তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প: সরীসৃপের রহস্য
তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ২: প্রাণী পরিচিতি
অধ্যায় ৭: সরীসৃপের রহস্য
সকালের বিজ্ঞান ক্লাসে ঢুকেই ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম বোর্ডে একটি বড় প্রশ্ন লিখলেন।
“যে প্রাণী বুকে ভর দিয়ে চলে, তার নাম কী?”
মেফতাহুল জান্নাত সঙ্গে সঙ্গে বলল, “সাপ!”
সবাই হেসে উঠল।
ম্যাডাম বললেন, “শুধু সাপ নয়, আজ আমরা এমন একটি প্রাণী দলের সঙ্গে পরিচিত হব, যাদের অনেকেই মাটির কাছাকাছি থেকে চলাফেরা করে।”
নুসরাত জাহান বলল, “সরীসৃপ?”
ফারজানা মরিয়ম হাসলেন।
“একদম ঠিক। আজকের বিষয়—সরীসৃপ প্রাণী।”
সরীসৃপ কারা?
ম্যাডাম বোর্ডে লিখলেন—
সরীসৃপ
তিনি বললেন, “সরীসৃপ হলো মেরুদণ্ডী প্রাণীদের একটি প্রধান দল।”
আসাদুল্লাহ আল গালিব হাত তুলে বলল, “ম্যাডাম, সরীসৃপের দেহে কি মেরুদণ্ড থাকে?”
“হ্যাঁ। সরীসৃপ মেরুদণ্ডী প্রাণী।”
আবাবিল আল আলিফ বলল, “তাহলে সাপও মেরুদণ্ডী?”
“হ্যাঁ। সাপের দেহের ভেতরে মেরুদণ্ড আছে।”
মেফতাহুল বলল, “কিন্তু সাপের তো হাত-পা নেই!”
ম্যাডাম বললেন, “হাত-পা না থাকা আর মেরুদণ্ড না থাকা এক বিষয় নয়।”
সাপের রহস্য
ফারজানা মরিয়ম একটি সাপের ছবি বের করলেন।
ছবিটি দেখে মেফতাহুল একটু পিছিয়ে গেল।
“ম্যাডাম, ছবিটা যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে!”
আনিশা মারজান হেসে বলল, “ছবি কি আবার কাউকে কামড়াতে পারে?”
ম্যাডাম বললেন, “ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আমরা ছবির মাধ্যমে প্রাণীকে বৈজ্ঞানিকভাবে চিনছি।”
তিনি বললেন, “সাপের দেহ লম্বা এবং সাধারণত এর পা নেই। এটি শরীরের পেশি ও আঁশের সাহায্যে মাটির ওপর চলাচল করে।”
সাফুয়ান বলল, “তাহলে সাপ কীভাবে সামনে যায়?”
ম্যাডাম বললেন, “দেহ বাঁকিয়ে ও পেশির সাহায্যে সাপ এগিয়ে যায়।”
সরীসৃপের ত্বক
মরিয়ম আক্তার একটি প্রশ্ন করল।
“ম্যাডাম, সাপের শরীর চকচকে কেন?”
ফারজানা মরিয়ম বললেন, “সরীসৃপের ত্বক সাধারণত শুষ্ক ও আঁশযুক্ত।”
তিনি বোর্ডে লিখলেন—
শুষ্ক ত্বক + আঁশ = সরীসৃপের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
আবু তালহা বলল, “টিকটিকির শরীরেও তো আঁশ দেখা যায়!”
“ঠিক। টিকটিকিও সরীসৃপ।”
নুসরাত বলল, “তাহলে সাপ আর টিকটিকির মধ্যে কিছু মিল আছে।”
“অবশ্যই। একই প্রাণী দলে থাকা প্রাণীদের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে।”
টিকটিকির দৌড়
ঠিক তখনই শ্রেণিকক্ষের দেয়ালের ওপর একটি ছোট টিকটিকি দেখা গেল।
মেফতাহুল ফিসফিস করে বলল, “ম্যাডাম, আপনার আজকের অতিথি নিজেই চলে এসেছে!”
