তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প : মেরুদণ্ড আছে, নাকি নেই?
তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ২: প্রাণী পরিচিতি
অধ্যায় ৩: মেরুদণ্ড আছে, নাকি নেই?
সেদিন বিজ্ঞান ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম শ্রেণিকক্ষের বোর্ডে দুটি বড় প্রশ্ন লিখে রেখেছিলেন—
“মেরুদণ্ড কী?”
আর তার নিচে—
“সব প্রাণীর কি মেরুদণ্ড আছে?”
শিক্ষার্থীরা একে একে শ্রেণিকক্ষে ঢুকে প্রশ্ন দুটো দেখে থমকে গেল।
নুসরাত জাহান বলল,
“ম্যাডাম আজ আবার কোনো রহস্য নিয়ে এসেছেন!”
আনিশা মারজান বলল,
“গতকাল তো বলেছিলেন, আজ মেরুদণ্ড নিয়ে জানব।”
মেফতাহুল জান্নাত নিজের পিঠে হাত দিয়ে বলল,
“আমার মেরুদণ্ড আছে। আমি সেটা অনুভব করতে পারছি!”
আবাবিল আল আলিফ বলল,
“আমারও আছে।”
সাফুয়ান বলল,
“আমাদের সবারই আছে।”
ফারজানা মরিয়ম তখন শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেন।
তিনি বললেন,
“তোমরা নিজেদের কথা ঠিকই বলেছ। কিন্তু আজ আমরা এমন প্রাণীদের সঙ্গে পরিচিত হব, যাদের দেহে আমাদের মতো মেরুদণ্ড নেই।”
মেফতাহুল অবাক হয়ে বলল,
“মেরুদণ্ড ছাড়া আবার প্রাণী হয়?”
ম্যাডাম হেসে বললেন,
“হয়। আর পৃথিবীর প্রাণীজগতে এমন প্রাণীর সংখ্যা অনেক।”
মেরুদণ্ড কোথায়?
ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে একটি মানুষের কঙ্কালের ছবি আঁকলেন।
তিনি পিঠের মাঝ বরাবর একটি লম্বা রেখা দেখিয়ে বললেন,
“এই অংশটি হলো মেরুদণ্ড।”
আসাদুল্লাহ আল গালিব জিজ্ঞেস করল,
“মেরুদণ্ডের কাজ কী?”
“মেরুদণ্ড আমাদের দেহের কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি দেহকে সমর্থন দেয় এবং মেরুদণ্ডী প্রাণীদের দেহের কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
মরিয়ম আক্তার বলল,
“তাহলে মেরুদণ্ড দেহকে শক্ত রাখতেও সাহায্য করে?”
“হ্যাঁ।”
হাত দিয়ে নিজের মেরুদণ্ড খোঁজা
ম্যাডাম বললেন,
“এবার সবাই চুপচাপ নিজের পিঠের মাঝখানে হাত রাখো।”
সবাই হাত রাখল।
মেফতাহুল বলল,
“আমি ছোট ছোট শক্ত অংশের মতো অনুভব করছি!”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“মেরুদণ্ডে একাধিক কশেরুকা বা হাড়ের অংশ থাকে। এগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মেরুদণ্ড তৈরি করে।”
নুসরাত বলল,
“তাই এটাকে শুধু একটা হাড় বলা ঠিক নয়?”
“ঠিক। মেরুদণ্ড অনেকগুলো কশেরুকা নিয়ে গঠিত।”
প্রাণীদের বড় দুই দল
ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে দুটি বাক্স আঁকলেন।
প্রথমটিতে লিখলেন—
মেরুদণ্ডী প্রাণী
দ্বিতীয়টিতে—
অমেরুদণ্ডী প্রাণী
তিনি বললেন,
“মেরুদণ্ড আছে কি না—এই বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে প্রাণীদের প্রধানত দুটি বড় দলে ভাগ করা যায়।”
আনিশা জিজ্ঞেস করল,
“যাদের মেরুদণ্ড আছে তারা মেরুদণ্ডী?”
“হ্যাঁ।”
“আর যাদের নেই তারা অমেরুদণ্ডী?”
