তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প: প্রাণীদের রহস্যময় জগৎ
তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ২: প্রাণী পরিচিতি
অধ্যায় ১: প্রাণীদের রহস্যময় জগৎ
সেদিন সকাল থেকেই তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে অদ্ভুত উত্তেজনা।
নুসরাত জাহান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।
আনিশা মারজান তার খাতায় কী যেন আঁকছে।
মেফতাহুল জান্নাত বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে।
আবাবিল আল আলিফ আর সাফুয়ান নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে।
আসাদুল্লাহ আল গালিব, আবু তালহা ও মরিয়ম আক্তারও আজ যেন অন্য দিনের চেয়ে বেশি আগ্রহী।
কারণ আজ বিজ্ঞান ক্লাস।
আর বিজ্ঞান ক্লাস মানেই ফারজানা মরিয়ম ম্যাডামের নতুন কোনো রহস্য!
কিছুক্ষণ পর দরজা দিয়ে ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম ঢুকলেন।
তাঁর হাতে একটি বড় বাক্স।
মেফতাহুল চোখ বড় বড় করে বলল,
“ম্যাডাম, বাক্সের মধ্যে কী?”
ফারজানা মরিয়ম রহস্যময়ভাবে হাসলেন।
“আজ তোমরা নিজেরাই সেটা খুঁজে বের করবে।”
মেফতাহুল বলল,
“ভেতরে যদি ভূত থাকে?”
সবাই হেসে উঠল।
ম্যাডাম বললেন,
“ভূত নয়। তবে এমন কিছু আছে, যারা আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, উড়ে বেড়ায়, সাঁতার কাটে, লাফায় এবং কখনো কখনো আমাদের অবাক করে দেয়।”
নুসরাত সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“প্রাণী!”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“ঠিক ধরেছ!”
তিনি বোর্ডে লিখলেন—
প্রাণী
প্রাণী কী?
ম্যাডাম প্রশ্ন করলেন,
“তোমরা প্রাণী বলতে কী বোঝ?”
কিছুক্ষণ সবাই চুপ।
তারপর আবু তালহা বলল,
“গরু প্রাণী।”
“ঠিক।”
সাফুয়ান বলল,
“কুকুর প্রাণী।”
“ঠিক।”
মরিয়ম বলল,
“পাখিও প্রাণী।”
“ঠিক।”
আনিশা বলল,
“মাছও প্রাণী।”
“অবশ্যই।”
মেফতাহুল হাত তুলে বলল,
“আর মশা?”
“হ্যাঁ, মশাও প্রাণী।”
মেফতাহুল মুখ কুঁচকে বলল,
“মশাকে প্রাণী বলতেই হবে?”
ম্যাডাম হাসলেন।
“বিজ্ঞান কারও পছন্দ-অপছন্দ দেখে শ্রেণিবিন্যাস করে না। মশাও একটি প্রাণী।”
সবাই আবার হাসল।
চারপাশে কত প্রাণী!
ফারজানা মরিয়ম জানালার দিকে ইশারা করলেন।
“তোমরা বাইরে তাকাও।”
সবাই জানালার দিকে তাকাল।
একটি কাক উড়ে গেল।
ঘাসের ওপর একটি প্রজাপতি বসেছে।
দূরে একটি বিড়াল হাঁটছে।
গাছের ডালে একটি দোয়েল বসে আছে।
পুকুরের পানিতে মাছের ছায়া দেখা যাচ্ছে।
নুসরাত বলল,
“ম্যাডাম, এত প্রাণী আমরা প্রতিদিন দেখি, কিন্তু কখনো এভাবে ভাবিনি!”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“আমাদের চারপাশের পৃথিবী প্রাণীতে ভরা। ছোট পিঁপড়া থেকে বিশাল হাতি—প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে অসাধারণ বৈচিত্র্য।”
সবাই কি একই রকম?
