তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ১: অধ্যায় ৩: গাছের শক্ত মেরুদণ্ড
সেদিন সকাল থেকেই তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্যরকম উত্তেজনা।
গত ক্লাসে তারা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মূলের রহস্য আবিষ্কার করেছে। কিন্তু ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম ক্লাসের শেষে এমন একটি প্রশ্ন রেখে গিয়েছিলেন, যার উত্তর জানার জন্য সবাই অধীর হয়ে আছে।
“গাছের শক্ত মেরুদণ্ড কোনটি?”
মেফতাহুল জান্নাত ক্লাসে ঢুকেই বলল,
“আমি জানি!”
নুসরাত জাহান অবাক হয়ে তাকাল।
“তুমি জানো?”
“অবশ্যই। গাছের মেরুদণ্ড হলো—তার স্কুলব্যাগ!”
সবাই হেসে উঠল।
আনিশা মারজান বলল,
“গাছ স্কুলে আসে না যে তার স্কুলব্যাগ থাকবে!”
মেফতাহুল গম্ভীর হয়ে বলল,
“তাহলে হয়তো গাছের মেরুদণ্ড হলো... তার মূল?”
ঠিক তখনই ফারজানা মরিয়ম শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলেন।
তিনি বললেন,
“মূল খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আজ আমরা এমন একটি অংশের কথা বলব, যা মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে গাছের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশকে ধরে রাখে।”
আসাদুল্লাহ আল গালিব সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“কাণ্ড!”
ফারজানা মরিয়ম হাসলেন।
“ঠিক। আজ আমরা জানব—কাণ্ড কী এবং কাণ্ড কী কাজ করে।”
রহস্যময় বাক্স
ফারজানা মরিয়মের হাতে ছিল একটি ছোট বাক্স।
তিনি বাক্সটি টেবিলের ওপর রাখলেন।
সবাই কৌতূহলী।
আবাবিল আল আলিফ জিজ্ঞেস করল,
“ম্যাডাম, বাক্সের ভেতরে কী?”
“বিজ্ঞান।”
মেফতাহুল বলল,
“বিজ্ঞান কি বাক্সে রাখা যায়?”
“যদি মন দিয়ে দেখো, তাহলে যায়।”
ম্যাডাম বাক্স খুললেন।
ভেতরে ছিল—
একটি নরম সবুজ কাণ্ড,
একটি শক্ত কাঠের টুকরা,
একটি ঘাসের গাছ,
একটি জবা গাছের ডাল
এবং একটি ছোট আমগাছের ডাল।
তিনি সবগুলো টেবিলে সাজিয়ে বললেন,
“এগুলো ভালো করে দেখো। এগুলোর মধ্যে মিল কোথায়?”
শিক্ষার্থীরা একে একে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
সাফুয়ান বলল,
“সবগুলোরই কাণ্ড আছে।”
“ঠিক।”
“কিন্তু সব কাণ্ড একই রকম নয়,” বলল মরিয়ম আক্তার।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“এই কথাটিই আজকের রহস্যের প্রথম সূত্র।”
কাণ্ড কোথায়?
ম্যাডাম সবাইকে নিয়ে স্কুলের বাগানে গেলেন।
প্রথমে তাঁরা একটি ঘাসের কাছে দাঁড়ালেন।
“এখানে কাণ্ড কোথায়?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
শিক্ষার্থীরা একটু বিভ্রান্ত।
মেফতাহুল বলল,
“ম্যাডাম, ঘাসের কাণ্ড তো দেখা যায় না!”
“ভালো পর্যবেক্ষণ। কিছু উদ্ভিদের কাণ্ড খুব ছোট বা নরম হওয়ায় সহজে চোখে পড়ে না।”
এরপর তাঁরা জবা গাছের সামনে গেলেন।
“এবার?”
আনিশা বলল,
“এখানে কাণ্ড স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।”
এরপর সবাই গেল বিশাল আমগাছটির নিচে।
ম্যাডাম গাছটির মোটা কাণ্ডে হাত রাখলেন।
“এবার বলো।”
আবু তালহা বলল,
“এটা তো একেবারে বিশাল!”
মেফতাহুল বলল,
“এটা দিয়ে তো একটা বেঞ্চ বানানো যাবে!”
ফারজানা মরিয়ম হেসে বললেন,
“গাছ কাটার কথা এখনই ভাববে না। বরং ভাবো, এই শক্ত কাণ্ডটি কত বড় গাছকে ধরে রেখেছে!”
গাছের মেরুদণ্ড
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“কাণ্ড সাধারণত উদ্ভিদের মাটির উপরের অংশে থাকে। এটি গাছের শাখা-প্রশাখা ও পাতাকে ধরে রাখে।”
নুসরাত বলল,
“তাহলে কাণ্ড না থাকলে পাতা কোথায় থাকবে?”