“একদম ঠিক।”
মেরুদণ্ডীদের সঙ্গে পরিচয়
ম্যাডাম কয়েকটি ছবি বের করলেন।
মানুষ।
গরু।
ছাগল।
মাছ।
ব্যাঙ।
সাপ।
পাখি।
তিনি বললেন,
“এরা সবাই মেরুদণ্ডী প্রাণীর উদাহরণ।”
মেফতাহুল বলল,
“মানে আমার পোষা বিড়ালও মেরুদণ্ডী?”
“হ্যাঁ।”
আবু তালহা বলল,
“গরু?”
“মেরুদণ্ডী।”
সাফুয়ান বলল,
“মাছ?”
“মেরুদণ্ডী।”
আবাবিল বলল,
“পাখি?”
“মেরুদণ্ডী।”
নুসরাত বলল,
“ব্যাঙ?”
“মেরুদণ্ডী।”
মরিয়ম বলল,
“সাপ?”
“মেরুদণ্ডী।”
অমেরুদণ্ডীদের চমক
এরপর ম্যাডাম টেবিলে কয়েকটি ছবি রাখলেন।
কেঁচো।
প্রজাপতি।
মশা।
মাছি।
চিংড়ি।
শামুক।
কাঁকড়া।
“এবার বলো, এদের মধ্যে কার মেরুদণ্ড আছে?”
সবাই ছবিগুলো দেখে চুপ।
মেফতাহুল বলল,
“আমি তো কোনো ছবির পিঠ খুলে দেখিনি!”
সবাই হেসে উঠল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“বাইরে থেকে মেরুদণ্ড সব সময় দেখা যায় না। বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাসের জন্য দেহের অভ্যন্তরীণ গঠন গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বললেন,
“এই প্রাণীগুলো অমেরুদণ্ডী প্রাণীর উদাহরণ।”
কেঁচোর রহস্য
আবাবিল বলল,
“ম্যাডাম, কেঁচোর শরীর তো নরম। তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে তার মেরুদণ্ড নেই?”
“কেঁচো অমেরুদণ্ডী প্রাণী।”
মেফতাহুল বলল,
“তাহলে কেঁচো পিঠে স্কুলব্যাগ নিয়ে হাঁটতে পারে না!”
সাফুয়ান বলল,
“ওর তো পা-ই নেই!”
আবার হাসির রোল উঠল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“কেঁচোর দেহ নরম এবং এর মানুষের মতো মেরুদণ্ড নেই। তবুও এটি নিজের দেহের পেশি ব্যবহার করে মাটির মধ্যে চলতে পারে।”
প্রজাপতির ছয় পা
এবার ম্যাডাম একটি প্রজাপতির ছবি দেখালেন।
“প্রজাপতির মেরুদণ্ড আছে?”
সবাই বলল,
“না!”
“এটি কোন দলের?”
“অমেরুদণ্ডী!”
“প্রজাপতির কয়টি পা?”
আনিশা বলল,
“ছয়টি।”
ম্যাডাম বললেন,
“প্রজাপতি একটি কীটপতঙ্গ। এর দেহে মেরুদণ্ড নেই।”
নুসরাত বলল,
“কিন্তু ডানা আছে।”
“হ্যাঁ। ডানা তাকে উড়তে সাহায্য করে।”
মশা ও মাছি
মেফতাহুল একটু বিরক্ত মুখে বলল,
“ম্যাডাম, মশাও কি অমেরুদণ্ডী?”
“হ্যাঁ।”
“মাছিও?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে মশা আর মাছি দুটোই অমেরুদণ্ডী?”
“ঠিক।”
মেফতাহুল বলল,
“এটা জানার পর মশাকে আমি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারছি। যদিও কামড়ালে আবার সব ভুলে যাব!”
সবাই হেসে ফেলল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“মশা ও মাছি অমেরুদণ্ডী প্রাণী হলেও তাদের দেহের গঠন খুবই বিশেষায়িত।”
পানির নিচের অমেরুদণ্ডী
ম্যাডাম এবার চিংড়ি ও কাঁকড়ার ছবি দেখালেন।
“এরা কোথায় থাকে?”
আবু তালহা বলল,
“পানিতে।”
“এদের মেরুদণ্ড আছে?”
“না।”
“তাহলে?”
