তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ১: অধ্যায় ৫: ফুল থেকে ফলের রহস্য
সকাল থেকেই স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে অদ্ভুত উত্তেজনা।
আজ বিজ্ঞান ক্লাসে কী হবে, সবাই জানে।
গত ক্লাসের শেষে ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম একটি কথা বলেছিলেন—
“ফুলের ভেতরে লুকিয়ে আছে গাছের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গল্প।”
সেই কথাটাই সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।
নুসরাত জাহান ক্লাসে ঢুকেই বলল,
“আমি গতকাল বাসায় গিয়ে একটা ফুল অনেকক্ষণ দেখেছি।”
আনিশা মারজান বলল,
“তারপর?”
“কিছুই হয়নি!”
মেফতাহুল জান্নাত হেসে বলল,
“তুমি কি ভেবেছিলে ফুলটা তোমার সঙ্গে কথা বলবে?”
নুসরাত বলল,
“না! কিন্তু ম্যাডাম বলেছেন ফুলের মধ্যে রহস্য আছে।”
আবাবিল আল আলিফ বলল,
“আজ নিশ্চয়ই সেই রহস্য বের হবে।”
ঠিক তখনই ফারজানা মরিয়ম শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলেন।
তাঁর হাতে একটি ঝুড়ি।
ঝুড়ির ভেতরে ছিল—জবা ফুল, গোলাপ, সরিষার ফুল, একটি কাঁচা টমেটো, একটি পাকা টমেটো এবং কয়েকটি বীজ।
ম্যাডাম ঝুড়িটি টেবিলে রেখে বললেন,
“আজ আমরা একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজব।”
তিনি বোর্ডে লিখলেন—
“ফুলের পর কী আসে?”
মেফতাহুল হাত তুলল।
“ফুলের পর ছুটি আসে!”
সবাই হেসে উঠল।
ফারজানা মরিয়মও হাসলেন।
“ছুটি অবশ্যই আসে। কিন্তু উদ্ভিদের জীবনে ফুলের পর কী আসে?”
আনিশা বলল,
“ফল?”
“ঠিক।”
ফুল কি শুধু সুন্দর?
ফারজানা মরিয়ম একটি জবা ফুল হাতে তুলে নিলেন।
“এই ফুলটি কেমন?”
মরিয়ম আক্তার বলল,
“খুব সুন্দর।”
সাফুয়ান বলল,
“লাল।”
আবু তালহা বলল,
“নরম।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“ফুল উদ্ভিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। কিন্তু ফুলের কাজ শুধু সৌন্দর্য নয়।”
আসাদুল্লাহ আল গালিব বলল,
“ফুল ফল আর বীজ তৈরিতে সাহায্য করে।”
“একদম ঠিক।”
তিনি বললেন,
“ফুল উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং ফল ও বীজ তৈরিতে সাহায্য করে।”
নুসরাত অবাক হয়ে বলল,
“মানে একটা ফুলের ভেতরেই নতুন গাছের শুরু হতে পারে?”
“হ্যাঁ। ফুল থেকে ফল তৈরি হয়, আর ফলের ভেতরে থাকে বীজ।”
একটি আশ্চর্য পরিবর্তন
ফারজানা মরিয়ম এবার দুটি টমেটো দেখালেন।
একটি কাঁচা।
অন্যটি পাকা।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?”
সাফুয়ান বলল,
“একটা কাঁচা, আর একটা পাকা।”
“রং?”
“একটা সবুজ, অন্যটা লাল।”
“কিন্তু এই ফলটি কোথা থেকে এলো?”
সবাই বলল,
“ফুল থেকে!”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“ঠিক। উদ্ভিদের ফুলের রূপান্তরের মাধ্যমে ফল তৈরি হয়।”
মেফতাহুল টমেটোর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে টমেটো আগে ফুল ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে টমেটোকে আগে ফুলের পোশাক পরতে হতো?”
আবার হাসির রোল পড়ল।
ম্যাডাম বললেন,
“তুমি মজার কথা বলছ, কিন্তু ধারণাটা ঠিকভাবে বুঝেছ—ফল তৈরির আগে ফুলের ভূমিকা থাকে।”
ফলের ভেতরের গুপ্তধন
ফারজানা মরিয়ম টমেটোটি কেটে দেখালেন।
ভেতরে অসংখ্য ছোট বীজ।
“এবার বলো, এগুলো কী?”
