‘রাজনীতির কচকচানি’ বাদ দিয়ে উন্নয়নের দিকে যেতে হবে: রাষ্ট্রপতি
বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে যুব সমাজের কোনো ‘বিকল্প নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘রাজনীতির কচকচানি’ দিয়ে এগোনো যাবে না, উন্নয়নের দিকে যেতে হবে।
রোববার সকালে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় যুব দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, “আজকে এটা প্রমাণিত সত্য যে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদের যুব সমাজকে কর্মমুখী করতে হবে, তাদের হাতে উৎপাদনের চালিকা শক্তি দিতে হবে।
“শুধুমাত্র আমরা রাজনৈতিক বিপ্লব করে, পরিবর্তন করে কিন্তু আমরা আমাদের দেশকে এগিয়ে যেতে পারবো না। একই সঙ্গে আমাদেরকে আমাদের দেশকে নির্মাণ করতে হবে।”
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমরা এতদিন সংগ্রাম করেছি দেশে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবার জন্য, এখন আমাদের সংগ্রামটা হচ্ছে এই দেশকে নির্মাণ করবার জন্য। বিল্ড দিস কান্ট্রি, বিল্ড দিস নেশন।”
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “মনে পড়ে আমাদের নজরুল ইসলামের একটা কবিতা- ‘কে আছো জোয়ান, হও আগোয়ন, হাঁকিছে ভবিষ্যৎ। এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার’।
“আমাদেরকে পার হতে হবে এবং এখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে, আমাদের উন্নয়নের দিকে যেতে হবে।”
সরকারপ্রধান তারেক রহমানের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, “তিনি বারবার করে বলছেন যে, যুবকদেরকে সামনে এগিয়ে আসতে হবে, তাদের দেশ গড়ার ক্ষেত্রে, আমাদের দেশকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, সর্বক্ষেত্রে তাদেরকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেছেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’।
“এটাই সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত। এমন বাংলাদেশ গড়তে যুবকদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যুব সমাজের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। যুব উন্নয়নে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান উদ্যোক্তাদের নেতৃত্বে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং তবেই ‘সবার জন্য বাংলাদেশ দর্শন’ বাস্তবায়িত হবে এবং পাবে এর পূর্ণতা।”
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এবারের জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে ‘জব ফেয়ার-২০২৬’ এর উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি।
এবারে যুব দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে-‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
অনুষ্ঠানে ‘জাতীয় যুব পুরস্কার ও ইয়ুথ ভলেন্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়।
রাষ্ট্রপতি চাকরি মেলা ঘুরে দেখেন এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
তরুণদের প্রতি আহ্বান
আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কাজে অবদানের রাখার স্বীকৃতি হিসেবে যারা জাতীয় যুব পুরস্কার ও ইয়ুথ ভলেন্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, তাদের অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমার বিশ্বাস তোমাদের এই অর্জন ও সাফল্য অন্য সকল তরুণ তরুণীর জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
“আমি একটা কথা বিশ্বাস করি, তা হচ্ছে নেভার গিভ আপ… কখনোই আমরা গিভ আপ করব না। আমরা লড়াই করব, আমরা এগিয়ে যাব, আমরা নিশ্চয়ই বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হব।”
‘রাজনীতির কচকচানি বাদ দিতে হবে’
রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমাদের সারাক্ষণ, আপনার রাজনীতির যে কচকচানি, এটা নিয়ে কিন্তু এগোনো যাবে না। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের গোটা জাতি ওই দিকেই চলে গেছে। এখান থেকে ফিরে আসতে হবে। উন্নয়নের দিকে যেতে হবে। দেশকে গড়ে তোলার দিকে যেতে হবে এবং সেটা সম্ভব।”
‘সংসদ কেন্দ্রিক রাজনীতি হওয়া উচিত’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ‘ফ্যাসিস্ট’ শক্তিকে সরিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টির কথা বলেছেন মির্জা ফখরুল।
তিনি বলেন, “এই সুযোগটা আমাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। আজকে পার্লামেন্ট হয়েছে, নির্বাচন হয়েছে।
