তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প: জ্বালানির শক্তির গল্প
তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ৫: শক্তি
অধ্যায় ৮: জ্বালানির শক্তির গল্প
আশরাফ উল আসাদ
সেদিন ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেন একটি ছোট্ট কাঠের টুকরা, একটি খালি গ্যাসের সিলিন্ডারের ছবি, একটি গাড়ির ছবি এবং একটি কালো কয়লার টুকরা নিয়ে।
শিক্ষার্থীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
নুসরাত জাহান জিজ্ঞেস করল, “ম্যাডাম, আজ কি আমরা রান্না করব?”
আবু তালহা বলল, “আমি কিন্তু রান্না করতে পারি না। শুধু খেতে পারি!”
সবাই হেসে উঠল।
ম্যাডাম বললেন, “আজ আমরা জানব, রান্না করা, গাড়ি চালানো এবং নানা কাজের জন্য শক্তি কোথা থেকে আসে।”
আনিশা মারজান বলল, “খাবার থেকে?”
“মানুষের শরীরের শক্তি খাবার থেকে আসে,” বললেন ম্যাডাম। “কিন্তু গাড়ি বা চুলার শক্তির জন্য অনেক সময় জ্বালানি ব্যবহার করা হয়।”
জ্বালানি কী?
ফারজানা ম্যাডাম বোর্ডে লিখলেন—
জ্বালানি হলো এমন বস্তু, যা থেকে শক্তি পাওয়া যায় এবং যা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়।
তিনি বললেন, “কাঠ, তেল, গ্যাস ও কয়লা—এসব জ্বালানির উদাহরণ।”
মেফতাহুল জান্নাত বলল, “জ্বালানি কি সব সময় আগুন জ্বালায়?”
ম্যাডাম বললেন, “অনেক জ্বালানি পোড়ালে তাপ শক্তি পাওয়া যায়। সেই তাপ রান্না, পানি গরম করা এবং নানা কাজে ব্যবহার করা হয়। আবার কিছু জ্বালানি থেকে পাওয়া শক্তি গাড়ি চালাতেও কাজে লাগে।”
রান্নাঘরের শক্তি
ম্যাডাম একটি রান্নাঘরের ছবি দেখালেন।
ছবিতে একটি চুলায় হাঁড়ি বসানো।
তিনি বললেন, “আমাদের বাড়িতে রান্নার জন্য অনেক সময় প্রাকৃতিক গ্যাস, কাঠ বা অন্য জ্বালানি ব্যবহার করা হয়।”
সাফুয়ান বলল, “চুলায় আগুন জ্বললে হাঁড়ি গরম হয়।”
“ঠিক,” বললেন ম্যাডাম। “জ্বালানি থেকে পাওয়া তাপ শক্তি হাঁড়ি ও খাবার গরম করে।”
মরিয়ম আক্তার বলল, “তাহলে রান্না করার পেছনেও শক্তির গল্প আছে!”
ম্যাডাম বললেন, “বিজ্ঞানের গল্প রান্নাঘরেও লুকিয়ে থাকে।”
কাঠের আগুন
ফারজানা ম্যাডাম কাঠের টুকরাটি দেখিয়ে বললেন, “আগে মানুষ রান্না ও উষ্ণ থাকার জন্য অনেক বেশি কাঠ ব্যবহার করত।”
আবাবিল আল আলিফ বলল, “কাঠ পোড়ালে আগুন হয়।”
“হ্যাঁ,” বললেন ম্যাডাম। “কাঠ পোড়ালে তাপ শক্তি পাওয়া যায়। সেই তাপ দিয়ে রান্না করা যায় এবং ঠান্ডায় শরীর উষ্ণ রাখা যায়।”
তবে ম্যাডাম সতর্ক করে বললেন, “আগুন খুব বিপজ্জনক হতে পারে। তাই শিশুদের কখনো একা আগুন জ্বালানো বা আগুনের কাছে খেলা উচিত নয়।”
আবু তালহা বলল, “আগুনের কাছে খেললে খেলনা গরম হয়ে যেতে পারে!”
