শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়

ছয় মাসে স্বাস্থ্য খাত: কিছু উদ্যোগের গতি, সামনে রয়ে গেছে বড় চ্যালেঞ্জ

আশরাফ উল আসাদ • 04 সেপ্টেম্বর 2026, 10:40 দুপুর • 261 বার পঠিত
ছয় মাসে স্বাস্থ্য খাত: কিছু উদ্যোগের গতি, সামনে রয়ে গেছে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা কাঠামোগত সমস্যা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, জনবল সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি এবং ব্যবস্থাপনাগত জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সামনে তাই ছিল একদিকে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চাপ, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সংস্কার করার কঠিন দায়িত্ব।

বিএনপি সরকারের বর্তমান মেয়াদ প্রায় ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পথে। সময়ের বিচারে ছয় মাস খুব দীর্ঘ নয়। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের মতো একটি বিশাল ও জটিল ব্যবস্থায় এই সময়ের মধ্যেই কিছু তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং জরুরি সেবা কার্যক্রমের বাস্তবায়ন সম্ভব। একই সঙ্গে এই সময়ের মধ্যেই সরকারের নীতি, অগ্রাধিকার এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার কিছুটা প্রতিফলনও দেখা যায়।

এই ছয় মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে গেলে চিত্রটি একেবারে একমুখী নয়। একদিকে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, জেলা-উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা তদারকি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ দেখা গেছে। অন্যদিকে হামসহ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ, শিশু মৃত্যুর ঘটনা, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট, চিকিৎসক-নার্সের ঘাটতি এবং তথ্য ও সমন্বয়ের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।

ফলে ছয় মাসের এই সময়কে স্বাস্থ্য খাতের পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের সময় না বলে বরং সংকট চিহ্নিত করা, জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ভিত্তি তৈরির সময় হিসেবে মূল্যায়ন করাই বেশি বাস্তবসম্মত।

প্রথম বড় পরীক্ষা: শিশুদের টিকাদান

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিকে দ্রুত কার্যকর করা।

টিকাদান একটি দেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। সময়মতো টিকা না পাওয়া কিংবা কোনো কারণে টিকাদান কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুতই শিশুদের মধ্যে পড়তে পারে। বিশেষ করে হাম, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, পোলিওসহ প্রতিরোধযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে টিকাদানের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকায় বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই উদ্যোগকে স্বাস্থ্য খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়।

তবে প্রশ্নও রয়েছে—কেন এমন জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলো? কেন কিছু শিশু সময়মতো প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত হলো? কেন হামসহ প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাব তৈরি হওয়ার সুযোগ পেল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু বর্তমান ছয় মাসের কার্যক্রম দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এর পেছনে আগের সময়ের ব্যবস্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থা, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের দুর্বলতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

হাম নিয়ন্ত্রণে সাফল্য কতটা টেকসই হবে?

হাম নিয়ন্ত্রণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়া এবং এ রোগে মৃত্যুর ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করা নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর টিকা দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে শক্তিশালী করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

কারণ একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী, তা শুধু মহামারির সময় তার প্রতিক্রিয়া দিয়ে নয়, বরং মহামারি প্রতিরোধে তার সক্ষমতা দিয়েও পরিমাপ করা হয়।

তাই আগামী দিনে নিয়মিত টিকাদানের হার, প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা পৌঁছানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করার সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।

জরাজীর্ণ ব্যবস্থায় প্রশাসনিক গতি আনার চেষ্টা

স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রশাসনিক স্থবিরতা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।

দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসা। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের উপস্থিতি, নার্সের সংখ্যা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ওষুধের সরবরাহ এবং রোগী ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে।

নতুন সরকারের ছয় মাসে এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকদের উপস্থিতি এবং সেবার মান বাড়ানোর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানো অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু তদারকি তখনই কার্যকর হবে, যখন তার সঙ্গে থাকবে পরিমাপযোগ্য ফলাফল।

কতটি হাসপাতালে চিকিৎসকের উপস্থিতি বেড়েছে? কতটি হাসপাতালে জরুরি বিভাগ কার্যকর হয়েছে? রোগীরা কতটা দ্রুত সেবা পাচ্ছেন? ওষুধের ঘাটতি কতটা কমেছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হলে স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থাও বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা: পুরোনো সমস্যা, নতুন উদ্যোগ

চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা।

চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীর চাপ, সীমিত অবকাঠামো, জরুরি পরিস্থিতি এবং কখনো কখনো রোগীর স্বজনদের সঙ্গে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মপরিবেশকে কঠিন করে তোলে।

এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা এবং জরাজীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী চিকিৎসাসামগ্রী পরিবর্তনের প্রাথমিক উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। হাসপাতালের অবকাঠামো, রোগী ব্যবস্থাপনা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং চিকিৎসক-রোগী যোগাযোগের উন্নয়নও প্রয়োজন।

ওষুধের সংকট এখনো বড় বাধা

সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের।

কিন্তু বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতির অভিযোগ নতুন নয়। বিগত সময়ের অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্রয়ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সমস্যার প্রভাব এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে রয়েছে।

সরকারের ছয় মাসে এই ঘাটতি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি।

এর ফলে নিম্নআয়ের রোগীদের অনেক ক্ষেত্রেই হাসপাতালের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। শুধু ওষুধ নয়, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও সরকারি হাসপাতালে সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীদের বাইরে যেতে হচ্ছে।

এখানেই স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের সবচেয়ে বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

চিকিৎসা সরঞ্জাম: কেন এত ঘাটতি?

হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেই স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হয় না; সেই সরঞ্জাম কার্যকর অবস্থায় রাখা, প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে পরিচালনা করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করাও জরুরি।

বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালেই প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক সুবিধা সীমিত। কোথাও যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু তা ব্যবহারযোগ্য নয়। কোথাও যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু দক্ষ অপারেটর নেই। আবার কোথাও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম দীর্ঘদিন বন্ধ পড়ে থাকে।

এই চক্র ভাঙতে হলে শুধু নতুন যন্ত্রপাতি কেনা নয়, বরং ক্রয় থেকে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

মফস্বলে চিকিৎসক সংকট

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে পুরোনো সমস্যাগুলোর একটি হলো শহর ও গ্রামের মধ্যে চিকিৎসাসেবার বৈষম্য।

রাজধানী ও বড় শহরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তুলনামূলক বেশি উপস্থিতি থাকলেও উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সের সংকট প্রকট।

ফলে গ্রামের একজন রোগীকে অনেক সময় সামান্য জটিলতার জন্যও জেলা শহর কিংবা ঢাকায় যেতে হয়।

স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন একজন সাধারণ মানুষ নিজের উপজেলা বা কাছাকাছি এলাকায় প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা পাবেন।

এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগের পাশাপাশি তাঁদের গ্রামীণ এলাকায় কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।

শুধু নিয়োগ নয়, ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ

গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় জনবল সংকটের সমাধান শুধু নতুন চিকিৎসক নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

একজন চিকিৎসককে প্রত্যন্ত এলাকায় দীর্ঘদিন কাজ করতে হলে আবাসন, নিরাপত্তা, শিক্ষা সুবিধা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগের মতো বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হয়।

তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় চিকিৎসক ও নার্সদের গ্রামীণ এলাকায় ধরে রাখার জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

তথ্য ও সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন

স্বাস্থ্য খাতের সংকট মোকাবিলায় সঠিক তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে কোনো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে রোগীর সংখ্যা, মৃত্যুর সংখ্যা, আক্রান্ত এলাকার তালিকা, টিকা কভারেজ এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি সম্পর্কে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য জনগণকে জানানো জরুরি।

এই জায়গায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য প্রকাশ ও সমন্বয় নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কিছু বক্তব্য এবং সংকট মোকাবিলার কৌশল নিয়েও জনমনে ও সুশীল সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

স্বাস্থ্য সংকটে যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা কখনো কখনো মূল সমস্যাকেও আরও বড় করে তুলতে পারে।

তাই ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি শক্তিশালী, দ্রুত এবং তথ্যভিত্তিক জনসংযোগ কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

দুর্নীতি বন্ধ না হলে সংস্কার অসম্পূর্ণ

স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি।

ওষুধ ক্রয়, চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, নির্মাণকাজ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

একটি হাসপাতালের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যন্ত্রপাতি কেনা হলো, কিন্তু তা যদি ব্যবহার না হয়, তাহলে সেই অর্থ ব্যয়ের বাস্তব মূল্য কী?

