তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প: আলোর জাদু
তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ৫: শক্তি
অধ্যায় ২: আলোর জাদু
লেখক: আশরাফ উল আসাদ
পরদিন সকালেই মেফতাহুল জান্নাত হাতে একটি ছোট টর্চ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে ঢুকল।
তার মুখে এমন হাসি, যেন সে কোনো গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছে।
নুসরাত জাহান বলল, “তুমি এত খুশি কেন?”
মেফতাহুল টর্চটি উঁচু করে বলল, “আজ আমরা আলোর রহস্য বের করব!”
আবাবিল আল আলিফ বলল, “টর্চটা কি তুমি খুলে ফেলেছ?”
মেফতাহুল একটু থেমে বলল, “না… এখনো না!”
সবাই হেসে উঠল।
ঠিক তখনই ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলেন।
তিনি টর্চটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখছি, আমাদের বিজ্ঞানীরা আজ প্রস্তুত।”
আনিশা মারজান বলল, “ম্যাডাম, আলো কি শক্তি?”
“হ্যাঁ,” বললেন ম্যাডাম।
“আলো হলো শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ। আমরা আলোক শক্তির সাহায্যে চারপাশের জিনিস দেখতে পাই।”
আলো না থাকলে কী হতো?
ম্যাডাম শ্রেণিকক্ষের পর্দা টেনে দিলেন।
জানালা দিয়ে আসা আলো অনেকটাই কমে গেল।
তারপর তিনি শ্রেণিকক্ষের বাতিও বন্ধ করে দিলেন।
ঘরটি বেশ অন্ধকার হয়ে গেল।
মরিয়ম আক্তার বলল, “ম্যাডাম, বইয়ের লেখা তো ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না!”
ম্যাডাম বললেন, “এটাই প্রথম রহস্য।”
“আমরা কোনো বস্তু দেখতে হলে আলো দরকার।”
নুসরাত বলল, “আলো না থাকলে চারপাশের জিনিস দেখা কঠিন হয়।”
“ঠিক,” বললেন ম্যাডাম।
মেফতাহুল নিজের টর্চটি জ্বালিয়ে দিল।
টর্চের আলো সরাসরি বইয়ের ওপর পড়ল।
হঠাৎ বইয়ের অক্ষরগুলো পরিষ্কার দেখা গেল।
মেফতাহুল গর্ব করে বলল, “আমার টর্চ এসে অন্ধকারকে হারিয়ে দিল!”
সাফুয়ান বলল, “তোমার টর্চ নয়, তার আলো!”
ম্যাডাম বললেন, “সাফুয়ান একদম ঠিক বলেছে।”
আলোক শক্তির উৎস
ম্যাডাম বোর্ডে লিখলেন—
আলোক শক্তির উৎস
তার নিচে লিখলেন—
সূর্য, বৈদ্যুতিক বাতি, মোমবাতি, টর্চ
“এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক আলোর উৎস কোনটি?”
সবাই একসঙ্গে বলল, “সূর্য!”
ম্যাডাম বললেন, “ঠিক।”
“সূর্য পৃথিবীকে আলো দেয়। দিনের বেলায় সূর্যের আলো আমাদের চারপাশ আলোকিত করে।”
আসাদুল্লাহ আল গালিব বলল, “তাহলে সূর্য না থাকলে দিনের বেলাও অন্ধকার হয়ে যেত?”
“হ্যাঁ,” বললেন ম্যাডাম।
“তাই সূর্যের আলো আমাদের জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
টর্চের ভেতরে কী আছে?
মেফতাহুল আবার টর্চটি হাতে তুলে নিল।
“ম্যাডাম, আমার টর্চের আলো কোথা থেকে আসে?”
ম্যাডাম বললেন, “টর্চের ভেতরে ব্যাটারি থাকে। ব্যাটারি থেকে বিদ্যুৎ শক্তি পাওয়া যায়, আর টর্চ সেই শক্তি ব্যবহার করে আলো তৈরি করে।”
আনিশা বলল, “তাহলে বিদ্যুৎ শক্তি থেকে আলোক শক্তি পাওয়া যেতে পারে?”