ম্যাডাম বললেন, “শুধু খেলনা নয়, হাত-পা পুড়ে যেতে পারে। তাই আগুন থেকে দূরে থাকতে হবে।”
গ্যাসের শক্তি
ম্যাডাম গ্যাসের সিলিন্ডারের ছবিটি দেখালেন।
তিনি বললেন, “অনেক বাড়িতে রান্নার কাজে গ্যাস ব্যবহার করা হয়।”
নুসরাত জিজ্ঞেস করল, “গ্যাস কি কাঠের মতো?”
“দুটিই জ্বালানি,” বললেন ম্যাডাম। “তবে তাদের রূপ ও ব্যবহার আলাদা। গ্যাস চুলায় ব্যবহার করা হলে তা জ্বলে তাপ শক্তি দেয়।”
আনিশা বলল, “গ্যাস দিয়ে কি শুধু রান্নাই হয়?”
ম্যাডাম বললেন, “না। প্রাকৃতিক গ্যাস বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও অন্য কাজেও ব্যবহৃত হয়।”
তিনি আরও বললেন, “গ্যাসের গন্ধ অস্বাভাবিকভাবে পেলে সঙ্গে সঙ্গে বড়দের জানাতে হবে। নিজেরা আগুন জ্বালানো বা বৈদ্যুতিক সুইচ অন করা যাবে না।”
তেল থেকে গাড়ির শক্তি
ফারজানা ম্যাডাম এবার গাড়ির ছবিটি দেখালেন।
“গাড়ি কীভাবে চলে?”
সাফুয়ান বলল, “চাকা ঘোরে বলে!”
“চাকা কেন ঘোরে?” ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন।
সবাই একটু চিন্তা করল।
আসাদুল্লাহ আল গালিব বলল, “ইঞ্জিনের শক্তিতে?”
“খুব ভালো,” বললেন ম্যাডাম। “অনেক গাড়ির ইঞ্জিন পেট্রোল বা ডিজেলের মতো জ্বালানি ব্যবহার করে। জ্বালানি থেকে পাওয়া শক্তি ইঞ্জিনকে কাজ করতে সাহায্য করে। ইঞ্জিনের সাহায্যে চাকা ঘোরে এবং গাড়ি চলে।”
আবু তালহা বলল, “তাহলে গাড়ির পেট্রোল হলো গাড়ির খাবার!”
ম্যাডাম হেসে বললেন, “তুলনাটা মজার, তবে ধারণাটা বোঝার জন্য ভালো। মানুষ খাবার থেকে শক্তি পায়, আর অনেক গাড়ি জ্বালানি থেকে শক্তি পায়।”
কয়লার শক্তি
ম্যাডাম কালো কয়লার টুকরাটি দেখালেন।
“এটি কয়লা। কয়লাও একটি জ্বালানি।”
মেফতাহুল বলল, “এটা তো কালো পাথরের মতো!”
ম্যাডাম বললেন, “দেখতে পাথরের মতো হলেও কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কয়লা পোড়ালে তাপ শক্তি পাওয়া যায়।”
তিনি বোঝালেন, কয়লা কিছু শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে কয়লা পোড়ালে ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ হতে পারে।
নুসরাত বলল, “তাহলে জ্বালানি ব্যবহার করার সময় পরিবেশের কথাও ভাবতে হবে।”
“অবশ্যই,” বললেন ম্যাডাম।
বাতাসের শক্তি
ফারজানা ম্যাডাম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “শুধু কাঠ, তেল, গ্যাস ও কয়লাই শক্তির উৎস নয়। বাতাস থেকেও শক্তি পাওয়া যায়।”
আবাবিল বলল, “বাতাস তো দেখা যায় না!”
ম্যাডাম বললেন, “বাতাস দেখা না গেলেও তার প্রভাব আমরা বুঝতে পারি। গাছের পাতা নড়ে, ঘুড়ি উড়ে, পালতোলা নৌকা চলে—এসব বাতাসের কারণে হতে পারে।”
আনিশা বলল, “বাতাস দিয়ে বিদ্যুৎও তৈরি করা যায়?”
