“গরম চা ঠান্ডা হয়, বরফ গরম হলে গলে যায়, পানি গরম হলে বাষ্প হয়!”
ম্যাডাম বললেন, “খুব ভালো।”
মেফতাহুল বলল, “তাহলে তাপমাত্রা পরিবর্তন হলে পদার্থও বদলাতে পারে!”
ম্যাডাম বললেন, “তুমি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বুঝতে পেরেছ।”
“তবে মনে রাখবে, সব পদার্থ একই তাপমাত্রায় একইভাবে পরিবর্তিত হয় না।”
রোদে কাপড় শুকানো
ম্যাডাম এবার একটি দৈনন্দিন উদাহরণ দিলেন।
“তোমরা কি দেখেছ, ধোয়া কাপড় রোদে শুকিয়ে যায়?”
সবাই বলল, “হ্যাঁ।”
“কাপড়ের পানি কোথায় যায়?”
নুসরাত বলল, “বাতাসে চলে যায়।”
ম্যাডাম বললেন, “পানির একটি অংশ বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসে মিশে যায়।”
আনিশা বলল, “তাই কাপড় শুকিয়ে যায়!”
“ঠিক।”
ভেজা মেঝে
সাফুয়ান বলল, “মেঝেতে পানি পড়লে কিছুক্ষণ পর সেটিও শুকিয়ে যায়।”
ম্যাডাম বললেন, “এটিও একই ধরনের ঘটনা।”
“পানি ধীরে ধীরে বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসে মিশে যেতে পারে।”
আবাবিল বলল, “তাহলে পানি শুধু চুলায় গরম করলেই বাষ্প হয় না?”
ম্যাডাম বললেন, “ঠিক।”
“স্বাভাবিক পরিবেশেও পানির কিছু অংশ ধীরে ধীরে বাষ্পে পরিণত হতে পারে।”
মেঘের দিকে তাকিয়ে
ম্যাডাম সবাইকে জানালার কাছে নিয়ে গেলেন।
আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে।
তিনি বললেন, “প্রকৃতিতে পানির অবস্থার পরিবর্তন সব সময় চলছে।”
“সূর্যের তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হতে পারে।”
“সেই জলীয় বাষ্প ওপরে উঠে ঠান্ডা হয়ে ক্ষুদ্র পানিকণায় পরিণত হতে পারে।”
“এই পানিকণাগুলো মিলে মেঘ তৈরি করতে পারে।”
নুসরাত বলল, “আর পরে বৃষ্টি হতে পারে!”
ম্যাডাম বললেন, “ঠিক।”
একটি ছোট পরীক্ষা
ম্যাডাম প্রত্যেক দলকে একটি করে স্বচ্ছ গ্লাস দিলেন।
গ্লাসে কিছু বরফ ও পানি রাখা হলো।
তিনি বললেন, “এবার গ্লাসের বাইরের অংশ ভালো করে দেখো।”
কিছুক্ষণ পর গ্লাসের বাইরে ছোট ছোট পানির ফোঁটা জমতে শুরু করল।
আনিশা অবাক হয়ে বলল, “গ্লাসের বাইরে পানি!”
ম্যাডাম বললেন, “অনেকে মনে করতে পারে গ্লাসের ভেতরের পানি বাইরে চলে এসেছে।”
“কিন্তু আসলে বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প ঠান্ডা গ্লাসের সংস্পর্শে এসে পানির ফোঁটায় পরিণত হতে পারে।”
আসাদুল্লাহ বলল, “অর্থাৎ পানি তৈরি হয়নি, বাতাসের জলীয় বাষ্প তরল পানিতে পরিণত হয়েছে!”
“চমৎকার পর্যবেক্ষণ,” বললেন ম্যাডাম।
বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা
ম্যাডাম সবাইকে সতর্ক করে বললেন, “তাপ নিয়ে পরীক্ষা করার সময় অবশ্যই বড়দের সাহায্য নিতে হবে।”
“গরম পানি, আগুন বা গরম পাত্র নিজেরা ধরবে না।”
সবাই বলল, “ঠিক আছে।”
মেফতাহুল বলল, “আমি আজ থেকে নিরাপদ বিজ্ঞানী!”