একইভাবে ওষুধ কেনা হলেও যদি তা রোগীর হাতে না পৌঁছায়, তাহলে কাগজে থাকা সরবরাহ বাস্তবে কোনো সুফল দেয় না।

তাই স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অন্যতম প্রধান শর্ত।

ছয় মাসে কী সম্ভব, আর কী সম্ভব নয়

স্বাস্থ্য খাতের মতো বিশাল একটি ব্যবস্থাকে মাত্র ছয় মাসে পুরোপুরি সংস্কার করা বাস্তবসম্মত নয়।

একটি সরকারি হাসপাতাল তৈরি করতে সময় লাগে। চিকিৎসক তৈরি করতে বছরের পর বছর লাগে। নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। আবার একটি দুর্বল সরবরাহব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতেও সময় লাগে।

সুতরাং ছয় মাসের মূল্যায়নে সরকারের কাছে রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত হবে না।

কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে সরকার কী ধরনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে এবং সেই অগ্রাধিকারের বাস্তব ফল কী—সেটি মূল্যায়ন করা অবশ্যই সম্ভব।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, প্রশাসনিক তদারকি বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিকল্পনা ইতিবাচক উদ্যোগ।

অন্যদিকে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ ও সরঞ্জামের ঘাটতি, জনবল সংকট এবং তথ্য সমন্বয়ের দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

আগামী ছয় মাসই হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ

প্রথম ছয় মাসকে যদি সংকট চিহ্নিত করার সময় হিসেবে ধরা হয়, তাহলে পরবর্তী ছয় মাস হওয়া উচিত বাস্তবায়নের সময়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সামনে এখন কয়েকটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা জরুরি।

প্রথমত, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও নার্সের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, নষ্ট ও অকেজো চিকিৎসা সরঞ্জামের তালিকা তৈরি করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

পঞ্চমত, হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

ষষ্ঠত, স্বাস্থ্যখাতে ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।

সপ্তমত, রোগ ও মৃত্যুর তথ্য প্রকাশে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাকেন্দ্রিক। মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে যায়, চিকিৎসা নেয় এবং সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করে।

কিন্তু ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যনীতি হওয়া উচিত আরও বেশি প্রতিরোধমূলক।

টিকাদান, পুষ্টি, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জনসচেতনতা—এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করলে অনেক রোগের বোঝা কমানো সম্ভব।

হাম নিয়ন্ত্রণের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, একটি রোগ প্রতিরোধে আগে থেকেই শক্তিশালী ব্যবস্থা থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

জনগণের আস্থাই হবে সবচেয়ে বড় সূচক

স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য পরিমাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে জনগণের আস্থা।

একজন রোগী যদি মনে করেন সরকারি হাসপাতালে গেলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ ও পরীক্ষা পাওয়া যাবে, তাহলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি তাঁর আস্থা তৈরি হবে।

অন্যদিকে যদি হাসপাতালে গিয়ে ওষুধ না পাওয়া যায়, চিকিৎসক না পাওয়া যায় অথবা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বাইরে করাতে হয়, তাহলে মানুষের আস্থা কমে যায়।

এই আস্থা পুনর্গঠনই বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

উপসংহার

বিএনপি সরকারের প্রায় ছয় মাসের স্বাস্থ্য খাতের কার্যক্রম মূল্যায়ন করলে একটি মিশ্র চিত্র পাওয়া যায়।

একদিকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, হামসহ প্রতিরোধযোগ্য রোগ মোকাবিলায় বিশেষ উদ্যোগ, জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল তদারকির চেষ্টা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উন্নয়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ ইতিবাচক দিক হিসেবে সামনে এসেছে।

অন্যদিকে শিশুদের মধ্যে হাম ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব, শিশু মৃত্যুর ঘটনা, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি, চিকিৎসক-নার্স সংকট, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা এবং তথ্য ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।

তবে ছয় মাসে একটি দীর্ঘদিনের সমস্যাগ্রস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হওয়া উচিত ছিল সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং সমাধানের কার্যকর ভিত্তি তৈরি করা।

এখন প্রয়োজন সেই ভিত্তির ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী সংস্কার গড়ে তোলা।

বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা চায়, যেখানে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য রাজধানীমুখী হতে হবে না; যেখানে সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকবে; যেখানে চিকিৎসক ও নার্স পর্যাপ্ত থাকবেন; যেখানে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাপদে কাজ করবেন এবং যেখানে কোনো শিশুকে প্রতিরোধযোগ্য রোগে প্রাণ হারাতে হবে না।

এই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জরুরি প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, দক্ষ জনবল, স্বচ্ছ ক্রয়ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের দিকে আরও দৃঢ়ভাবে এগোতে হবে।

ছয় মাসে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, আগামী দিনগুলোর কাজ হবে সেসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর দেওয়া। আর সেই উত্তরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী হবে—বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অভিজ্ঞতা।