টিকটিকিটি দ্রুত দেয়ালের এক পাশ থেকে অন্য পাশে চলে গেল।
আনিশা বলল, “এটা তো খুব দ্রুত চলে!”
ফারজানা মরিয়ম বললেন, “টিকটিকির পা আছে এবং এটি পায়ের সাহায্যে চলাফেরা করে।”
আসাদুল্লাহ বলল, “সাপের পা নেই, কিন্তু টিকটিকির পা আছে।”
“ঠিক। একই দলে থাকা প্রাণীদের সব বৈশিষ্ট্য এক নয়।”
কুমিরের বিশাল শরীর
ম্যাডাম এবার একটি কুমিরের ছবি দেখালেন।
ছবিতে কুমিরটি পানির ধারে শুয়ে আছে।
আবাবিল বলল, “এত বড়!”
সাফুয়ান বলল, “কুমির কি মাছ?”
ম্যাডাম বললেন, “না। কুমির মাছ নয়। কুমির সরীসৃপ।”
মেফতাহুল বলল, “কিন্তু কুমির তো পানিতে থাকে!”
“হ্যাঁ, কুমির পানিতে থাকতে পারে এবং ডাঙাতেও চলাফেরা করে। কিন্তু বাসস্থান দিয়ে একা প্রাণীর শ্রেণি নির্ধারণ করা হয় না।”
ম্যাডাম বললেন, “কুমিরের দেহে মেরুদণ্ড আছে এবং এর ত্বক শুষ্ক ও আঁশযুক্ত।”
কচ্ছপের শক্ত খোলস
এবার ম্যাডাম আরেকটি ছবি বের করলেন।
একটি কচ্ছপ ধীরে ধীরে হাঁটছে।
মরিয়ম বলল, “কচ্ছপ খুব ধীরে চলে!”
মেফতাহুল বলল, “ওর কি সব সময় দেরি হয়?”
সবাই হেসে উঠল।
ম্যাডাম বললেন, “কচ্ছপ ধীরে চললেও এটি খুব আকর্ষণীয় প্রাণী।”
তিনি বললেন, “কচ্ছপের শরীরের ওপর শক্ত খোলস থাকে, যা তার দেহকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।”
আনিশা বলল, “কচ্ছপও কি সরীসৃপ?”
“হ্যাঁ।”
চার অতিথি
ফারজানা মরিয়ম চারটি ছবি পাশাপাশি রাখলেন।
সাপ — টিকটিকি — কুমির — কচ্ছপ
তিনি বললেন, “এরা সবাই সরীসৃপ।”
নুসরাত বলল, “সাপের পা নেই।”
আনিশা বলল, “টিকটিকির পা আছে।”
আবাবিল বলল, “কুমির পানিতে ও ডাঙায় থাকতে পারে।”
মরিয়ম বলল, “কচ্ছপের শক্ত খোলস আছে।”
ম্যাডাম বললেন, “খুব ভালো।”
“দেখতেই পাচ্ছ, একই দলের প্রাণীদের মধ্যে মিল যেমন আছে, তেমনি পার্থক্যও আছে।”
সরীসৃপ কীভাবে চলে?
ম্যাডাম বোর্ডে তিনটি ছবি আঁকলেন।
প্রথমটি সাপ।
দ্বিতীয়টি টিকটিকি।
তৃতীয়টি কচ্ছপ।
তিনি বললেন, “সব সরীসৃপ একইভাবে চলে না।”
“সাপ দেহ বাঁকিয়ে চলতে পারে।”
“টিকটিকি পায়ের সাহায্যে চলে।”
“কচ্ছপও পায়ের সাহায্যে চলে।”
“কুমিরও পা ব্যবহার করে চলাফেরা করতে পারে।”
সাফুয়ান বলল, “তাহলে সরীসৃপ মানেই পা থাকবে না—এটা ভুল!”