“হ্যাঁ,” বললেন ম্যাডাম। “বায়ুপ্রবাহ ব্যবহার করে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এই ধরনের শক্তিকে বায়ুশক্তি বলা হয়।”
জ্বালানি ও শক্তির রূপান্তর
ম্যাডাম বোর্ডে একটি সহজ চিত্র আঁকলেন—
জ্বালানি → শক্তি → কাজ
তিনি বললেন, “জ্বালানি ব্যবহার করলে তার মধ্যে থাকা শক্তি অন্য রূপে প্রকাশ পেতে পারে।”
কাঠ পোড়ালে তাপ পাওয়া যায়।
গ্যাস পোড়ালে রান্নার জন্য তাপ পাওয়া যায়।
পেট্রোল বা ডিজেল ব্যবহার করলে গাড়ির ইঞ্জিন কাজ করে।
বাতাসের শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।
মরিয়ম বলল, “শক্তি এক রূপ থেকে অন্য রূপে বদলাতে পারে!”
ম্যাডাম বললেন, “ঠিক তাই। আগের অধ্যায়গুলোতে আমরা আলো, বিদ্যুৎ, তাপ ও শব্দ শক্তির কথা শিখেছি। আজ জানলাম জ্বালানি ও বাতাসও শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস।”
জ্বালানি সাশ্রয়
ফারজানা ম্যাডাম বললেন, “জ্বালানি আমাদের অনেক কাজে সাহায্য করে। তাই জ্বালানি অপচয় করা উচিত নয়।”
তিনি কয়েকটি উদাহরণ দিলেন—
- অপ্রয়োজনীয়ভাবে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখা যাবে না।
- প্রয়োজন না হলে গাড়ি ব্যবহার না করে হাঁটা বা সাইকেল ব্যবহার করা যেতে পারে।
- রান্নার সময় অযথা জ্বালানি নষ্ট করা উচিত নয়।
- বিদ্যুৎ ও অন্যান্য শক্তিও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে।
সাফুয়ান বলল, “জ্বালানি বাঁচালে টাকা বাঁচে!”
ম্যাডাম বললেন, “হ্যাঁ। একই সঙ্গে পরিবেশও রক্ষা করা যায়।”
নিরাপদ ব্যবহার
ম্যাডাম সবাইকে সতর্ক করে বললেন, “জ্বালানি উপকারী হলেও ভুলভাবে ব্যবহার করলে বিপদ হতে পারে।”
তিনি বললেন—
- আগুন নিয়ে খেলা যাবে না।
- গ্যাসের চুলা বড়দের সাহায্য ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
- পেট্রোল, ডিজেল বা অন্য জ্বালানি স্পর্শ করা বা নিয়ে খেলা যাবে না।
- জ্বালানির কাছে দেশলাই বা আগুন নেওয়া যাবে না।
- কোনো দুর্ঘটনা হলে দ্রুত বড়দের জানাতে হবে।
আবু তালহা বলল, “জ্বালানি বন্ধু, কিন্তু নিয়ম না মানলে বিপদ!”
ম্যাডাম বললেন, “একদম ঠিক।”
শক্তির উৎসের মানচিত্র
শেষে ফারজানা ম্যাডাম শিক্ষার্থীদের দল ভাগ করে দিলেন।
প্রত্যেক দলকে একটি কাগজে শক্তির উৎসের ছবি আঁকতে বললেন।
নুসরাতের দল আঁকল কাঠ।
আনিশার দল আঁকল গ্যাসের চুলা।
মেফতাহুলের দল আঁকল পেট্রোল পাম্প।
আবাবিলের দল আঁকল কয়লা।
সাফুয়ানের দল আঁকল বাতাসের টারবাইন।
আসাদুল্লাহ আল গালিবের দল আঁকল সূর্য।
আবু তালহার দল আঁকল খাবারের প্লেট।
মরিয়মের দল আঁকল বিদ্যুতের বাতি।
ম্যাডাম সব ছবি একসঙ্গে সাজিয়ে বললেন, “দেখো, আমাদের চারপাশে শক্তির উৎস কত রকম।”
নুসরাত বলল, “সূর্য, খাবার, জ্বালানি, বাতাস—সবই আমাদের কাজে শক্তি দেয়।”
ফারজানা ম্যাডাম বললেন, “বিজ্ঞান আমাদের শেখায় শক্তির উৎস চিনতে, সঠিকভাবে ব্যবহার করতে এবং অপচয় না করতে।”
ক্লাস শেষ হওয়ার আগে ম্যাডাম একটি প্রশ্ন করলেন—
“আমাদের বাড়ি, স্কুল, রাস্তা ও বাজারে শক্তি কোথায় কোথায় ব্যবহার হয়?”
