শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
মজার সাথে শিক্ষা - ক্লাস ৩

তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ১: অধ্যায় ৭: ফুল আছে, ফুল নেই!

আশরাফ উল আসাদ • 05 সেপ্টেম্বর 2026, 03:44 রাত • 184 বার পঠিত
তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ১: অধ্যায় ৭: ফুল আছে, ফুল নেই!

“ফুল আছে, ফুল নেই—এ আবার কেমন কথা?”


মেফতাহুল জান্নাত বোর্ডের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে বলল, যেন ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত কথাটি বলেছেন।


বোর্ডে বড় করে লেখা—


সুপুষ্পক উদ্ভিদ


অপুষ্পক উদ্ভিদ


নুসরাত জাহান বলল,


“ম্যাডাম, আমরা তো জানি ফুল থেকে ফল হয়। তাহলে ফুল ছাড়া উদ্ভিদ কীভাবে বেঁচে থাকে?”


আনিশা মারজান বলল,


“আর ফুল না থাকলে তারা কি কখনো ফলও তৈরি করে না?”


ফারজানা মরিয়ম মৃদু হেসে বললেন,


“তোমাদের প্রশ্নগুলোই আজকের রহস্যের চাবিকাঠি।”


তিনি টেবিলের ওপর কয়েকটি ছবি রাখলেন।


একটিতে আমগাছ।


একটিতে গোলাপ।


আরেকটিতে সরিষার ফুল।


তারপর আরও কয়েকটি ছবি—


একটি ফার্ন।


একটি মস।


একটি মাশরুম।


একটি শৈবাল।


শিক্ষার্থীরা ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।


ম্যাডাম বললেন,


“আজ আমরা জানব—ফুল উৎপন্ন হয় কি না, তার ওপর ভিত্তি করে উদ্ভিদকে কীভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।”


ফুলওয়ালা উদ্ভিদের দল


ফারজানা মরিয়ম প্রথমে আমগাছের ছবিটি তুলে ধরলেন।


“এই গাছটি কি তোমরা চেনো?”


সবাই একসঙ্গে বলল,


“আমগাছ!”


“আমগাছে ফুল হয়?”


“হ্যাঁ!”


“ফল হয়?”


“হ্যাঁ!”


“তাহলে এটি কোন দলের?”


নুসরাত বলল,


“সুপুষ্পক উদ্ভিদ!”


ফারজানা মরিয়ম বললেন,


“ঠিক। যেসব উদ্ভিদে ফুল উৎপন্ন হয় এবং ফুলের মাধ্যমে ফল ও বীজ তৈরির প্রক্রিয়া ঘটে, তাদের সুপুষ্পক উদ্ভিদ বলা হয়।”


তিনি আরও বললেন,


“আম, জবা, শাপলা, গোলাপ ও সরিষা—এসব সুপুষ্পক উদ্ভিদের উদাহরণ।”


সাফুয়ান বলল,


“মানে যেসব উদ্ভিদে ফুল দেখি, তারা সুপুষ্পক?”


“সহজভাবে মনে রাখার জন্য এভাবে ভাবতে পারো।”


ফুলের উৎসব


ফারজানা মরিয়ম শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্কুলের বাগানে গেলেন।


আজ বাগানে যেন ফুলের উৎসব।


একদিকে গোলাপ।


অন্যদিকে জবা।


আরেক পাশে সরিষার হলুদ ফুলের ছবি দিয়ে সাজানো একটি বিজ্ঞান প্রদর্শনী।


ম্যাডাম বললেন,


“তোমরা প্রত্যেকে একটি ফুলের নাম বলো।”


নুসরাত বলল,


“গোলাপ।”


আনিশা বলল,


“জবা।”


আবাবিল আল আলিফ বলল,


“শাপলা।”


সাফুয়ান বলল,


“সরিষা।”


আবু তালহা বলল,


“সূর্যমুখী!”