“বীজ!”
“বীজের কাজ কী?”
আবাবিল বলল,
“নতুন গাছ জন্মাতে পারে।”
“ঠিক।”
মরিয়ম বলল,
“তাহলে ফলের ভেতরে ছোট ছোট গাছ লুকিয়ে থাকে?”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“এক অর্থে বলা যায়, বীজের মধ্যে নতুন উদ্ভিদ তৈরির সম্ভাবনা থাকে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বীজ থেকে নতুন উদ্ভিদ জন্মাতে পারে।”
নুসরাত বলল,
“তাহলে ফল যেন বীজের বাড়ি!”
“খুব সুন্দর তুলনা।”
আমের রহস্য
ফারজানা মরিয়ম এবার বললেন,
“তোমরা আম খেতে ভালোবাসো?”
সবাই একসঙ্গে বলল,
“হ্যাঁ!”
“আমের ভেতরে কী থাকে?”
“আঁটি!”
ম্যাডাম বললেন,
“আমের আঁটির ভেতরে থাকে বীজ। সেই বীজ থেকে উপযুক্ত পরিবেশে নতুন আমগাছ জন্মাতে পারে।”
আসাদুল্লাহ বলল,
“তাহলে একটা আমের ভেতরে একটা নতুন আমগাছের সম্ভাবনা থাকে!”
“ঠিক।”
মেফতাহুল বলল,
“তাহলে আমি যদি একটা আম খাই, আমি কি একটা গাছও খেয়ে ফেলি?”
সবাই হেসে উঠল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“না। তুমি ফলের শাঁস খাচ্ছ। বীজ আলাদা থাকে।”
মেফতাহুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
“বাঁচলাম!”
ফুল থেকে ফল—কিন্তু সব সময়?
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“তবে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে। সব উদ্ভিদের ফুল, ফল ও বীজ একইভাবে দেখা যায় না। উদ্ভিদের ধরন ভেদে তাদের গঠন ও বংশবিস্তারের পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।”
নুসরাত বলল,
“তাহলে সব উদ্ভিদের কি ফুল হয়?”
ম্যাডাম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“এই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের পরের রহস্যের দরজা খুলে দেবে।”
সবাই কৌতূহলী হয়ে উঠল।
“কিছু উদ্ভিদে ফুল হয়, আবার কিছু উদ্ভিদে ফুল হয় না।”
সাফুয়ান বলল,
“ফুল হয় না? তাহলে তারা কীভাবে বংশবৃদ্ধি করে?”
ফারজানা মরিয়ম মৃদু হেসে বললেন,
“সেটা আমরা পরে জানব।”
ফুলের ভেতরে যাওয়ার কল্পনা
ম্যাডাম সবাইকে একটি মজার কল্পনার খেলায় অংশ নিতে বললেন।
“চোখ বন্ধ করো।”
সবাই চোখ বন্ধ করল।
“ভাবো, তোমরা একটি ফুলের চেয়েও ছোট হয়ে গেছ।”
মেফতাহুল ফিসফিস করে বলল,
“আমি এত ছোট হতে চাই না!”
“চুপচাপ কল্পনা করো,” ম্যাডাম বললেন।
“তোমরা ফুলের ভেতরে ঢুকেছ। চারপাশে নানা গঠন। ফুল শুধু সুন্দর নয়; এর বিভিন্ন অংশ উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধির কাজে ভূমিকা রাখে।”
শিক্ষার্থীরা যেন কল্পনার জগতে হারিয়ে গেল।
“এখন ভাবো, সময়ের সঙ্গে ফুলের পরিবর্তন হচ্ছে। কিছু অংশ পরিবর্তিত হয়ে ফল তৈরি হচ্ছে। আর ফলের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বীজ।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“এটাই প্রকৃতির এক বিস্ময়কর ধারাবাহিকতা।”
বীজের ঘুম
ক্লাসে ফিরে ম্যাডাম কয়েকটি বীজ টেবিলে রাখলেন।
“এগুলো দেখো।”
আনিশা বলল,
“কত ছোট!”
