তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ১: অধ্যায় ২: মাটির নিচে লুকানো হাত
পরদিন সকাল।
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই ফারজানা মরিয়মের চারপাশে জড়ো হয়ে গেল।
গতকালের ক্লাসের পর থেকেই তাদের মাথায় ঘুরছে একটি প্রশ্ন—
“মাটির নিচে থাকা মূল আসলে কী করে?”
নুসরাত জাহান বলল,
“ম্যাডাম, আজ কিন্তু আমরা গাছের নিচে কী আছে সেটা দেখব, তাই তো?”
ফারজানা মরিয়ম মুচকি হেসে বললেন,
“দেখব। তবে তার আগে তোমাদের একটা রহস্য সমাধান করতে হবে।”
আনিশা মারজান উত্তেজিত হয়ে বলল,
“কী রহস্য?”
ফারজানা মরিয়ম টেবিলের ওপর তিনটি জিনিস রাখলেন—একটি গ্লাস পানি, একটি ছোট গাছের চারা এবং এক মুঠো শুকনো মাটি।
তিনি বললেন,
“ধরো, এই গাছটিকে আমরা কয়েক দিন পানি দিলাম না। কী হবে?”
মরিয়ম আক্তার বলল,
“গাছ শুকিয়ে যাবে।”
“কেন?”
“কারণ গাছের পানি দরকার।”
“ঠিক। কিন্তু গাছ পানি পায় কীভাবে?”
সবাই একসঙ্গে বলল,
“মূল দিয়ে!”
ফারজানা মরিয়ম হাসলেন।
“তাহলে আজ আমরা সেই রহস্যময় অঙ্গটিকেই অনুসরণ করব।”
মাটির নিচের অদৃশ্য জগৎ
সবাই স্কুলের বাগানে গেল।
একটি ছোট্ট ঘাসের গাছের সামনে দাঁড়িয়ে ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“এখন বলো তো, এই গাছটির কতটুকু আমরা দেখতে পাচ্ছি?”
শিক্ষার্থীরা তাকিয়ে দেখল।
মেফতাহুল জান্নাত বলল,
“উপরে যা আছে, সবটাই দেখা যাচ্ছে।”
“সবটা?”
মেফতাহুল একটু থেমে বলল,
“আচ্ছা... হয়তো নিচে কিছু আছে!”
“ঠিক ধরেছ।”
ফারজানা মরিয়ম মাটির ওপরের অংশ দেখিয়ে বললেন,
“আমরা গাছের কাণ্ড, পাতা বা ফুল দেখতে পাই। কিন্তু মাটির নিচে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে, যেটি সাধারণত আমাদের চোখে দেখা যায় না।”
আবাবিল আল আলিফ বলল,
“মূল!”
“ঠিক।”
ছোট্ট গাছ উপড়ে ফেলা
ফারজানা মরিয়ম বাগানের একটি ছোট আগাছা সাবধানে মাটি থেকে তুলে আনলেন।
শিক্ষার্থীরা অবাক হয়ে গেল।
গাছটির ওপরের অংশ খুব ছোট।
কিন্তু নিচে?
অনেকগুলো চিকন শিকড় চারদিকে ছড়িয়ে আছে!
সাফুয়ান অবাক হয়ে বলল,
“ওহ! এত বড় মূল!”
আসাদুল্লাহ আল গালিব বলল,
“আমি তো ভাবতাম মাটির নিচে শুধু একটা লম্বা শিকড় থাকে।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“অনেক উদ্ভিদের মূল একটিমাত্র সরল দণ্ডের মতো নয়। মূলের বিভিন্ন অংশ মাটির ভেতরে ছড়িয়ে থাকতে পারে।”
আবু তালহা শিকড়গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ম্যাডাম, এগুলো দেখতে তো গাছের হাতের মতো!”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“চমৎকার! মূলকে তোমরা গাছের মাটির নিচের হাত হিসেবে কল্পনা করতে পারো। তবে মনে রেখো, এটি সত্যিকারের হাত নয়।”
সবাই হেসে উঠল।
প্রথম কাজ—গাছকে ধরে রাখা
ফারজানা মরিয়ম এবার একটি ছোট গাছের কাণ্ড ধরে খুব আলতো করে নাড়লেন।
গাছটি নড়ল, কিন্তু মাটি ছেড়ে উঠে এল না।
তিনি বললেন,
“কেন গাছটি সহজে উঠে আসছে না?”