ম্যাডাম বললেন, “এটাই চাই।”
বিজ্ঞান ডায়েরিতে আজকের শিক্ষা
ক্লাস শেষ হওয়ার আগে সবাই তাদের বিজ্ঞান ডায়েরি খুলল।
নুসরাত লিখল, “তাপ পেলে বরফ গলে পানি হতে পারে।”
আনিশা লিখল, “পানি তাপ পেলে জলীয় বাষ্পে পরিণত হতে পারে।”
আবাবিল লিখল, “জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হলে পানিতে পরিণত হতে পারে।”
সাফুয়ান লিখল, “পানি ঠান্ডা হলে বরফ হতে পারে।”
আসাদুল্লাহ লিখল, “প্রকৃতিতেও পানির অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।”
ম্যাডাম সবার লেখা দেখে বললেন, “আজকের পাঠ তোমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত।”
নতুন রহস্য
সবাই যখন ক্লাস থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ম্যাডাম আবার বোর্ডে একটি প্রশ্ন লিখলেন—
“পদার্থের পরিবর্তন কি সব সময় স্থায়ী হয়?”
মরিয়ম বলল, “বরফ তো আবার পানি হয়, আবার পানি থেকে বরফও হতে পারে!”
নুসরাত বলল, “তাহলে কিছু পরিবর্তন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।”
ম্যাডাম বললেন, “ঠিক।”
“কিন্তু সব পরিবর্তন কি এমন?”
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
ম্যাডাম বললেন, “এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের আরও কিছু পরীক্ষা করতে হবে।”
মেফতাহুল বলল, “বিজ্ঞানের রহস্য তো শেষই হয় না!”
ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম মুচকি হেসে বললেন, “বিজ্ঞান যত শিখবে, তত নতুন প্রশ্ন জন্ম নেবে।”
শিক্ষার্থীরা নতুন কৌতূহল নিয়ে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
বোর্ডে রয়ে গেল সেই প্রশ্নটি—
“পদার্থের পরিবর্তন কি সব সময় স্থায়ী হয়?”
চলবে...
📝 অধ্যায় ৭: MCQ
১. বরফ তাপ পেলে সাধারণত কী হয়?
ক) পানি হয়
খ) পাথর হয়
গ) মাটি হয়
ঘ) কাঠ হয়
২. পানি তাপ পেলে কী হতে পারে?
ক) বরফ
খ) জলীয় বাষ্প
গ) মাটি
ঘ) পাথর
৩. জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হলে কী হতে পারে?
ক) পানি
খ) কাঠ
গ) বালি
ঘ) লোহা
৪. ফ্রিজে পানি রাখলে কী হতে পারে?
ক) পানি বাষ্প হয়ে যায়
খ) পানি বরফে পরিণত হয়
গ) পানি অদৃশ্য হয়ে যায়
ঘ) পানি বাতাসে পরিণত হয়
৫. রোদে ভেজা কাপড় শুকায় কেন?
ক) পানি বরফ হয়ে যায়
খ) পানি বাষ্পে পরিণত হয়
গ) কাপড় পানি তৈরি করে
ঘ) বাতাস কঠিন হয়ে যায়
৬. ঠান্ডা গ্লাসের বাইরে পানির ফোঁটা জমার একটি কারণ কী?
ক) গ্লাস পানি তৈরি করে
খ) জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে পানি হয়
গ) গ্লাসের পানি বাইরে বের হয়
ঘ) বাতাস কঠিন হয়
৭. বরফ থেকে পানি হওয়ার পরিবর্তনটি কোনটি?
ক) তরল → কঠিন
খ) কঠিন → তরল
গ) গ্যাস → কঠিন
ঘ) গ্যাস → তরল
৮. পানি থেকে জলীয় বাষ্প হওয়ার পরিবর্তনটি কোনটি?
ক) কঠিন → তরল
খ) তরল → বায়বীয়
গ) বায়বীয় → তরল
ঘ) কঠিন → বায়বীয়
৯. পানির অবস্থার পরিবর্তনে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে?
ক) তাপমাত্রা
খ) রং
গ) শব্দ
ঘ) গন্ধ
১০. গরম পানি নিয়ে পরীক্ষা করার সময় কী করা উচিত?
ক) নিজেরা গরম পাত্র ধরা
খ) নিরাপত্তা মেনে বড়দের সহায়তা নেওয়া
গ) গরম পানি নিয়ে দৌড়ানো
ঘ) আগুনের কাছে খেলা করা
উত্তরমালা:
১. ক | ২. খ | ৩. ক | ৪. খ | ৫. খ | ৬. খ | ৭. খ | ৮. খ | ৯. ক | ১০. খ