ম্যাডাম বললেন, “হ্যাঁ।”
“অনেক বৈদ্যুতিক বাতিও বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহার করে আলো দেয়।”
মেফতাহুল বলল, “তাহলে আমার টর্চের ভেতরে ছোট্ট একটা শক্তির কারখানা আছে!”
ম্যাডাম হেসে বললেন, “তোমার ভাষায় বলতে পারো।”
সূর্যের আলো ও পৃথিবী
ম্যাডাম সবাইকে জানালার কাছে নিয়ে গেলেন।
বাইরে গাছের পাতায় সূর্যের আলো ঝলমল করছিল।
তিনি বললেন, “সূর্যের আলো শুধু আমাদের দেখতেই সাহায্য করে না, পৃথিবীর জীবনের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
“গাছপালা সূর্যের আলো ব্যবহার করে নিজেদের খাদ্য তৈরি করে।”
নুসরাত বলল, “তাহলে গাছেরও সূর্যের আলো দরকার?”
“অবশ্যই,” বললেন ম্যাডাম।
“তাই সূর্যের আলো প্রকৃতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
ছায়ার রহস্য
ম্যাডাম একটি বই জানালার কাছে ধরলেন।
বইটির পেছনে মেঝেতে একটি অন্ধকার অংশ তৈরি হলো।
আবু তালহা বলল, “এটা ছায়া!”
ম্যাডাম বললেন, “ঠিক।”
“আলোর পথে কোনো বস্তু বাধা দিলে তার পেছনে ছায়া তৈরি হতে পারে।”
সাফুয়ান হাতের আঙুল দিয়ে মজার আকৃতি বানিয়ে দেয়ালে ছায়া ফেলল।
মরিয়ম বলল, “দেখুন, হাত দিয়ে খরগোশের মতো ছায়া বানানো যায়!”
ম্যাডাম বললেন, “এভাবেও আমরা আলো নিয়ে মজার পরীক্ষা করতে পারি।”
আলো সোজা পথে যায়
ম্যাডাম তিনটি কার্ড নিলেন।
প্রতিটি কার্ডের মাঝখানে ছোট একটি ছিদ্র ছিল।
তিনি তিনটি কার্ড এক সরল রেখায় রাখলেন এবং পেছনে একটি টর্চ রাখলেন।
টর্চের আলো তিনটি ছিদ্র দিয়ে সামনে যেতে পারল।
তারপর তিনি মাঝের কার্ডটি একটু সরিয়ে দিলেন।
আলো আর আগের মতো দেখা গেল না।
আবাবিল বলল, “কার্ডগুলো এক লাইনে থাকলে আলো যেতে পারছে।”
ম্যাডাম বললেন, “এই পরীক্ষাটি আমাদের বোঝায় যে আলো সাধারণভাবে সরল পথে চলতে পারে।”
দিনের আলো আর রাতের অন্ধকার
মেফতাহুল প্রশ্ন করল, “ম্যাডাম, রাতে সূর্য কোথায় যায়?”
সবাই হেসে ফেলল।
ম্যাডাম বললেন, “সূর্য কোথাও গিয়ে লুকিয়ে পড়ে না। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে আলো পাওয়ার বিষয়টি পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সম্পর্কিত।”
“আমরা যখন সূর্যের আলো পাই, তখন আমাদের এখানে দিন হয়।”
“আর যখন আমাদের অংশ সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকে, তখন রাত হয়।”
নুসরাত বলল, “তাহলে দিন-রাতের সঙ্গে আলোর সম্পর্ক আছে।”
“ঠিক,” বললেন ম্যাডাম।
চাঁদের আলো কি নিজের আলো?
মরিয়ম হাত তুলল।
“ম্যাডাম, চাঁদও তো রাতে আলো দেয়। চাঁদের নিজের আলো আছে?”