আসাদুল্লাহ আল গালিব বলল,


“আমের মুকুলও তো ফুলের সঙ্গে সম্পর্কিত।”


ফারজানা মরিয়ম বললেন,


“খুব ভালো। এগুলো আমাদের সুপুষ্পক উদ্ভিদের জগৎ সম্পর্কে ধারণা দেয়।”


মরিয়ম আক্তার একটি গোলাপের দিকে তাকিয়ে বলল,


“ফুল শুধু সুন্দর নয়, উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধির সঙ্গেও জড়িত।”


“একদম ঠিক।”


এবার রহস্যময় ছবিগুলো


ফারজানা মরিয়ম এবার ফার্নের ছবিটি সামনে ধরলেন।


“এটি কী?”


আবাবিল বলল,


“ফার্ন।”


“ফুল দেখতে পাচ্ছ?”


সবাই ছবিটির দিকে তাকাল।


“না!”


“ফল?”


“না!”


মেফতাহুল বলল,


“ম্যাডাম, তাহলে এটা কি উদ্ভিদের পরীক্ষায় ফেল করেছে?”


সবাই হেসে উঠল।


ফারজানা মরিয়ম বললেন,


“না। ফার্নও উদ্ভিদ। কিন্তু এটি ফুল ও ফল উৎপন্নকারী উদ্ভিদের মতো নয়।”


তিনি বললেন,


“যেসব উদ্ভিদে ফুল ও ফল উৎপন্ন হয় না, তাদের অপুষ্পক উদ্ভিদ বলা হয়।”


নুসরাত অবাক হয়ে বলল,


“ফুল নেই, ফল নেই—তবুও উদ্ভিদ!”


“হ্যাঁ।”


ফার্নের গোপন রহস্য


ফারজানা মরিয়ম একটি ফার্নের ছবি বড় করে দেখালেন।


“ফার্ন কীভাবে বংশবৃদ্ধি করে জানো?”


কেউ উত্তর দিতে পারল না।


ম্যাডাম বললেন,


“ফার্নের মতো কিছু অপুষ্পক উদ্ভিদ রেণুর মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে।”


মেফতাহুল চোখ বড় করে বলল,


“রেণু কী?”


“খুব ছোট প্রজনন-সংক্রান্ত কণা, যেগুলো থেকে উপযুক্ত পরিবেশে নতুন উদ্ভিদ তৈরি হতে পারে।”


মেফতাহুল বলল,


“এগুলো কি ধুলোর মতো?”


“কিছু ক্ষেত্রে খুব ক্ষুদ্র হওয়ায় দেখতে ধুলোর মতো মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলো সাধারণ ধুলো নয়।”


আনিশা বলল,


“তাহলে ফুল না থাকলেও তাদের নতুন উদ্ভিদ তৈরির ব্যবস্থা আছে!”


“ঠিক তাই।”


মসের নরম জগৎ


এরপর ফারজানা মরিয়ম মসের ছবি দেখালেন।


“এটি মস।”


সাফুয়ান বলল,


“এটা দেখতে তো সবুজ কার্পেটের মতো!”


“ঠিক বলেছ। ভেজা ও আর্দ্র পরিবেশে মস দেখা যেতে পারে।”


নুসরাত জিজ্ঞেস করল,


“এটার ফুল কোথায়?”


“সাধারণ ফুল হয় না।”


“ফল?”


“সাধারণ ফলও হয় না।”


মরিয়ম বলল,


“তাহলে এটাও অপুষ্পক উদ্ভিদ?”


“হ্যাঁ।”


ব্যাঙের ছাতা কি উদ্ভিদ?


এবার ফারজানা মরিয়ম একটি মাশরুমের ছবি দেখালেন।


“এবার বলো, এটি কী?”


সবাই বলল,


“মাশরুম!”


মেফতাহুল বলল,


“এটা তো ব্যাঙের ছাতার মতো!”