“ঠিক।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন, “সরীসৃপদের বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য তাদের সামগ্রিক গঠন ও জীবনযাপন দেখতে হয়।”
ডিম পাড়ার রহস্য
আবু তালহা জিজ্ঞেস করল, “ম্যাডাম, সরীসৃপরা কি ডিম পাড়ে?”
“অনেক সরীসৃপ ডিম পাড়ে।”
মেফতাহুল বলল, “সাপও?”
“অনেক প্রজাতির সাপ ডিম পাড়ে।”
আসাদুল্লাহ বলল, “কচ্ছপ?”
“হ্যাঁ, কচ্ছপও ডিম পাড়ে।”
আনিশা বলল, “কুমির?”
“হ্যাঁ, কুমিরও ডিম পাড়ে।”
ম্যাডাম বললেন, “তবে প্রাণীদের প্রজননের পদ্ধতি সব প্রজাতির ক্ষেত্রে এক নয়।”
আঁশের বর্ম
ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে একটি ঢাল আঁকলেন।
তার ওপর লিখলেন—
সুরক্ষা
তিনি বললেন, “সরীসৃপের দেহের শুষ্ক ও আঁশযুক্ত ত্বক তাদের দেহকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে এবং শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি হারানো কমাতে সহায়তা করে।”
নুসরাত বলল, “তাহলে আঁশ যেন তাদের বর্মের মতো!”
“তুলনা হিসেবে বলা যায়, তবে মনে রাখবে এটি প্রকৃতির তৈরি দেহগঠন।”
সাপের চলার পরীক্ষা
ম্যাডাম একটি দড়ি নিয়ে মেঝেতে রাখলেন।
তিনি দড়িটিকে এদিক-ওদিক বাঁকিয়ে দেখালেন।
“ধরো, এটি একটি সাপের দেহ। সাপ কীভাবে শরীর বাঁকিয়ে সামনে এগোতে পারে, সেটা আমরা এইভাবে কল্পনা করতে পারি।”
মেফতাহুল বলল, “দড়িটা কিন্তু হাঁটতে পারছে না!”
ম্যাডাম বললেন, “কারণ দড়ির পেশি নেই। সাপের দেহে পেশি আছে, যা তাকে চলতে সাহায্য করে।”
সবাই মন দিয়ে শুনতে লাগল।
সরীসৃপ ও পরিবেশ
ফারজানা মরিয়ম বললেন, “সরীসৃপদের বিভিন্ন প্রজাতি বিভিন্ন পরিবেশে বাস করে।”
“কেউ মাটিতে থাকে।”
“কেউ পানির কাছাকাছি থাকে।”
“কেউ গাছে বা বাড়ির আশপাশে দেখা যায়।”
“তাদের দেহের গঠন তাদের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উদাহরণ।”
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
ম্যাডাম এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, “তবে একটি বিষয় মনে রাখবে।”
“অপরিচিত সাপ বা অন্য কোনো বন্য প্রাণী দেখলে কখনোই তাকে ধরতে বা বিরক্ত করতে যাবে না।”
সাফুয়ান বলল, “দূর থেকে দেখব?”
“হ্যাঁ। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বড়দের জানাবে।”
মেফতাহুল বলল, “আমি তো সাপ দেখলে এত দূরে যাব যে সাপ আমাকে দেখতেই পাবে না!”
সবাই হেসে উঠল।
শ্রেণিবিন্যাসের খেলা
ফারজানা মরিয়ম এবার একটি খেলা শুরু করলেন।
তিনি একেকটি প্রাণীর নাম বলবেন, আর শিক্ষার্থীরা বলবে সেটি কোন দলে।
“ইলিশ!”
সবাই বলল, “মাছ!”
“ব্যাঙ!”
“উভচর!”
“সাপ!”
“সরীসৃপ!”
“দোয়েল!”
“পাখি!”
“গরু!”
“স্তন্যপায়ী!”
ম্যাডাম বললেন, “অসাধারণ!”
মেফতাহুল বলল, “এবার একটু কঠিন প্রশ্ন করুন!”
ম্যাডাম হাসলেন।
কঠিন প্রশ্ন
“কুমির কি মাছ?”