“অমেরুদণ্ডী।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“চিংড়ি ও কাঁকড়ার দেহের বাইরে শক্ত আবরণ থাকে। কিন্তু তাদের মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মতো অভ্যন্তরীণ মেরুদণ্ড নেই।”
সাফুয়ান বলল,
“তাহলে পানিতে থাকা মানেই মেরুদণ্ডী নয়।”
“খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা।”
শামুকের ধীর গতি
ম্যাডাম শামুকের ছবি দেখালেন।
“শামুক কীভাবে চলে?”
মরিয়ম বলল,
“খুব ধীরে।”
মেফতাহুল বলল,
“এমন ধীরে যে আমি ওকে দৌড়ে হারিয়ে দিতে পারব!”
ম্যাডাম হেসে বললেন,
“শামুক তার পেশিবহুল পায়ের সাহায্যে ধীরে ধীরে চলতে পারে।”
“শামুক কি মেরুদণ্ডী?”
“না। শামুক অমেরুদণ্ডী।”
শ্রেণিবিন্যাসের খেলা
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“এবার আমরা একটি খেলা খেলব।”
তিনি দুটি ঝুড়ি রাখলেন।
একটিতে লেখা—
মেরুদণ্ডী
অন্যটিতে—
অমেরুদণ্ডী
তারপর প্রাণীর নাম লেখা ছোট ছোট কার্ড বের করলেন।
গরু।
নুসরাত কার্ডটি মেরুদণ্ডী ঝুড়িতে রাখল।
কেঁচো।
আনিশা অমেরুদণ্ডী ঝুড়িতে রাখল।
মাছ।
সাফুয়ান মেরুদণ্ডী ঝুড়িতে রাখল।
প্রজাপতি।
আবাবিল অমেরুদণ্ডী ঝুড়িতে রাখল।
ব্যাঙ।
আসাদুল্লাহ মেরুদণ্ডী ঝুড়িতে রাখল।
শামুক।
মরিয়ম অমেরুদণ্ডী ঝুড়িতে রাখল।
সাপ।
আবু তালহা মেরুদণ্ডী ঝুড়িতে রাখল।
কাঁকড়া।
মেফতাহুল অমেরুদণ্ডী ঝুড়িতে রাখল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“সবগুলো সঠিক!”
মেফতাহুল বুক ফুলিয়ে বলল,
“আজ থেকে আমি প্রাণী শ্রেণিবিন্যাস বিশেষজ্ঞ!”
একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল
হঠাৎ আনিশা বলল,
“ম্যাডাম, যেসব প্রাণীর পা নেই, তারা কি সবাই অমেরুদণ্ডী?”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“না। এটা ঠিক নয়।”
সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল।
“পা আছে কি নেই—এটি মেরুদণ্ডী বা অমেরুদণ্ডী নির্ধারণের মূল বৈশিষ্ট্য নয়।”
তিনি বললেন,
“মূল বিষয় হলো প্রাণীর দেহে মেরুদণ্ড আছে কি না।”
আসাদুল্লাহ বলল,
“তাহলে সাপের পা নেই, কিন্তু সে মেরুদণ্ডী।”
“একদম ঠিক।”
“আর কেঁচোর পা নেই এবং সে অমেরুদণ্ডী।”
“ঠিক।”
ম্যাডাম বললেন,
“তোমরা বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করতে শুরু করেছ।”
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল
মেফতাহুল বলল,
“ম্যাডাম, বড় প্রাণী মানেই মেরুদণ্ডী?”
ম্যাডাম বললেন,
“না।”
“কেন?”
“আকার দিয়ে মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী নির্ধারণ করা যায় না।”
তিনি উদাহরণ দিলেন,
“চিংড়ি তুলনামূলক ছোট, কিন্তু এটি অমেরুদণ্ডী। আবার অনেক বড় প্রাণী, যেমন তিমি, মেরুদণ্ডী।”
নুসরাত বলল,
“তাহলে প্রাণীকে শুধু দেখে আন্দাজ করলে ভুল হতে পারে।”
“ঠিক। বিজ্ঞানীকে তথ্য ও বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করতে হয়।”
রহস্যের সমাধান
ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে দুটি কলাম তৈরি করলেন।
মেরুদণ্ডী প্রাণী| অমেরুদণ্ডী প্রাণী
মানুষ| কেঁচো
গরু| প্রজাপতি
মাছ| মশা
ব্যাঙ| মাছি
সাপ| চিংড়ি
পাখি| শামুক
ছাগল| কাঁকড়া
তিনি বললেন,
“এখন তোমরা কি বুঝতে পারছ, প্রাণীদের দেহের অভ্যন্তরীণ গঠন তাদের শ্রেণিবিন্যাসে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?”