ফারজানা মরিয়ম বললেন,


“বাংলায় অনেক সময় মাশরুমকে ব্যাঙের ছাতা বলা হয়।”


আবু তালহা জিজ্ঞেস করল,


“এটাও কি অপুষ্পক উদ্ভিদ?”


ফারজানা মরিয়ম এবার একটু থামলেন।


“এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। মাশরুমকে ঐতিহাসিকভাবে উদ্ভিদের সঙ্গে আলোচনা করা হলেও আধুনিক জীববিজ্ঞানে মাশরুমকে উদ্ভিদ নয়, ছত্রাক (fungus) হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়।”


শিক্ষার্থীরা অবাক।


মেফতাহুল বলল,


“তাহলে আমাদের বইয়ের তালিকায় এটা কেন?”


ফারজানা মরিয়ম বললেন,


“প্রাথমিক স্তরে কিছু পাঠ্যবইয়ে ফুলহীন জীবের উদাহরণ হিসেবে মাশরুমের উল্লেখ থাকতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানকে আরও গভীরভাবে পড়লে তোমরা জানতে পারবে, ছত্রাক উদ্ভিদ থেকে আলাদা একটি জীবজগতের দল।”


সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনল।


“বিজ্ঞান শেখার সময় নতুন তথ্য জানলে পুরোনো ধারণাকে আরও নির্ভুল করা যায়,” বললেন ম্যাডাম।


শৈবালের সবুজ রহস্য


এরপর এল শৈবালের ছবি।


ছবিতে পানির মধ্যে সবুজ স্তর।


সাফুয়ান বলল,


“এগুলো কি পানির ঘাস?”


ফারজানা মরিয়ম বললেন,


“শৈবাল দেখতে অনেক সময় উদ্ভিদের মতো মনে হয় এবং অনেক শৈবাল পানিতে বাস করে। প্রাথমিক বিজ্ঞানে এগুলোকে উদ্ভিদজগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতে পারে। তবে আধুনিক জীববিজ্ঞানে সব শৈবালকে একইভাবে ‘উদ্ভিদ’ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয় না।”


মেফতাহুল মাথা চুলকে বলল,


“ম্যাডাম, বিজ্ঞান যত পড়ি, ততই দেখি সবকিছু আবার নতুন করে শিখতে হয়!”


ফারজানা মরিয়ম বললেন,


“এটাই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য।”


দুই দলের মুখোমুখি


ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে দুটি কলাম আঁকলেন।


সুপুষ্পক উদ্ভিদ | অপুষ্পক উদ্ভিদ


তারপর বললেন,


“এবার আমরা তুলনা করি।”


নুসরাত বলল,


“সুপুষ্পক উদ্ভিদে ফুল হয়।”


“ঠিক।”


আনিশা বলল,


“ফুল ও ফল উৎপন্ন হতে পারে।”


“ঠিক।”


আসাদুল্লাহ বলল,


“অপুষ্পক উদ্ভিদে ফুল ও ফল হয় না।”


“ঠিক।”


আবাবিল বলল,


“কিছু অপুষ্পক উদ্ভিদ রেণুর মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে।”


“অসাধারণ।”


বিজ্ঞান গোয়েন্দা খেলা


ফারজানা মরিয়ম বললেন,


“এবার দ্রুত খেলা হবে। আমি নাম বলব, তোমরা দল বলবে।”


“গোলাপ!”


সবাই—


“সুপুষ্পক!”


“জবা!”


“সুপুষ্পক!”


“আম!”


“সুপুষ্পক!”


“ফার্ন!”


“অপুষ্পক!”


“মস!”


“অপুষ্পক!”


“শৈবাল!”


শিক্ষার্থীরা একটু থেমে গেল।


ম্যাডাম বললেন,


“পাঠ্যবইয়ের প্রাথমিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী ফুলহীন উদ্ভিদের উদাহরণ হিসেবে শৈবাল উল্লেখ করা হয়। তবে আধুনিক জীববিজ্ঞানে শৈবালের শ্রেণিবিন্যাস আরও জটিল।”


সবাই মাথা নাড়ল।


একটি ভুল উত্তর


ফারজানা মরিয়ম এবার বললেন,


“শেষ প্রশ্ন—মাশরুম?”