“সেটাই ভাবো।”
মরিয়ম বলল,
“মাটিতে পড়ে যাবে?”
“অনেক ক্ষেত্রেই গাছের কাঠামো ঠিক রাখা কঠিন হয়ে যাবে।”
ফারজানা মরিয়ম একটি ছোট চারার কাণ্ড দেখিয়ে বললেন,
“কাণ্ড উদ্ভিদকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে এবং শাখা-প্রশাখা ও পাতাকে ধারণ করে।”
মেফতাহুল বলল,
“তাহলে কাণ্ড হলো গাছের মেরুদণ্ড!”
“এই কারণেই আজকের অধ্যায়ের নাম গাছের শক্ত মেরুদণ্ড।”
কাণ্ডের রং কি সব সময় বাদামি?
ফারজানা মরিয়ম হঠাৎ প্রশ্ন করলেন,
“তোমরা কাণ্ডের কথা ভাবলে কোন রং মনে আসে?”
সবাই বলল,
“বাদামি!”
ম্যাডাম একটি সবুজ কাণ্ড তুলে ধরলেন।
“তাহলে এটা?”
সাফুয়ান বলল,
“সবুজ!”
“ঠিক। সব কাণ্ড শক্ত, মোটা ও বাদামি হয় না। কিছু উদ্ভিদের কাণ্ড নরম ও সবুজ হতে পারে।”
আসাদুল্লাহ বলল,
“যেমন ঘাস বা ছোট গাছের কাণ্ড?”
“হ্যাঁ।”
“আবার বড় গাছের কাণ্ড শক্ত ও কাষ্ঠল হতে পারে,” বললেন ফারজানা মরিয়ম।
আবাবিল আমগাছের কাণ্ডে হাত রেখে বলল,
“এটা তো সত্যিই খুব শক্ত!”
একটি ছোট পরীক্ষা
ফারজানা মরিয়ম শিক্ষার্থীদের একটি সহজ পর্যবেক্ষণ করতে দিলেন।
তিনি বললেন,
“তোমরা সবাই একটি ছোট নরম গাছের কাণ্ড এবং একটি শক্ত কাঠের কাণ্ড দেখো। দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?”
নুসরাত বলল,
“একটি নরম।”
আনিশা বলল,
“অন্যটি শক্ত।”
আবু তালহা বলল,
“একটি সহজে বাঁকা যায়।”
ম্যাডাম বললেন,
“ঠিক। উদ্ভিদের ধরন অনুযায়ী কাণ্ডের গঠন ও দৃঢ়তা ভিন্ন হতে পারে।”
কাণ্ড কি শুধু ধরে রাখে?
মেফতাহুল হাত তুলল।
“ম্যাডাম, কাণ্ডের কাজ কি শুধু গাছকে দাঁড় করিয়ে রাখা?”
ফারজানা মরিয়ম একটু হাসলেন।
“খুব ভালো প্রশ্ন।”
তিনি বললেন,
“কাণ্ডের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশকে ধরে রাখা। উদ্ভিদের ভেতরে পানি ও অন্যান্য উপাদান বিভিন্ন অংশে পৌঁছাতেও কাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”
নুসরাত বলল,
“মানে মূল মাটি থেকে পানি নেয়, আর কাণ্ড সেই পানি ওপরে পৌঁছাতে সাহায্য করে?”
“হ্যাঁ, খুব ভালোভাবে বুঝেছ।”
শিক্ষার্থীরা এবার গাছের দিকে নতুন চোখে তাকাল।
পাতা যদি কাণ্ডে না থাকত?
ফারজানা মরিয়ম এবার একটি মজার প্রশ্ন করলেন।
“ধরো, গাছের সব পাতা মাটিতে পড়ে থাকল আর কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকল না। তাহলে কী হবে?”
মেফতাহুল বলল,
“পাতাগুলো স্কুলে এসে বসবে!”
সবাই হেসে ফেলল।
আনিশা বলল,
“তাহলে গাছ দেখতে অদ্ভুত লাগবে।”
“শুধু অদ্ভুত নয়,” ম্যাডাম বললেন, “গাছের স্বাভাবিক গঠনও নষ্ট হবে।”
তিনি বললেন,
“কাণ্ড পাতাকে নির্দিষ্ট অবস্থানে ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে পাতাগুলো আলো পাওয়ার সুযোগ পায়।”
আসাদুল্লাহ বলল,
“পাতা যদি আলো পায়, তাহলে তারা খাদ্য তৈরির কাজ করতে পারে।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“একদম ঠিক।”
কাণ্ডের ওপর ফুল ও ফল
এরপর সবাই একটি জবা গাছের সামনে গেল।
ম্যাডাম বললেন,
“এই ফুলটি কোথায় আছে?”
মরিয়ম বলল,
“গাছের ডালে।”
“আর ডালটি কোথায় যুক্ত?”
