সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের অধিকার সমান এবং নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা, নাগরিক নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি রক্ষায় সরকার দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতদের মধ্যে সম্মানি বিতরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের চোখে কোনো নাগরিকের অধিকার ধর্ম, বর্ণ, মত বা পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা হতে পারে না। প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করার অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তিনি ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ এবং ‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাবার অধিকার সবার’—এই চেতনায় দেশের সব নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ধর্মীয় সহাবস্থানের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আবহমানকাল থেকেই এ দেশের মানুষ দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠানে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহ্যের অংশ।
শুভ জন্মাষ্টমীর মতো ধর্মীয় উৎসব শুধু একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতিরও প্রতিফলন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে জন্মাষ্টমী পালন করে আসছেন। এ উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতদের সম্মানি প্রদান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের প্রতি রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির পরিবেশ যাতে কোনো অপশক্তি নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করতে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাংলাদেশের মতো বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, উসকানি, বিদ্বেষ ছড়ানো কিংবা ধর্মীয় বিভাজন তৈরির চেষ্টা সামাজিক শান্তির জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধে নাগরিক সচেতনতার পাশাপাশি আইনের কার্যকর প্রয়োগও প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ধর্মীয় উৎসবের সময় নিরাপত্তা দেওয়া নয়; বরং সারা বছর প্রত্যেক নাগরিক যেন নিরাপদে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি পালন করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা।
ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একজন নাগরিক যে ধর্মেরই অনুসারী হন না কেন, তার উপাসনা, ধর্মীয় আচার পালন এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চর্চার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব হলো অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।
বাংলাদেশের সমাজে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, প্রশাসন ও জাতীয় উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন। তাই জাতীয় অগ্রগতির জন্য পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জন্মাষ্টমী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি হিসেবে এ দিনটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালন করা হয়। বিভিন্ন মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রার্থনা, পূজা, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শোভাযাত্রাসহ নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে সনাতন ধর্মাবলম্বী সব নাগরিককে শুভ জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে তিনি আসন্ন দুর্গাপূজারও আগাম শুভেচ্ছা জানান।
দুর্গাপূজা বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উৎসব নির্বিঘ্নে পালনের পরিবেশ তৈরি করা সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সকল নাগরিকের নিরাপত্তার ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আসন্ন ধর্মীয় উৎসবগুলোর ক্ষেত্রেও তার বাস্তব প্রয়োগ প্রত্যাশিত। পূজামণ্ডপ, মন্দির, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং উৎসবস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎসবের সময় মানুষের চলাচল, যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা নির্বিঘ্ন রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বিত ভূমিকা নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য, ভুয়া ছবি বা ভিডিও এবং উসকানিমূলক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে সামান্য ঘটনাও বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। তাই ধর্মীয় উৎসবের সময় যাচাই না করে কোনো তথ্য প্রচার না করা এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেকে বিরত থাকা নাগরিক দায়িত্বের অংশ।
একই সঙ্গে ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শান্তি, সহনশীলতা, মানবিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার বার্তা প্রচার করা হলে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে। ধর্মীয় মূল্যবোধকে বিভাজনের পরিবর্তে মানবিক ও সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে যে ‘রাষ্ট্র সবার’ ধারণাটি উঠে এসেছে, তা নাগরিকত্বের সমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের পরিচয়ের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত তার নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা। ধর্মীয় পরিচয় কোনো নাগরিকের নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণ হওয়া উচিত নয়।
একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ যদি নিজের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নিরাপদ বোধ করে, তাহলে সামাজিক আস্থা বাড়ে। আর সামাজিক আস্থা বাড়লে অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় উন্নয়নের পরিবেশও শক্তিশালী হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই সাংবিধানিক মূল্যবোধকে বাস্তব জীবনে কার্যকর করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের দায়িত্ব রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের শুভেচ্ছা নয়, বরং নাগরিক সমতা ও সামাজিক সম্প্রীতির একটি বৃহত্তর বার্তা উঠে এসেছে। তিনি ধর্মীয় বিভাজনের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নও অনেকাংশে নির্ভর করবে একটি শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক পরিবেশের ওপর। রাজনৈতিক মতপার্থক্য, ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও সামাজিক ভিন্নতা থাকলেও নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবার সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় ঐক্য আরও দৃঢ় হবে।
শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুরোহিত ও সেবাইতদের মধ্যে সম্মানি বিতরণও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রের সহযোগিতামূলক সম্পর্কের দিকটি তুলে ধরে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু উপাসনার স্থান নয়; অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা পালন করে।
প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের মূল সুর হলো—ধর্মীয় পরিচয় যার যার নিজস্ব বিশ্বাসের বিষয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার সবার সমান। এই ধারণা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের প্রতিটি ধর্মীয় উৎসব যাতে আনন্দ, শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে পালিত হয়, সে জন্য সরকার ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জন্মাষ্টমী থেকে দুর্গাপূজা—প্রতিটি উৎসবই যেন পারস্পরিক শুভেচ্ছা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও শক্তিশালী করার উপলক্ষ হয়ে ওঠে, সেটিই প্রত্যাশা।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে যে বার্তা দিয়েছেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ—যেখানে প্রত্যেকে নিজের ধর্ম পালন করবে স্বাধীনভাবে, প্রত্যেকে নিরাপত্তা পাবে সমানভাবে এবং জাতীয় জীবনে প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা থাকবে অভিন্ন।