“কিন্তু এই ছোট বীজের মধ্যে রয়েছে নতুন উদ্ভিদ তৈরির সম্ভাবনা।”
আবু তালহা জিজ্ঞেস করল,
“বীজ কি ঘুমায়?”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“তুমি চাইলে একে বিশ্রামে থাকা অবস্থার সঙ্গে তুলনা করতে পারো। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বীজ অঙ্কুরিত হয়ে নতুন উদ্ভিদের জন্ম দিতে পারে।”
মরিয়ম বলল,
“তার জন্য কী দরকার?”
“উপযুক্ত পানি, বায়ু, তাপমাত্রা এবং অন্যান্য পরিবেশগত শর্ত দরকার।”
একটি বীজের যাত্রা
ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে আঁকলেন—
ফুল → ফল → বীজ → নতুন উদ্ভিদ
তিনি বললেন,
“এই ধারাটি মনে রাখবে।”
নুসরাত বলল,
“এটা তো একটা চক্রের মতো!”
“হ্যাঁ। উদ্ভিদের জীবন ও বংশবিস্তারের সঙ্গে এই ধারার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে।”
আসাদুল্লাহ বলল,
“তাহলে আজ আমরা একটা ফুলের পুরো ভবিষ্যৎ দেখতে পেলাম!”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“ঠিক তাই।”
বিজ্ঞান গোয়েন্দা পরীক্ষা
এবার ম্যাডাম শিক্ষার্থীদের কয়েকটি প্রশ্ন দিলেন।
“এক—ফুলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ কী?”
নুসরাত বলল,
“ফল ও বীজ তৈরিতে সাহায্য করা।”
“দুই—ফুলের রূপান্তরের মাধ্যমে কী তৈরি হয়?”
আনিশা বলল,
“ফল।”
“তিন—ফলের ভেতরে সাধারণত কী থাকে?”
সবাই বলল,
“বীজ!”
“চার—বীজ থেকে কী হতে পারে?”
“নতুন উদ্ভিদ!”
ফারজানা মরিয়ম হাততালি দিলেন।
“আজ তোমরা সত্যিকারের উদ্ভিদ গোয়েন্দা!”
একটি নতুন প্রশ্ন
বিজ্ঞান ক্লাস প্রায় শেষ।
শিক্ষার্থীরা ভাবছিল আজকের রহস্য সমাধান হয়েছে।
ঠিক তখন ফারজানা মরিয়ম ঝুড়ি থেকে একটি ফার্নের ছবি বের করলেন।
তিনি ছবিটি বোর্ডে লাগিয়ে বললেন,
“এখন বলো, এই উদ্ভিদটির ফুল কোথায়?”
সবাই ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
নুসরাত বলল,
“আমি তো কোনো ফুল দেখতে পাচ্ছি না!”
“ফল?”
“সেটাও না!”
মেফতাহুল বলল,
“ম্যাডাম, তাহলে এটা কি উদ্ভিদই নয়?”
ফারজানা মরিয়ম রহস্যময়ভাবে হাসলেন।
“অবশ্যই উদ্ভিদ। কিন্তু সব উদ্ভিদের গল্প কি একই?”
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
ম্যাডাম বললেন,
“পরের অধ্যায়ে আমরা এমন একদল উদ্ভিদের সঙ্গে পরিচিত হব, যাদের গল্প ফুলওয়ালা উদ্ভিদের চেয়ে একেবারেই আলাদা।”
আবাবিল বলল,
“ফুল নেই, কিন্তু উদ্ভিদ আছে?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে তাদের রহস্য আরও বড়!”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“ঠিক তাই।”
বিজ্ঞান অভিযানের পরবর্তী দরজা খুলে গেল।
ফুল আছে—এমন উদ্ভিদ যেমন আছে, তেমনি ফুল নেই—এমন উদ্ভিদও আছে।
আর সেই রহস্যের নাম—
সুপুষ্পক ও অপুষ্পক উদ্ভিদ।
চলবে...
আজকের শেখা
- ফুল উদ্ভিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
- ফুল উদ্ভিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
- ফুল উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- ফুল ফল ও বীজ তৈরিতে সাহায্য করে।
- ফুলের রূপান্তরের মাধ্যমে ফল তৈরি হয়।
- ফলের ভেতরে সাধারণত বীজ থাকে।
- উপযুক্ত পরিবেশে বীজ থেকে নতুন উদ্ভিদ জন্মাতে পারে।
- সব উদ্ভিদের ফুল ও ফল একইভাবে দেখা যায় না।
লেখক: আশরাফ উল আসাদ