“কাণ্ডের সঙ্গে।”
“ঠিক।”
তিনি বললেন,
“শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে কাণ্ড গাছের পাতা, ফুল ও ফলকে ধারণ করতে সাহায্য করে।”
সাফুয়ান বলল,
“তাহলে কাণ্ড যেন গাছের একটা বড় রাস্তা!”
“খুব সুন্দর তুলনা,” ম্যাডাম বললেন। “উদ্ভিদের ভেতরে পানি ও অন্যান্য উপাদান চলাচলের ক্ষেত্রেও কাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ।”
ঝড়ের পরীক্ষা
হঠাৎ বাগানে বাতাস বেড়ে গেল।
আমগাছের পাতাগুলো দুলতে শুরু করল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“এখন সবাই ভালো করে দেখো।”
শিক্ষার্থীরা আমগাছটির দিকে তাকিয়ে রইল।
বাতাস যত বাড়ল, পাতাগুলো তত দুলল।
কিন্তু গাছটি?
দাঁড়িয়ে রইল।
আসাদুল্লাহ বলল,
“মূল মাটিতে ধরে রেখেছে, আর কাণ্ড গাছের ওপরের অংশকে ধরে রেখেছে!”
“চমৎকার!” বললেন ফারজানা মরিয়ম।
“মূল আর কাণ্ড—দুজনেই উদ্ভিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
মেফতাহুল বলল,
“মানে গাছের একটা দল আছে—মূল নিচে পাহারা দেয়, কাণ্ড ওপরে পাহারা দেয়!”
“তুমি চাইলে এভাবেও মনে রাখতে পারো।”
আজকের বিজ্ঞান চ্যালেঞ্জ
ক্লাসে ফিরে ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে লিখলেন—
মূল + কাণ্ড = উদ্ভিদের শক্ত ভিত্তি
তারপর তিনি শিক্ষার্থীদের বললেন,
“এখন আমি কিছু বলব। তোমরা বলবে ঠিক না ভুল।”
“মূল সাধারণত মাটির নিচে থাকে।”
সবাই: “ঠিক!”
“কাণ্ড সাধারণত মাটির নিচে থাকে।”
সবাই: “ভুল!”
“কাণ্ড গাছের শাখা-প্রশাখা ও পাতাকে ধরে রাখে।”
সবাই: “ঠিক!”
“সব গাছের কাণ্ড একই রকম।”
সবাই: “ভুল!”
“বড় গাছের কাণ্ড সাধারণত মোটা ও শক্ত হতে পারে।”
সবাই: “ঠিক!”
ফারজানা মরিয়ম হাততালি দিলেন।
“অসাধারণ!”
রহস্যের নতুন দরজা
ক্লাস শেষ হওয়ার সময় নুসরাত জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
“ম্যাডাম, আজ গাছটাকে অনেক বেশি জীবন্ত মনে হচ্ছে।”
“কারণ তুমি এখন তার শরীরের ভেতরের কাজগুলো বুঝতে শুরু করেছ।”
ফারজানা মরিয়ম টেবিল থেকে একটি সবুজ পাতা তুলে নিলেন।
“কিন্তু তোমরা কি জানো, এই ছোট্ট পাতার ভেতরে এমন একটি কাজ হয়, যার ওপর উদ্ভিদের জীবন অনেকটাই নির্ভর করে?”
সবাই চুপ।
ম্যাডাম বললেন,
“এই পাতাই উদ্ভিদের খাদ্য তৈরির প্রধান অঙ্গ।”
আনিশা বিস্মিত হয়ে বলল,
“পাতা আবার খাবার বানায়?”
ফারজানা মরিয়ম মৃদু হেসে বললেন,
“পরের ক্লাসে আমরা প্রবেশ করব পাতার সেই সবুজ কারখানায়।”
মেফতাহুল বলল,
“ম্যাডাম, সেখানে কি রান্না হয়?”
“হয়,” বললেন ফারজানা মরিয়ম, “তবে হাঁড়ি-পাতিল ছাড়াই!”
সবাই অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে তাকাল।
চলবে...
আজকের শেখা
- কাণ্ড সাধারণত উদ্ভিদের মাটির উপরের অংশে থাকে।
- কাণ্ড গাছকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে।
- কাণ্ড শাখা-প্রশাখা ও পাতাকে ধরে রাখে।
- ফুল ও ফলও শাখা-প্রশাখার সঙ্গে যুক্ত থাকে।
- কিছু উদ্ভিদের কাণ্ড নরম ও সবুজ হতে পারে।
- বড় বৃক্ষের কাণ্ড সাধারণত মোটা, শক্ত ও কাষ্ঠল হয়।
- উদ্ভিদের ভেতরে পানি ও অন্যান্য উপাদান বিভিন্ন অংশে পৌঁছাতেও কাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
লেখক: আশরাফ উল আসাদ