ম্যাডাম বললেন, “চাঁদ নিজে সূর্যের মতো আলো তৈরি করে না। আমরা চাঁদের যে উজ্জ্বল অংশ দেখি, সেটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত হওয়ার কারণে দেখা যায়।”
আনিশা বলল, “অর্থাৎ সূর্যের আলো চাঁদকে আলোকিত করে?”
“হ্যাঁ,” বললেন ম্যাডাম।
মোমবাতির আলো
ম্যাডাম একটি মোমবাতি দেখালেন।
“মোমবাতি কী দেয়?”
আবু তালহা বলল, “আলো।”
সাফুয়ান বলল, “তাপও!”
ম্যাডাম বললেন, “খুব ভালো পর্যবেক্ষণ।”
“মোমবাতি জ্বললে আলো ও তাপ দুটোই পাওয়া যায়।”
“তবে আগুন নিয়ে কোনো পরীক্ষা শিক্ষকের অনুমতি ও নিরাপত্তা ছাড়া করা যাবে না।”
মেফতাহুল বলল, “আমি বুঝেছি—আগুন নিয়ে মজা করা যাবে না।”
ম্যাডাম বললেন, “এটা মনে রাখবে।”
আলো কোথায় কোথায় লাগে?
ম্যাডাম শিক্ষার্থীদের বললেন, “এখন তোমরা বলো, আলোর ব্যবহার কোথায় কোথায়?”
নুসরাত বলল, “বই পড়তে।”
আনিশা বলল, “রাস্তা দেখতে।”
আবাবিল বলল, “ঘর আলোকিত করতে।”
সাফুয়ান বলল, “টর্চ দিয়ে অন্ধকার জায়গা দেখতে।”
আসাদুল্লাহ বলল, “গাড়ির হেডলাইট দিয়ে রাস্তা দেখতে।”
মরিয়ম বলল, “মঞ্চে আলো দিয়ে অনুষ্ঠান আলোকিত করতে।”
ম্যাডাম বললেন, “চমৎকার।”
আলোর অপচয় করা উচিত কি?
ম্যাডাম শ্রেণিকক্ষের সব বাতি জ্বালিয়ে দিলেন।
তারপর জানালার পর্দা সরিয়ে দিলেন।
বাইরের সূর্যের আলোয় ঘরটি এমনিতেই উজ্জ্বল হয়ে গেল।
ম্যাডাম বললেন, “এখন সব বাতি জ্বালিয়ে রাখার কি দরকার?”
সবাই বলল, “না।”
“তাহলে কী করা উচিত?”
নুসরাত বলল, “প্রয়োজন না হলে বাতি বন্ধ করা উচিত।”
ম্যাডাম বললেন, “ঠিক।”
“এতে বিদ্যুৎ শক্তির অপচয় কমানো যায়।”
আলো নিয়ে ছোট্ট প্রতিযোগিতা
ম্যাডাম শ্রেণিকক্ষে একটি খেলা শুরু করলেন।
তিনি একে একে কিছু জিনিসের নাম বলবেন, আর শিক্ষার্থীরা বলবে সেটি আলোর উৎস কি না।
“সূর্য!”
সবাই বলল, “হ্যাঁ!”
“বাতি!”
“হ্যাঁ!”
“টর্চ!”
“হ্যাঁ!”
“পাথর!”
সবাই বলল, “না!”
“বই!”
“না!”
“মোমবাতি!”
“হ্যাঁ!”
মেফতাহুল বলল, “আমার টিফিন?”
সবাই হেসে উঠল।
ম্যাডাম বললেন, “টিফিন আলো দেয় না, কিন্তু তোমাকে শক্তি পেতে সাহায্য করতে পারে!”
আলোর জাদুর শেষ পরীক্ষা
ক্লাসের শেষে ম্যাডাম একটি বাক্সের ভেতরে একটি ছোট বস্তু রাখলেন।
বাক্সটি বন্ধ করে বললেন, “এখন কেউ কি ভেতরের বস্তুটি দেখতে পারবে?”
সবাই বলল, “না।”
ম্যাডাম একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে টর্চের আলো ফেললেন।
বাক্সের ভেতরের বস্তুটি দেখা গেল।
মরিয়ম বলল, “আলো না থাকলে আমরা দেখতে পারতাম না!”