ম্যাডাম বাক্স থেকে কয়েকটি প্রাণীর ছবি বের করলেন।
একটি হাতি।
একটি প্রজাপতি।
একটি মাছ।
একটি কুকুর।
একটি পাখি।
একটি কেঁচো।
তিনি ছবিগুলো টেবিলে সাজিয়ে বললেন,
“এবার বলো, এদের মধ্যে কী কী পার্থক্য আছে?”
আসাদুল্লাহ বলল,
“আকার আলাদা।”
“ঠিক।”
নুসরাত বলল,
“দেহের গঠনও আলাদা।”
“ঠিক।”
আনিশা বলল,
“রং আলাদা।”
“ঠিক।”
আবাবিল বলল,
“চলার পদ্ধতিও আলাদা।”
“খুব ভালো।”
সাফুয়ান বলল,
“মাছ সাঁতার কাটে, পাখি উড়ে, আর হাতি হাঁটে।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“চমৎকার!”
তিনি বোর্ডে লিখলেন—
আকার → আকৃতি → রং → দেহের গঠন → খাদ্য গ্রহণ → চলন
“প্রাণীদের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্যে অনেক ভিন্নতা দেখা যায়।”
হাতি বনাম প্রজাপতি
মেফতাহুল দুটি ছবি হাতে নিল।
এক হাতে হাতি।
অন্য হাতে প্রজাপতি।
সে বলল,
“ম্যাডাম, এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য খুঁজতে বেশি সময় লাগবে না!”
সবাই হেসে ফেলল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“তাহলে বলো।”
মেফতাহুল বলল,
“হাতি অনেক বড়।”
“আর প্রজাপতি?”
“খুব ছোট।”
“হাতি কীভাবে চলে?”
“হেঁটে।”
“প্রজাপতি?”
“উড়ে।”
“হাতির দেহ কেমন?”
“বড় ও ভারী।”
“প্রজাপতির?”
“ছোট এবং হালকা।”
ম্যাডাম বললেন,
“দেখলে? একই পৃথিবীতে বাস করেও প্রাণীদের দেহের গঠন ও জীবনযাপন কত ভিন্ন হতে পারে!”
প্রাণীর দেহের সাধারণ অঙ্গ
ফারজানা মরিয়ম এবার বোর্ডে একটি সাধারণ প্রাণীর ছবি আঁকলেন।
তিনি বললেন,
“প্রাণীদের দেহে অনেক ধরনের অঙ্গ রয়েছে। আজ আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সঙ্গে পরিচিত হব।”
তিনি প্রথমে চোখ আঁকলেন।
“এটি কী?”
সবাই বলল,
“চোখ!”
“চোখের কাজ কী?”
“দেখা!”
ম্যাডাম বললেন,
“চোখের সাহায্যে প্রাণী চারপাশের জিনিস দেখতে পারে।”
কান দিয়ে শোনা
এরপর তিনি কান আঁকলেন।
“এটি?”
“কান!”
“কাজ?”
আবু তালহা বলল,
“শোনা।”
“ঠিক।”
“শব্দের মাধ্যমে প্রাণীরা আশপাশের অনেক তথ্য পেতে পারে।”
মেফতাহুল বলল,
“ম্যাডাম, আমার কানও তাহলে বিজ্ঞানী!”
ফারজানা মরিয়ম হেসে বললেন,
“তোমার কানকে আজ বিজ্ঞানীর সহকারী বলা যেতে পারে।”
নাকের রহস্য
এরপর বোর্ডে নাক।
“এটি কী?”
“নাক!”
“কাজ?”
মরিয়ম বলল,
“ঘ্রাণ নেওয়া।”
ম্যাডাম বললেন,
“অনেক প্রাণী গন্ধের সাহায্যে খাবার খুঁজে পায়, বিপদ বুঝতে পারে বা অন্য প্রাণীকে শনাক্ত করতে পারে।”
নুসরাত বলল,
“কুকুরের ঘ্রাণশক্তি খুব ভালো, তাই না?”
“হ্যাঁ, কুকুরের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত উন্নত।”
মুখ দিয়ে খাবার
ফারজানা মরিয়ম এবার মুখের ছবি দেখালেন।
“প্রাণী খাবার গ্রহণ করে কোন অঙ্গ দিয়ে?”