সবাই একসঙ্গে বলতে শুরু করল।
ফ্যান, বাতি, রান্নার চুলা, গাড়ি, রিকশা, লিফট, কম্পিউটার, মোবাইল চার্জার—কত কিছু!
ম্যাডাম বললেন, “পরের অধ্যায়ে আমরা শক্তির ব্যবহার নিয়ে একটি বড় অভিযান করব। তোমরা নিজেরাই খুঁজে বের করবে, তোমাদের চারপাশে শক্তি কীভাবে কাজ করছে।”
শিক্ষার্থীদের চোখে তখন নতুন অভিযানের ঝিলিক।
আবু তালহা বলল, “আমি প্রথমে ফ্রিজের শক্তির রহস্য খুঁজব!”
ম্যাডাম হেসে বললেন, “তবে ফ্রিজ খুলে রেখে নয়!”
চলবে...
অধ্যায়ের শেষে ১০টি MCQ
১. জ্বালানি কী?
ক) যে বস্তু থেকে শক্তি পাওয়া যায়
খ) যে বস্তু দিয়ে শুধু লেখা হয়
গ) যে বস্তু দিয়ে ছবি আঁকা হয়
ঘ) যে বস্তু পানিতে ভাসে
উত্তর: ক) যে বস্তু থেকে শক্তি পাওয়া যায়
২. নিচের কোনটি জ্বালানির উদাহরণ?
ক) কাঠ
খ) খাতা
গ) পেন্সিল
ঘ) কাচ
উত্তর: ক) কাঠ
৩. কাঠ পোড়ালে সাধারণত কী পাওয়া যায়?
ক) তাপ শক্তি
খ) শব্দ শক্তি
গ) ছায়া
ঘ) বরফ
উত্তর: ক) তাপ শক্তি
৪. রান্নার কাজে কোনটি ব্যবহার করা হয়?
ক) গ্যাস
খ) কাগজ
গ) পাথর
ঘ) রাবার
উত্তর: ক) গ্যাস
৫. অনেক গাড়ি কোন জ্বালানি ব্যবহার করে?
ক) পেট্রোল বা ডিজেল
খ) দুধ
গ) পানি
ঘ) ফল
উত্তর: ক) পেট্রোল বা ডিজেল
৬. কয়লা কী হিসেবে ব্যবহার করা যায়?
ক) জ্বালানি
খ) খেলনা
গ) পোশাক
ঘ) বই
উত্তর: ক) জ্বালানি
৭. বাতাসের শক্তিকে কী বলা হয়?
ক) বায়ুশক্তি
খ) খাদ্যশক্তি
গ) শব্দশক্তি
ঘ) আলোকশক্তি
উত্তর: ক) বায়ুশক্তি
৮. জ্বালানি ব্যবহার করার সময় কী করা উচিত?
ক) অপচয় করা
খ) নিরাপদ ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা
গ) আগুন নিয়ে খেলা করা
ঘ) শিশুদের একা ব্যবহার করতে দেওয়া
উত্তর: খ) নিরাপদ ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা
৯. গ্যাসের অস্বাভাবিক গন্ধ পেলে কী করতে হবে?
ক) আগুন জ্বালাতে হবে
খ) বৈদ্যুতিক সুইচ অন করতে হবে
গ) দ্রুত বড়দের জানাতে হবে
ঘ) গ্যাসের কাছে গিয়ে দেখতে হবে
উত্তর: গ) দ্রুত বড়দের জানাতে হবে
১০. জ্বালানি সাশ্রয় করলে কী উপকার হয়?
ক) টাকা ও পরিবেশ দুটোই রক্ষা করা যায়
খ) শক্তি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়
গ) সব যন্ত্র নষ্ট হয়
ঘ) আলো বন্ধ হয়ে যায়
উত্তর: ক) টাকা ও পরিবেশ দুটোই রক্ষা করা যায়