সবাই বলল, “না!”
“কেন?”
আসাদুল্লাহ বলল, “কুমির মেরুদণ্ডী হলেও এটি সরীসৃপ।”
“চমৎকার।”
“কচ্ছপ কি উভচর?”
মরিয়ম বলল, “না। কচ্ছপ সরীসৃপ।”
“সাপ কি অমেরুদণ্ডী?”
নুসরাত বলল, “না। সাপ মেরুদণ্ডী।”
ম্যাডাম বললেন, “তোমরা এখন প্রাণীদের বৈজ্ঞানিকভাবে চিনতে শিখছ।”
আজকের বিজ্ঞান নোট
সবাই খাতা খুলে লিখল—
সরীসৃপ হলো মেরুদণ্ডী প্রাণীদের একটি প্রধান দল।
এদের ত্বক সাধারণত শুষ্ক ও আঁশযুক্ত।
সাপ, টিকটিকি, কুমির ও কচ্ছপ সরীসৃপের উদাহরণ।
অনেক সরীসৃপ ডিম পাড়ে।
সব সরীসৃপ একইভাবে চলাফেরা করে না।
নতুন রহস্য
ক্লাস শেষ হওয়ার আগে ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে আবার পাঁচটি শব্দ লিখলেন।
মাছ — উভচর — সরীসৃপ — পাখি — স্তন্যপায়ী
তিনি বললেন, “মেরুদণ্ডী প্রাণীদের পাঁচটি প্রধান দলের মধ্যে আমরা এখন তিনটি সম্পর্কে জানি।”
আনিশা বলল, “মাছ।”
নুসরাত বলল, “উভচর।”
আবাবিল বলল, “সরীসৃপ।”
ম্যাডাম বললেন, “আর বাকি রইল দুই দল।”
মেফতাহুল বলল, “পাখি আর স্তন্যপায়ী!”
“ঠিক।”
ফারজানা মরিয়ম জানালার বাইরে তাকালেন।
গাছের ডালে তখন একটি পাখি বসে ছিল।
পাখিটি হঠাৎ ডানা মেলে আকাশে উড়ে গেল।
ম্যাডাম বললেন, “পরের ক্লাসে আমরা জানব—পাখির শরীর কীভাবে তাকে আকাশে উড়তে সাহায্য করে।”
শিক্ষার্থীরা আনন্দে বলে উঠল—
“পাখির উড়ানের রহস্য!”
আর সেই মুহূর্তেই শ্রেণিকক্ষের বাইরে আবার পাখির ডাক শোনা গেল।
মনে হলো প্রকৃতি যেন তাদের পরবর্তী বিজ্ঞান অভিযানের জন্য ডাকছে।
চলবে...
📝 অধ্যায় ৭: MCQ
১. সরীসৃপ কোন ধরনের প্রাণী?
ক) অমেরুদণ্ডী
খ) মেরুদণ্ডী
গ) কীটপতঙ্গ
ঘ) উভচর
২. নিচের কোনটি সরীসৃপ?
ক) ব্যাঙ
খ) রুই
গ) সাপ
ঘ) দোয়েল
৩. সরীসৃপের ত্বক সাধারণত কেমন?
ক) শুষ্ক ও আঁশযুক্ত
খ) পালকে ঢাকা
গ) সব সময় ভেজা
ঘ) নরম ও লোমশ
৪. নিচের কোন প্রাণীর শক্ত খোলস আছে?
ক) কচ্ছপ
খ) ব্যাঙ
গ) মাছ
ঘ) পাখি
৫. নিচের কোন বক্তব্যটি সঠিক?
ক) সব সরীসৃপের পা নেই
খ) সব সরীসৃপ পানিতে থাকে
গ) সাপ মেরুদণ্ডী প্রাণী
ঘ) কচ্ছপ একটি উভচর প্রাণী
উত্তরমালা:
১. খ | ২. গ | ৩. ক | ৪. ক | ৫. গ
লেখক: আশরাফ উল আসাদ