সবাই বলল,
“মুখ!”
“ঠিক। তবে সব প্রাণীর খাদ্য এক নয়।”
আনিশা বলল,
“গরু ঘাস খায়।”
“ঠিক।”
আবাবিল বলল,
“বাঘ মাংস খায়।”
“ঠিক।”
সাফুয়ান বলল,
“অনেক পাখি বীজ, ফল বা পোকামাকড় খেতে পারে।”
“খুব ভালো।”
ম্যাডাম বললেন,
“তাই প্রাণীদের খাদ্য গ্রহণের ধরনেও বৈচিত্র্য রয়েছে।”
চলার রহস্য
এবার ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে চারটি শব্দ লিখলেন—
পা — ডানা — পাখনা — শরীরের অন্যান্য অঙ্গ
“প্রাণীরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কীভাবে যায়?”
নুসরাত বলল,
“মানুষ পা দিয়ে হাঁটে।”
আনিশা বলল,
“গরু পা দিয়ে হাঁটে।”
আবাবিল বলল,
“পাখি ডানা দিয়ে উড়ে।”
আসাদুল্লাহ বলল,
“মাছ পাখনার সাহায্যে সাঁতার কাটে।”
ম্যাডাম বললেন,
“চমৎকার। প্রাণীর চলন তাদের দেহের গঠন ও পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত।”
পুকুরের ধারে বিজ্ঞান অভিযান
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“আজকের ক্লাস শুধু শ্রেণিকক্ষে হবে না।”
সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
“আমরা কোথায় যাব?”
“স্কুলের পুকুরের কাছে।”
সবাই দল বেঁধে পুকুরের পাশে গেল।
পানিতে মাছ সাঁতার কাটছে।
পাড়ে ব্যাঙ লাফাচ্ছে।
একটি ফড়িং পানির ওপর দিয়ে উড়ে গেল।
ঘাসের মধ্যে পিঁপড়া চলাচল করছে।
ম্যাডাম বললেন,
“এখন তোমরা পর্যবেক্ষণ করবে।”
নুসরাতের পর্যবেক্ষণ
নুসরাত বলল,
“আমি একটি মাছ দেখেছি।”
“মাছ কীভাবে চলে?”
“পাখনার সাহায্যে সাঁতার কাটে।”
“আর কোথায় থাকে?”
“পানিতে।”
ম্যাডাম মাথা নাড়লেন।
আনিশার পর্যবেক্ষণ
আনিশা বলল,
“আমি একটি ব্যাঙ দেখেছি।”
“ব্যাঙ কী করে?”
“লাফায়।”
“আর কোথায় থাকতে পারে?”
“জল ও স্থল—দুই জায়গাতেই।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“এটা মনে রাখবে। পরে আমরা ব্যাঙ নিয়ে আরও বিস্তারিত জানব।”
আবাবিলের অদ্ভুত আবিষ্কার
আবাবিল হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
“ম্যাডাম! আমি একটা কেঁচো পেয়েছি!”
সবাই ছুটে গেল।
মাটির ওপর একটি কেঁচো নড়ছে।
মেফতাহুল একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমি দূর থেকেই বিজ্ঞান করব!”
সবাই হাসল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“কেঁচোও একটি প্রাণী। এর দেহে মানুষের মতো শক্ত মেরুদণ্ড নেই।”
মেফতাহুল একটু সাহস করে কাছে এল।
“তাহলে কেঁচো হাঁটে কীভাবে?”
ম্যাডাম বললেন,
“এর দেহের পেশি ও অন্যান্য গঠন ব্যবহার করে এটি মাটির মধ্যে চলাচল করে।”
মেফতাহুল বলল,
“বাহ! পা ছাড়াও চলা যায়!”
প্রাণীদের শরীর যেন একটি দল
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“তোমরা কি বুঝতে পারছ, প্রাণীর প্রতিটি অঙ্গের আলাদা আলাদা কাজ আছে?”