“আমার মনে হয় যে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে আমাদের যুবক সমাজ তারা এই বিষয়টা লক্ষ্য করবেন যে এখন পার্লামেন্ট কেন্দ্রিক রাজনীতি হওয়া উচিত। পার্লামেন্টের মধ্য দিয়ে সমস্ত সমস্যার সমাধানগুলো হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।”
‘শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজনভিত্তিক হতে হবে’
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘সমস্যা’ থাকার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমি অনুরোধ করব যে শিক্ষাব্যবস্থাটা আমাদের আসলে ‘নিড বেইজড’ হওয়া দরকার….প্রয়োজনের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা হওয়া দরকার। বিএ, এমএ পাস করে কোনো চাকরি পায় না। অথচ বাপ-মায়ের জমি বিক্রি করে সবাই বিএ, এমএ পাস করে।”
“আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে দেখবেন, কলেজগুলো, ইউনিভার্সিটিগুলো সব এটাই করছে…অথচ যে ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটস, টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটস, বৃত্তিমূলক যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান, সেগুলোর সংখ্যা অনেক কম।”
মির্জা ফখরুল বলেন, “আমাদের দেশের একটা বিরাট অংশ বাইরে যায়। দেশের বাইরে থেকে রেমিটেন্স পাঠায়, ওটা আমাদের আয়ের একটা বিরাট উৎস। যদি আমরা শিক্ষিত দক্ষ যুবকদের পাঠাতে পারি বাইরে…আমরা অনেক বেশি বাজারটাকে দখল করতে পারব, আমরা অনেক বেশি আয় করতে পারব।”
এ বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্তত গুরত্বসহকারে দেখছেন, সরকার দেখছে বলেও তিনি আশা করছেন।
‘মাদক থেকে বের করে আনতে হবে’
সংগ্রামী জাতি হিসেবে এ দেশের মানুষের হতাশ না হওয়ার মনোভাব তুলে ধরে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “যুবকদেরকে আমি সবচেয়ে বেশি আহ্বান জানাতে চাই, যে সমস্যা এখন আমাদের অনেকটা ক্ষতি করছে, সেটা হচ্ছে মাদক সমস্যা। আমাদের যুবকদের মধ্যে মাদকের যে আসক্তি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, একটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, এটাকে বন্ধ করবার জন্য আমাদের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।”
যুবকদের হতাশার কারণ থাকার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “চাকরি পায় না, কাজ পায় না, যার পরে তখন দেখা যায় যে সে হতাশ হয়ে যায়। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদেরকে কাজ করতে হবে, প্রচারণা চালাতে হবে।”
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রসঙ্গে
নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুব সমাজকে সবার আগে রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষা না পাওয়ার আপেক্ষ জানিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “আমি মনে করি যে, যুব সমাজে এই বিষয়ে আন্দোলন করা দরকার…তাদের নিজেদের এবং প্রতিটি অঞ্চলে সংগঠন গড়ে তোলা, জনমত গড়ে তোলা, একটা আন্দোলন গড়ে তোলা যাতে, এই সমস্ত যে খারাপ বিষয়গুলো, যেগুলো আমাদের সমাজকে নষ্ট করছে, সেগুলোকে প্রতিরোধে করা যায়।”
‘উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করতে হবে’
একজন নারী উদ্যোক্তার স্বাবলম্বী হওয়ার কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, “আজকে আমাদের চ্যালেঞ্জটা কিন্তু এই জায়গায় যে, আমরা এই শক্তিগুলোকে কীভাবে চ্যানেলাইজ করতে পারি। সরকারের দায়িত্ব এই জায়গায় যে, সমস্ত উদ্যোক্তাদেরকে সাহায্য করা, তাদেরকে যতটা সম্ভব ট্রেনিং দেওয়া এবং সেই সঙ্গে তাদেরকে আমার মিনিমাম একটা ক্যাপিটাল দেওয়া, যাতে করে সে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে পারে। এই কাজটা আমাদেরকে করা দরকার।”
শুধু বড় বড় কোম্পানিকে ঋণ দিলেই হবে না, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরকেও সাহায্য করা ও ঋণ দেওয়ার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
“তাদেরকে যদি আমরা এভাবে সাহায্য করতে পারি…ঋণ দিতে পারি, সবচেয়ে উপকার তারা পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা কর্মক্ষম জনসংখ্যার সুবিধা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, “এটা আমাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। কারণ এটা সবসময়, সব দেশের কিন্তু চিরদিন থাকে না। কিছুদিন পরে দেখবেন বয়স্ক লোকের সংখ্যা বাড়ছে। তো সেই সময় কিন্তু কাজ করার ক্ষমতা কমে যাবে। আজকে যে যুবশক্তি আছে, তাকে যদি আমরা ঠিকমত কাজে লাগাতে পারি, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা এগিয়ে যেতে পারব।” যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবুল খায়ের ভুঁইয়া, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বক্তব্য রাখেন।