মেফতাহুল চিৎকার করে বলল,


“অপুষ্পক উদ্ভিদ!”


ফারজানা মরিয়ম হেসে বললেন,


“প্রাথমিক পাঠের উদাহরণ হিসেবে তুমি এমন উত্তর দেখতে পারো। কিন্তু আজ আমরা একটি নতুন বিষয়ও শিখেছি—আধুনিক জীববিজ্ঞানে মাশরুম হলো ছত্রাক, উদ্ভিদ নয়।”


মেফতাহুল বলল,


“তাহলে মাশরুম আজ আমাদের ধোঁকা দিল!”


“না,” ম্যাডাম বললেন, “বিজ্ঞান আমাদের আরও ভালোভাবে চিনতে শিখিয়েছে।”


রহস্যের শেষ দরজা


ক্লাস শেষ হওয়ার আগে ফারজানা মরিয়ম শিক্ষার্থীদের বললেন,


“আজ আমরা জানলাম, ফুলের উপস্থিতি উদ্ভিদ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় দিতে পারে। কিন্তু উদ্ভিদকে বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তারা কোথায় বাস করে।”


তিনি বোর্ডে লিখলেন—


মাটি? পানি? মরুভূমি? অন্য উদ্ভিদ?


আবাবিল বলল,


“উদ্ভিদও কি জায়গা বেছে বাঁচে?”


ম্যাডাম বললেন,


“প্রতিটি উদ্ভিদ সব জায়গায় ভালোভাবে বাঁচতে পারে না। কোনো উদ্ভিদ মাটিতে ভালো জন্মায়, কোনোটি পানিতে, কোনোটি শুষ্ক অঞ্চলে। আবার কিছু উদ্ভিদ অন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।”


সাফুয়ান বলল,


“তাহলে এবার আমরা উদ্ভিদের বাড়ি খুঁজব?”


“ঠিক তাই।”


ফারজানা মরিয়ম জানালার বাইরে পুকুরের দিকে তাকালেন।


পানির ওপর শাপলা ফুল ভাসছে।


তিনি বললেন,


“পরের অভিযানে আমরা খুঁজে বের করব—উদ্ভিদের বাড়ি কোথায়?”


শিক্ষার্থীরা জানালার বাইরে তাকাল।


একটি নতুন রহস্য তাদের অপেক্ষায়।


চলবে...


আজকের শেখা


- ফুল উৎপন্ন হওয়ার ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে উদ্ভিদকে সুপুষ্পক ও অপুষ্পক—এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

- সুপুষ্পক উদ্ভিদে ফুল হয় এবং ফুলের মাধ্যমে ফল ও বীজ তৈরির প্রক্রিয়া ঘটে।

- আম, জবা, শাপলা, গোলাপ ও সরিষা সুপুষ্পক উদ্ভিদের উদাহরণ।

- অপুষ্পক উদ্ভিদে ফুল ও ফল উৎপন্ন হয় না।

- ফার্ন ও মস ফুলহীন উদ্ভিদের উদাহরণ।

- কিছু অপুষ্পক উদ্ভিদ রেণুর মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে।

- মাশরুমকে প্রাথমিক পাঠে ফুলহীন জীবের উদাহরণ হিসেবে পাওয়া গেলেও আধুনিক জীববিজ্ঞানে এটি ছত্রাক, উদ্ভিদ নয়।

- শৈবালের শ্রেণিবিন্যাসও আধুনিক জীববিজ্ঞানে আরও জটিল; প্রাথমিক স্তরে এগুলোকে ফুলহীন উদ্ভিদের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে।


লেখক: আশরাফ উল আসাদ

#শিক্ষার্থীদের পাতা #শিক্ষা