তিনি বললেন,
“চোখ—দেখতে সাহায্য করে।”
“কান—শুনতে সাহায্য করে।”
“নাক—ঘ্রাণ নিতে সাহায্য করে।”
“মুখ—খাদ্য গ্রহণে সাহায্য করে।”
“পা, ডানা বা পাখনা—চলাফেরায় সাহায্য করে।”
আসাদুল্লাহ বলল,
“মানে প্রাণীর দেহের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করে।”
“ঠিক।”
রহস্যময় প্রশ্ন
ক্লাসে ফেরার পথে ফারজানা মরিয়ম হঠাৎ থেমে গেলেন।
তিনি মাটিতে একটি ছোট পিঁপড়ার দিকে তাকালেন।
“এখন আমার একটা প্রশ্ন।”
সবাই কাছে এল।
“একটি পিঁপড়া আর একটি গরুর মধ্যে এত পার্থক্য। একটি ছোট, অন্যটি বড়। একটি ছয় পা দিয়ে চলে, অন্যটির চার পা। তবু দুটিই প্রাণী। তাহলে কীভাবে আমরা প্রাণীদের আরও ভালোভাবে ভাগ করতে পারি?”
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
ম্যাডাম বললেন,
“এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের প্রাণীদের দেহের ভেতরের কাঠামো সম্পর্কে জানতে হবে।”
নুসরাত বলল,
“দেহের ভেতরে কী আছে?”
“হ্যাঁ।”
আবাবিল বলল,
“সব প্রাণীর কি একই রকম হাড় আছে?”
ফারজানা মরিয়ম রহস্যময় হাসি দিলেন।
“না।”
মেফতাহুল বলল,
“তাহলে কি কারও হাড় আছে, কারও নেই?”
“ঠিক এই রহস্যই আমরা পরের অধ্যায়ে অনুসন্ধান করব।”
শ্রেণিকক্ষে ফিরে
সবাই নিজের আসনে ফিরে এল।
ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে লিখলেন—
মেরুদণ্ড আছে?
তার নিচে একটি প্রশ্নচিহ্ন।
তিনি বললেন,
“পরের অধ্যায়ে আমরা খুঁজে বের করব—কোন প্রাণীর দেহে মেরুদণ্ড আছে এবং কোন প্রাণীর নেই।”
মেফতাহুল বলল,
“ম্যাডাম, মেরুদণ্ড দেখতে কেমন?”
“তোমরা দেখবে।”
“ব্যথা করবে না তো?”
সবাই আবার হেসে উঠল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“বিজ্ঞান জানার জন্য সাহসী হতে হয়।”
নুসরাত বলল,
“আমরা প্রস্তুত!”
ম্যাডাম বললেন,
“তাহলে শুরু হলো আমাদের নতুন অভিযান—প্রাণীদের রহস্যময় জগৎ থেকে মেরুদণ্ডের রহস্যের দিকে।”
শ্রেণিকক্ষের জানালা দিয়ে বাইরে তখন একটি পাখি উড়ে গেল।
মনে হলো, প্রাণীদের বিশাল জগতের দরজা মাত্র খোলা হয়েছে।
চলবে...
📝 অধ্যায় ১: MCQ
১. প্রাণী কী?
ক) জড় বস্তু
খ) জীবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দল
গ) শুধু পাখি
ঘ) শুধু গৃহপালিত জীব
২. প্রাণীর কোন অঙ্গ দিয়ে দেখা যায়?
ক) কান
খ) নাক
গ) চোখ
ঘ) মুখ
৩. কোন অঙ্গের সাহায্যে প্রাণী ঘ্রাণ নিতে পারে?
ক) চোখ
খ) নাক
গ) কান
ঘ) পা
৪. মাছ সাধারণত কীসের সাহায্যে সাঁতার কাটে?
ক) ডানা
খ) পা
গ) পাখনা
ঘ) কান
৫. নিচের কোন বিষয়টি প্রাণীদের মধ্যে ভিন্ন হতে পারে?
ক) আকার
খ) রং
গ) চলন
ঘ) সবগুলো
উত্তরমালা:
১. খ | ২. গ | ৩. খ | ৪. গ | ৫. ঘ
লেখক: আশরাফ উল আসাদ