শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

ভালো স্বপ্ন মুমিনের আলোকবিতা

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 01 মে 2026, 04:56 দুপুর • 114 বার পঠিত
ভালো স্বপ্ন মুমিনের আলোকবিতা

মানবজীবনের এক বিস্ময়কর অধ্যায় হলো স্বপ্ন। ঘুমের নিস্তব্ধ অন্ধকারে মানুষ এমন এক জগতে প্রবেশ করে, যেখানে কখনো সে আনন্দ পায়, কখনো ভীত হয়, আবার কখনো পায় ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। ইসলাম স্বপ্নকে শুধু মানসিক প্রতিফলন হিসেবে দেখেনি, বরং এটিকে আল্লাহর এক নিদর্শন এবং কখনো কখনো সুসংবাদের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাই স্বপ্নের বিষয়টি ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তাঁর আরও নিদর্শন আছে-রাতে ও দিনে তোমাদের নিদ্রাযাপন।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ২৩)

এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে নিদ্রা এবং স্বপ্ন-উভয়ই আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, আমি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘সুসংবাদ ছাড়া নবুয়তের আর কোনো কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করল, সুসংবাদ কী? মহানবী (সা.) বলেন, ‘ভালো স্বপ্ন’।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৯৯০)

এ থেকে বোঝা যায়, ভালো স্বপ্ন মুমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ ও সুসংবাদ। আরেক হাদিসে আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) বলেন, ‘যখন কিয়ামত নিকটবর্তী হবে, তখন মুমিনের স্বপ্ন মিথ্যা হবে না। আর মুমিনের স্বপ্ন হলো নবুয়তের ৪৬ ভাগের এক ভাগ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৫৯০৬)

এটি স্বপ্নের গুরুত্ব ও মর্যাদা কতটা তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। স্বপ্ন তিন প্রকার হতে পারে—এক. আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য ও সুসংবাদমূলক স্বপ্ন, দুই. শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় বা কষ্টদায়ক স্বপ্ন, তিন. মানুষের নিজের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন। তাই মহানবী (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, ভালো স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর প্রশংসা করতে হবে এবং প্রিয়জনদের কাছে তা বলা যেতে পারে। খারাপ স্বপ্ন দেখলে বাম পাশে তিনবার থুতু নিক্ষেপ করতে হবে, শয়তান থেকে আশ্রয় চাইতে হবে এবং তা কাউকে বলা যাবে না। আবু সাইদ খুদরি (রা.)-থেকে বর্ণিত, তিনি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি পছন্দনীয়/ভালো স্বপ্ন দেখে, সে যেন আল্লাহর প্রশংসা আদায় করে এবং তা কারো কাছে বলতে চাইলে বলতে পারে। কেননা তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। অন্য বর্ণনায় আছে, সে যেন তা তার প্রিয়জন ছাড়া অন্য কারও কাছে ব্যক্ত না করে। আর যদি অপছন্দনীয় কোনো স্বপ্ন দেখে, তাহলে শাইতানের থেকে আশ্রয় কামনা করে এবং কারও কাছে যেন বর্ণনা না করে। কেননা তা শাইতানের পক্ষ থেকে দেখানো হয়েছে। তা কোনো ক্ষতি করতে পারে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৯৮৫)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আবু কাতাদাহ (রা.)-থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ভালো স্বপ্ন কিংবা অন্য বর্ণনায় আছে, সুন্দর স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে দেখানো হয় এবং খারাপ স্বপ্ন শাইতানের পক্ষ থেকে দেখানো হয়। তাই তোমরা স্বপ্নে খারাপ কোনো কিছু দেখলে, বাম দিকে তিনবার থুতু নিক্ষেপ করবে এবং বিতাড়িত শাইতান থেকে আশ্রয় কামনা করবে। কেননা তা তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৬৯৫)

মুমিনের স্বপ্ন সত্য, এবং মহানবী (সা.) স্বপ্নে তাঁকে দেখার বিষয়টিও সত্য। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে স্বপ্নযোগে দেখবে, সে অচিরেই জাগ্রত অবস্থায় দেখবে। অথবা বলেছেন, সে যেন আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখবে। কারণ শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৯২০)

অতএব, কেউ যদি স্বপ্নে নবীজিকে দেখে, তা সত্য স্বপ্ন হিসেবে গণ্য হবে। তবে ইসলাম মিথ্যা স্বপ্ন বর্ণনার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা দিয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, আবুল আসকা ওয়াসিলাহ ইবনে আসকা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সবচে বড় মিথ্যারোপ হলো-নিজ পিতা ছাড়া অন্য কারো দিকে পিতার নিসবত করা। স্বপ্নে না দেখেও স্বপ্নের দাবি করাও অনেক বড় মিথ্যা। আর মহানবী (সা.) যা বলেননি তা বলাও তাঁর প্রতি বড় মিথ্যারোপ হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৬৯৮০)

এই হাদিস প্রমাণ করে, স্বপ্নের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এর ক্ষেত্রে সততা অপরিহার্য। তাই স্বপ্ন শুধুমাত্র রাতের কল্পনা নয়; এটি মুমিনের জীবনে এক গভীর তাত্পর্যপূর্ণ বাস্তবতা। কখনো এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, কখনো সতর্কবার্তা, আবার কখনো আমাদের মনের প্রতিচ্ছবি। তাই স্বপ্নকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা, ভালো স্বপ্নে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং খারাপ স্বপ্নে তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করা—একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্ব।