নুসরাত বলল,
“কারণ এর মূল মাটির সঙ্গে আটকে আছে।”
“ঠিক। মূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো গাছকে মাটিতে শক্তভাবে ধরে রাখা।”
মরিয়ম বলল,
“তাহলে ঝড় এলে মূল গাছকে বাঁচাতে সাহায্য করে?”
“হ্যাঁ। শক্তিশালী মূল গাছকে মাটিতে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করে।”
মেফতাহুল সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“তাহলে গাছের মূল হলো তার সিটবেল্ট!”
ফারজানা মরিয়ম হেসে বললেন,
“তুলনাটা মজার! মূল গাছকে মাটিতে স্থির রাখতে সাহায্য করে—এই কথাটা মনে রাখবে।”
দ্বিতীয় রহস্য—পানি কোথায় গেল?
এবার ফারজানা মরিয়ম একটি স্বচ্ছ গ্লাসে পানি নিলেন।
তিনি বললেন,
“এবার একটা কল্পনা করো। আমরা যদি গাছের চারপাশের মাটিতে পানি দিই, সেই পানি কোথায় যায়?”
সাফুয়ান বলল,
“মাটির ভেতরে।”
“তারপর?”
নুসরাত বলল,
“মূল সেই পানি গ্রহণ করে।”
“ঠিক।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“মূল মাটি থেকে পানি শোষণ করে। একই সঙ্গে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খনিজ উপাদান গ্রহণেও সাহায্য করে।”
আনিশা বলল,
“মানে গাছের খাবার সংগ্রহের কাজের একটা অংশ মাটির নিচে হয়?”
“হ্যাঁ। তবে মনে রাখবে, উদ্ভিদ নিজের খাদ্য তৈরি করে। মাটি থেকে মূল মূলত পানি ও খনিজ উপাদান গ্রহণ করে।”
মাটির নিচে অনুসন্ধান
ফারজানা মরিয়ম এবার সবাইকে ছোট ছোট দলে ভাগ করলেন।
“আজ তোমরা তিনটি জিনিস খুঁজবে—”
তিনি আঙুল গুনে বললেন,
“এক—মাটির ওপরের গাছের অংশ।”
“দুই—মাটির নিচের মূল।”
“তিন—মূল কীভাবে চারদিকে ছড়িয়ে আছে।”
শিক্ষার্থীরা সাবধানে মাটির কাছাকাছি ছোট উদ্ভিদ পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
আবাবিল বলল,
“ম্যাডাম, মূলগুলো সাদা আর বাদামি—দুই রকম দেখছি।”
“উদ্ভিদের ভেদে মূলের চেহারা ও রং ভিন্ন হতে পারে।”
আসাদুল্লাহ বলল,
“কিছু মূল খুব সরু।”
“হ্যাঁ।”
“কিছু আবার মোটা।”
“ঠিক।”
মেফতাহুল একটি মূলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এগুলো এত ছোট ছোট শিকড় নিয়ে কী করছে?”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“মাটির ভেতর থেকে পানি ও খনিজ উপাদান গ্রহণের জন্য মূলের বিভিন্ন অংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”
একটি মজার ভুল
হঠাৎ আবু তালহা দৌড়ে এসে বলল,
“ম্যাডাম! আমি একটা বড় মূল পেয়েছি!”
সবাই ছুটে গেল।
দেখা গেল, মাটির ওপর পড়ে থাকা একটি শুকনো ডাল হাতে নিয়ে আবু তালহা দাঁড়িয়ে আছে।
ফারজানা মরিয়ম হাসতে হাসতে বললেন,
“এটা মূল নয়, এটা শুকনো ডাল!”
আবু তালহা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
“আমি ভেবেছিলাম গাছের গোপন হাত!”