ম্যাডাম বললেন, “এটাই আজকের মূল শিক্ষা।”
তারপর তিনি বোর্ডে লিখলেন—
আলোক শক্তি আমাদের দেখতে সাহায্য করে।
সূর্য আলোক শক্তির প্রধান প্রাকৃতিক উৎস।
টর্চ, বাতি ও মোমবাতি থেকেও আলো পাওয়া যায়।
ম্যাডাম টর্চটি আবার মেফতাহুলের হাতে দিলেন।
“এখন তোমার সামনে নতুন প্রশ্ন।”
মেফতাহুল চোখ বড় বড় করে বলল, “আবার প্রশ্ন?”
“হ্যাঁ,” বললেন ম্যাডাম।
“টর্চের আলো তৈরি করতে যে বিদ্যুৎ শক্তি লাগে, সেই বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসে?”
মেফতাহুল এবার চুপ।
নুসরাত বলল, “এটা তো আরও বড় রহস্য!”
ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম মুচকি হেসে বললেন, “পরের অধ্যায়ে আমরা সেই রহস্যের দরজা খুলব।”
শিক্ষার্থীরা টর্চের দিকে তাকিয়ে রইল।
আলোর ছোট্ট বিন্দুটি যেন তাদের সামনে বিশাল এক বৈজ্ঞানিক জগতের দরজা খুলে দিল।
চলবে...
📝 অধ্যায় ২: MCQ
১. আলো কী?
ক) শক্তির একটি রূপ
খ) একটি খাবার
গ) একটি কঠিন পদার্থ
ঘ) একটি খেলনা
২. আলোক শক্তির সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক উৎস কোনটি?
ক) চাঁদ
খ) সূর্য
গ) টেবিল
ঘ) বই
৩. আমরা আলোক শক্তির সাহায্যে কী করি?
ক) চারপাশের জিনিস দেখতে পাই
খ) শুধু শব্দ শুনি
গ) খাবার খাই
ঘ) পানি পান করি
৪. নিচের কোনটি আলোর উৎস?
ক) টর্চ
খ) পাথর
গ) বই
ঘ) চেয়ার
৫. বৈদ্যুতিক বাতি কী শক্তি ব্যবহার করে আলো দিতে পারে?
ক) বিদ্যুৎ শক্তি
খ) শব্দ শক্তি
গ) খাদ্য শক্তি
ঘ) মাটির শক্তি
৬. সূর্যের আলো গাছপালার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ক) খাদ্য তৈরিতে সাহায্য করে
খ) গাছকে শব্দ করতে সাহায্য করে
গ) গাছকে হাঁটতে সাহায্য করে
ঘ) গাছকে উড়তে সাহায্য করে
৭. আলোর পথে কোনো বস্তু বাধা দিলে কী তৈরি হতে পারে?
ক) ছায়া
খ) পানি
গ) বরফ
ঘ) মাটি
৮. মোমবাতি জ্বললে কী পাওয়া যায়?
ক) আলো ও তাপ
খ) শুধু পানি
গ) শুধু শব্দ
ঘ) শুধু বাতাস
৯. প্রয়োজন না হলে বৈদ্যুতিক বাতি কী করা উচিত?
ক) বন্ধ করা
খ) সব সময় জ্বালিয়ে রাখা
গ) ভেঙে ফেলা
ঘ) পানিতে রাখা
১০. চাঁদের আলো সম্পর্কে কোনটি সঠিক?
ক) চাঁদ সূর্যের মতো নিজে আলো তৈরি করে
খ) চাঁদের দৃশ্যমান আলো সূর্যের আলো প্রতিফলিত হওয়ার কারণে দেখা যায়
গ) চাঁদ সব সময় অন্ধকার
ঘ) চাঁদ আগুন দিয়ে জ্বলে
উত্তরমালা:
১. ক | ২. খ | ৩. ক | ৪. ক | ৫. ক | ৬. ক | ৭. ক | ৮. ক | ৯. ক | ১০. খ