পছন্দের পদে তদবির, অপছন্দে যোগ নয়?
সরকারি চাকরিতে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় বদলির আদেশ দেওয়া হলেও অনেক কর্মকর্তা তা মানছেন না। কেউ অপছন্দের কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে বদলির আদেশ কার্যকর করতে দিচ্ছেন না, আবার কেউ তদবির করে পছন্দের জায়গায় বহাল থাকছেন। ফলে গত তিন মাসেই (জানুয়ারি-মার্চ) জনপ্রশাসন ক্যাডারের অন্তত ৮০ কর্মকর্তার বদলির আদেশ বাতিল করতে হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে।
উদাহরণস্বরূপ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাজনীন কাউসার চৌধুরীকে ৪ মার্চ আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে বদলি করা হলেও তিনি সেখানে যোগ দেননি। প্রায় তিন সপ্তাহ পর, ২৪ মার্চ তাঁর বদলির আদেশ বাতিল হয়। এমনকি তিনি বর্তমানে সচিবালয়ের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকেই ওই দপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
নাজনীন কাউসার প্রথম আলোকে জানান, তিনি বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকায় এবং কর্তৃপক্ষের চাহিদা থাকায় বদলির আদেশ বাতিল হয়েছে।
তবে শুধু তিনি নন, গত তিন মাসে জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের অন্তত ৮০ জন কর্মকর্তার বদলির আদেশ পরবর্তীতে বাতিল করা হয়েছে। সরকারিভাবে 'জনস্বার্থে বদলি'র কথা বলা হলেও অনেক কর্মকর্তা তা অমান্য করছেন।
পছন্দের পদে দীর্ঘ সময় থাকার চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। উপসচিব মিলিয়া শারমিন ছয় বছর ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। ৬ জানুয়ারি তাঁকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হলেও, দুই দিনের মধ্যে তাঁর বদলির আদেশও বাতিল হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, কর্মকর্তাদের বিশেষ দক্ষতার ভিত্তিতে কোথাও দীর্ঘ সময় রাখা যেতে পারে, তবে এত বেশি আদেশ বাতিল প্রশাসনের জন্য অস্বাস্থ্যকর দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ে বদলি হতে ব্যাপক তদবির হয়ে থাকে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, রাজউক, পেট্রোবাংলা, পিডিবি, সিটি করপোরেশন, ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস অন্যতম। এসব জায়গায় 'লোভনীয়' পদে থাকতে চাইলে কর্মকর্তারা নানা উপায়ে তদবির করেন।
এদিকে, সরকারি আচরণবিধি অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা যদি আইনসংগত কারণ ছাড়া সরকারের আদেশ অমান্য করেন, তাহলে তা 'অসদাচরণ' হিসেবে গণ্য হবে। এ নিয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে একটি নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে। তাতে তদবিরের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, 'কোনো কর্মকর্তাকে বদলির পর আদেশ বাতিল করা প্রশাসনের ব্যর্থতা। এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি অনাস্থা তৈরি হয় এবং প্রশাসনে খারাপ দৃষ্টান্ত গড়ে।' তিনি আরও বলেন, 'সরকার যেখানে বদলি করবে, সেখানেই যেতে হবে। তা না হলে এটি জনপ্রশাসনের ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হবে।'