সবাই হেসে উঠল।
ম্যাডাম বললেন,
“বিজ্ঞান শেখার সময় ভুল হওয়া কোনো সমস্যা নয়। বরং ভুল থেকেই আমরা সঠিক জিনিস চিনতে শিখি।”
মূল না থাকলে কী হতো?
ফারজানা মরিয়ম সবাইকে একটি প্রশ্ন করলেন,
“এবার তোমরা কল্পনা করো—একটি গাছের যদি মূল না থাকত, তাহলে কী হতো?”
নুসরাত বলল,
“গাছ মাটিতে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না।”
আনিশা বলল,
“মাটি থেকে পানি পাওয়া কঠিন হতো।”
আসাদুল্লাহ বলল,
“খনিজ উপাদানও গ্রহণ করতে পারত না।”
“খুব ভালো।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“তাই মূলকে আমরা উদ্ভিদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করি।”
একটি সহজ পরীক্ষা
ফারজানা মরিয়ম এবার শিক্ষার্থীদের একটি ছোট্ট কাজ দিলেন।
তিনি একটি স্বচ্ছ পাত্রে পানি নিলেন এবং পানিতে সামান্য রং মিশিয়ে দিলেন। এরপর একটি সাদা ফুলের ডাঁটা পানিতে রেখে দিলেন।
“এখন কী হবে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
মরিয়ম বলল,
“ফুলের রং বদলে যাবে?”
মেফতাহুল বলল,
“না হলে ফুলটা নীল জামা পরবে!”
সবাই হেসে উঠল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“আমরা কিছু সময় অপেক্ষা করব এবং পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করব। উদ্ভিদের ভেতরে পানি কীভাবে চলাচল করে, সেটি বোঝার জন্য এ ধরনের সহজ পর্যবেক্ষণ করা যায়।”
শিক্ষার্থীরা ফুলটির দিকে তাকিয়ে রইল।
বিজ্ঞানের রহস্য যেন তাদের চোখের সামনে ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে।
দিনের শেষ প্রশ্ন
ক্লাস শেষ হওয়ার আগে ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“আজকের শেষ প্রশ্ন। মূল কোথায় থাকে?”
সবাই বলল,
“সাধারণত মাটির নিচে!”
“মূলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ কী?”
নুসরাত বলল,
“গাছকে মাটিতে শক্ত করে ধরে রাখা।”
আনিশা বলল,
“মাটি থেকে পানি ও খনিজ উপাদান শোষণ করা।”
“অসাধারণ!”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“আজ তোমরা বুঝলে, প্রকৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ চোখের আড়ালে ঘটে। আমরা শুধু গাছের ওপরের অংশ দেখি। কিন্তু মাটির নিচে তার মূল নীরবে নিজের কাজ করে যায়।”
মরিয়ম আক্তার মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“ম্যাডাম, তাহলে গাছের অর্ধেক গল্প তো মাটির নিচে!”
ফারজানা মরিয়ম মৃদু হেসে বললেন,
“ঠিক তাই। আর আগামী দিনের গল্প হবে গাছের এমন একটি অংশ নিয়ে, যাকে ছাড়া গাছের পাতা, শাখা-প্রশাখা কিছুই ঠিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না।”
সাফুয়ান জিজ্ঞেস করল,
“কাণ্ড?”
ফারজানা মরিয়ম মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। এবার আমাদের অভিযান যাবে গাছের শক্ত মেরুদণ্ডের কাছে।”
শিক্ষার্থীদের চোখে আবার নতুন কৌতূহল।
বিজ্ঞান অভিযান থামল না।
চলবে...
আজকের শেখা
- মূল সাধারণত উদ্ভিদের মাটির নিচে থাকে।
- মূল উদ্ভিদকে মাটিতে শক্তভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
- মূল মাটি থেকে পানি ও খনিজ উপাদান শোষণ করে।
- বিভিন্ন উদ্ভিদের মূলের আকার ও গঠন ভিন্ন হতে পারে।
- উদ্ভিদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমাদের চোখের আড়ালে মাটির নিচে সম্পন্ন হয়।
লেখক: আশরাফ উল আসাদ