গরমের তীব্রতায় ইসলামের শিক্ষা ও আমল
প্রকৃতির বৈচিত্র মহান আল্লাহর সৃষ্টির এক অপূর্ব নিদর্শন। ঋতুর পরিবর্তনের মাধ্যমে কখনো শীতের কনকনে ঠাণ্ডা, আবার কখনো গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ আমাদের জীবনে অনুভূত হয়। এই পরিবর্তন কেবল প্রাকৃতিক নিয়ম নয়; বরং এর পেছনে আছে গভীর তাত্পর্য ও শিক্ষা। ইসলামী দৃষ্টিতে শীত ও গ্রীষ্মের তীব্রতা জাহান্নামের নিঃশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত যা মানুষকে পরকাল স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আত্মশুদ্ধির পথে আহ্বান জানায়। তাই গরমের কষ্ট শুধু ভোগানি্ত নয়, বরং এটি একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর স্মরণ, ইবাদত বৃদ্ধি এবং মানবিক দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
গরমের তীব্রতা রহস্য : শীত-গ্রীষ্ম সবই মহান আল্লাহর অপরূপ সৃষ্টির নিদর্শন। রাত-দিনের পরিবর্তন, ঋতু বৈচিতর্্য এবং সৃষ্টির অনুপম নৈপুণ্য সবই মহান আল্লাহর মহিমা। ঋতুর পরিবর্তনে শীত ও গ্রীষ্ম আসে। একসময় তীব্র শীত আবার এক সময় তীব্র গরম অনুভূত হয়। শীত ও গ্রীষ্মের তীব্রতা আসে জাহান্নামের নিঃশ্বাস থেকে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, জাহান্নাম তার প্রতিপালকের কাছে অভিযোগ করে বলে, হে প্রতিপালক! আমার এক অংশ অপর অংশকে খেয়ে ফেলেছে। তখন আল্লাহ তাকে দুইটি নিঃশ্বাস ফেলার অনুমতি প্রদান করেন। একটি নিঃশ্বাস শীতকালে আর একটি গ্রীষ্মকালে। কাজেই তোমরা গরমের তীব্রতা এবং শীতের তীব্রতা পেয়ে থাকো।' (বুখারি, হাদিস : ৩২৬০)
গরমে জোহর নামাজ দেরিতে আদায় : গ্রীষ্মকালের তীব্র গরমে যোহর নামাজ দেরি করে আদায় করাই সুন্নাহ সম্মত আমল। দেরি করে আদায় করার অর্থ সময় ফুরিয়ে ফেলা নয়; বরং সময়ের মধ্যেই গরমের তীব্রতা একটু কমে গেলে যোহর নামাজ আদায় করা। সহিহ বুখারিতে প্রচণ্ড গরমের সময় জোহরের নামাজ ঠাণ্ডায় আদায় করা' শিরোনামের অধীনে অনেকগুলো হাদিস উলে্লখ করা হয়েছে। যেমন আবু জার (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)এর মুয়াজ্জিন আজান দিলে তিনি বললেন, ঠাণ্ডা হতে দাও, ঠাণ্ডা হতে দাও। অথবা তিনি বললেন, অপেক্ষা করো, অপেক্ষা কর। তিনি আরো বলেন, গরমের তীব্রতা জাহান্নামের নিঃশ্বাসের ফলেই সৃষ্টি হয়। কাজেই গরম যখন বেড়ে যায় তখন গরম কমলেই নামাজ আদায় করবে। এমনকি (বিলম্ব করতে করতে বেলা এতটুকু গড়িয়ে গিয়েছিল যে) আমরা টিলাগুলোর ছায়া দেখতে পেলাম। (বুখারি, হাদিস : ৫০৯)
তৃষ্ঞার্তকে পানি পান করানো : গরমের তীব্রতায় দ্রুত তৃষ্ঞা লেগে যায়। তৃষ্ঞার্তকে পানি পান করানো অন্যতম একটি আমল। গ্রীষ্মকালে এ আমলের সুযোগ তৈরি হয়। এ আমলের ফজিলতও অনেক। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে মুমিন কোনো মুমিনকে পিপাসার্ত অবস্থায় এক ঢোক পানি পান করাবে, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাকে মোহর করা পানি থেকে পান করাবেন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৪৯; আবু দাউদ, হাদিস : ১৬৮২)
গ্রীষ্মকালকে গালি না দেওয়া : আরব মুশরিকরা কোনো বিপদ বা পরীক্ষায় পতিত হলে সময়কে গালি দিত। এটি বড় অন্যায়। কারণ সময়ের ভালো ও মন্দ পরিবর্তন করেন স্বয়ং মহান আল্লাহ। তাই সময়কে গালি দিলে সেটি আল্লাহকে গালি দেওয়ার নামান্তর। আকাশ, বাতাশ, গ্রহ, নক্ষত্র, সূর্য, চন্দ্র সবই আগের মতই রয়েছে। কেনো কিছুরই দোষ নেই। দোষ কেবল মানুষের। তারাই জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। তাদের কৃতকর্মের জন্যই পৃথিবীতে বিপর্যয় নেমে আসে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, মানুষ সময়কে গালি দিয়ে আমাকে কষ্ট দেয়। অথচ আমিই সময় (সময়ের স্রষ্টা), সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে, আমি রাত-দিনের পরিবর্তন করি। ' (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৪৯১)
গরমের তীব্রতায় জাহান্নাম থেকে মুক্তি প্রার্থনা : গরমের তীব্রতা জাহান্নামের উষ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কাজেই তীব্র গরমে জাহান্নামের কথা স্মরণ করে মহান আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি প্রার্থনা করা উচিত। জাহান্নাম থেকে মুক্তি প্রার্থনার ভাষা এমন হতে পারে আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আ'উযু বিকা মিনান্নার।'
অর্থাত হে আল্লাহ। আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ৩বার জান্নাত প্রার্থনা করে, জান্নাত আল্লাহর কাছে দোয়া করে, হে আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করো। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ৩বার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে, জাহান্নাম আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, হে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাও। (তিরমিজি, হাদিস : ২৫৭২, ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪৩৪০)
পরিশেষে বলা যায়, তীব্র গরম মানুষের জন্য একদিকে যেমন কষ্টদায়ক, অন্যদিকে তেমনি এটি আত্মসংশোধন ও নেক আমল বৃদ্ধির সুযোগ এনে দেয়।
প্রকৃতির এই কঠিন পরিস্থিতিগুলো আমাদের আল্লাহর মহিমা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তাঁর প্রতি আরো বেশি নির্ভরশীল হতে শেখায়। তাই গরমের তীব্রতাকে শুধু কষ্ট হিসেবে না দেখে, বরং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ অর্জনের প্রচষ্টো চালানোই একজন সচেতন মুসলিমের প্রজ্ঞার পরিচয়।