সবাই বলল,
“হ্যাঁ!”
নতুন পাঁচ দরজা
ফারজানা মরিয়ম আবার বোর্ডে লিখলেন—
মাছ
উভচর
সরীসৃপ
পাখি
স্তন্যপায়ী
মেফতাহুল বলল,
“এগুলো কী?”
ম্যাডাম বললেন,
“এগুলো মেরুদণ্ডী প্রাণীদের পাঁচটি প্রধান দল।”
নুসরাত বলল,
“মেরুদণ্ডী প্রাণী আবার পাঁচ ভাগে ভাগ হয়?”
“হ্যাঁ।”
আনিশা বলল,
“তাহলে মাছ, ব্যাঙ, সাপ, পাখি আর মানুষ—সব মেরুদণ্ডী হলেও এক দলে নয়?”
“একদম ঠিক।”
আবাবিল বলল,
“তাহলে আমাদের সামনে আরও পাঁচটা রহস্যের দরজা খুলে গেল!”
ফারজানা মরিয়ম হাসলেন।
“ঠিক তাই।”
পরের অভিযানের সংকেত
ক্লাস শেষ হওয়ার আগে ম্যাডাম পাঁচটি ছবি বোর্ডে লাগালেন।
একটি মাছ।
একটি ব্যাঙ।
একটি সাপ।
একটি দোয়েল।
একটি গরু।
তিনি বললেন,
“পরের অধ্যায়ে আমরা এই পাঁচ প্রাণীর দলগুলোর মধ্যে প্রথম রহস্য—অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের আশ্চর্য জগৎ—নিয়ে কাজ করব।”
মেফতাহুল অবাক হয়ে বলল,
“কিন্তু ম্যাডাম, অমেরুদণ্ডীদের কথা তো আজই শিখলাম!”
“আজ পরিচয় হয়েছে। পরের অধ্যায়ে তাদের আরও কাছ থেকে চিনবে।”
মেফতাহুল বলল,
“তাহলে কেঁচো কি আমাদের অতিথি হবে?”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“হয়তো!”
মেফতাহুল সঙ্গে সঙ্গে নিজের চেয়ার একটু পিছিয়ে নিল।
“তাহলে আমি দূর থেকেই পর্যবেক্ষণ করব!”
শ্রেণিকক্ষ আবার হাসিতে ভরে গেল।
কিন্তু হাসির মধ্যেই শিক্ষার্থীদের মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পরিষ্কার হয়ে গেল—
প্রাণীকে বোঝার জন্য শুধু তার বাহ্যিক চেহারা নয়, তার দেহের গঠনও জানতে হয়।
আর সেই জ্ঞানই তাদের নিয়ে যাবে প্রাণীজগতের আরও গভীরে।
চলবে...
📝 অধ্যায় ৩: MCQ
১. মেরুদণ্ডের ভিত্তিতে প্রাণীকে প্রধানত কয় ভাগে ভাগ করা যায়?
ক) দুই ভাগে
খ) তিন ভাগে
গ) চার ভাগে
ঘ) পাঁচ ভাগে
২. কোনটি মেরুদণ্ডী প্রাণী?
ক) কেঁচো
খ) প্রজাপতি
গ) গরু
ঘ) শামুক
৩. কোনটি অমেরুদণ্ডী প্রাণী?
ক) ব্যাঙ
খ) সাপ
গ) পাখি
ঘ) কাঁকড়া
৪. নিচের কোন প্রাণীটি মেরুদণ্ডী?
ক) চিংড়ি
খ) মাছ
গ) কেঁচো
ঘ) প্রজাপতি
৫. প্রাণীকে মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী হিসেবে ভাগ করার প্রধান ভিত্তি কী?
ক) প্রাণীর রং
খ) প্রাণীর আকার
গ) প্রাণীর চলন
ঘ) মেরুদণ্ডের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি
উত্তরমালা:
১. ক | ২. গ | ৩. ঘ | ৪. খ | ৫. ঘ
লেখক: আশরাফ উল আসাদ