স্যামসাংয়ে ড. সাইফুলের কর্মময় প্রায় দেড় দশক
স্যামসাং আরএন্ডডি ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ (এসআরবিডি) বাংলাদেশে অফিসিয়ালি যাত্রা শুরু করে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ডক্টর ন্যামকিউ লি ও সৈয়দ আহসান ফাহমির হাত ধরে প্রতিষ্ঠানটি এই দেশে আসে। সেখানে ২০১০ সালের ৬ ডিসেম্বর যোগ দেন ড. মো: সাইফুল ইসলাম।
ঘটনাক্রমে, ২০০৫ সালের একটা ঘটনা সামনে আসবে। সেবার বাংলাদেশ থেকে জাপানে ৯০ জনের মতো সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নেওয়ার কথা ছিল। সেখানে বেতনের প্রতিশ্রুতি ছিল ২-৩ লাখ টাকার মতো। ইন্টারভিউতে ফাহমি প্রথম হন। সাইফুল হন তৃতীয়। এটা ছিল বায়রার সভাপতির প্রজেক্ট। ওই সময়েই মালয়েশিয়ায় ২ লাখ লোক নেওয়ার কাজ শুরু হয় যেটা ছিল অনেক বড় প্রজেক্ট। আর জাপানের প্রজেক্টটা বাতিল হয়ে যায়। যে ৯০ জনের জাপান যাওয়ার কথা ছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ নকল সনদ জমা দিয়েছিল যা জাপানে ধরা পড়ে। পরবর্তীতে মাস্টার্স করতে ফাহমি যান দক্ষিণ কোরিয়ায়। সেখান থেকেই কোরিয়া স্যামসাং রিসার্চ সেন্টারে যোগদান ও পরবর্তীতে স্যামসাং রিসার্চ সেন্টারের সাথে বাংলাদেশে আসা।
ওখানেই ইন্টারভিউ দিয়ে স্যামসাং আরএন্ডডি ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ (এসআরবিডি) তে সাইফুল যোগদান করেন। তিনি যোগ দেন লিড ইঞ্জিনিয়ার লেভেল টু হিসেবে।
প্রাথমিক অবস্থায় সাইফুলসহ ৭ জন ছিলেন রিসার্চ সেন্টারে তাদের ল্যাবে। তাদের হাত ধরেই স্যামসাংয়ের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং (এস-ই ) ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এই ল্যাবে ১৭০/১৭৫ জনের মতো ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। যেহেতু ফাউন্ডার মেম্বার ছিলেন সাইফুলরা তাই তারা ট্রেনিং পেয়েছেন স্যামসাং কোরিয়া, স্যামসাং চায়না ও স্যামসাং ইন্ডিয়া থেকে।
পরবর্তীতে সাইফুল স্যামসাংয়ে কাজ করেন লিড পজিশনে। যিনি ল্যাব ম্যানেজার ছিলেন, তার অধীনে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রজেক্ট বাজেটিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ করতেন ।
২০১১ সালের পুরোটাই প্রায় ট্রেনিং পিরিয়ড হিসেবে কাটে সাইফুলদের। তখন তারা ছিলেন লার্নিং মোডে। স্যামসাংয়ের টেকনোলোজি, স্যামসাংয়ের কাজের ধরণ, ডিভাইস পরিচিতি এসব শিখছিলেন। শুরুতে তাদের কাজ ছিল স্যামসাংয়ের ফিচার ফোন ও অ্যান্ড্রয়েড ফোন নিয়ে।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাইফুল ও তার একজন কলিগকে পাঠানো হয় স্যামসাং নয়ডা, দিল্লিতে ট্রেনিংয়ের জন্য। সেখানে ২ মাসের ট্রেনিং নেন। ওখানে উদ্দেশ্য ছিল স্যামসাংয়ের কমার্শিয়ালাইজেশন, ফিচার ফোন ও অ্যান্ড্রয়েড ফোনের বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের পুরো সফটওয়ার রিলিজ হ্যান্ডওভার বুঝে নেওয়া। সেটা করে দেশে ফেরেন তারা। ওখানে লিড দিয়েছিলেন সাইফুলই।
দেশে ফেরার পর বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলে যতো ফিচার ও অ্যান্ড্রয়েড ফোন রিলিজ হতো তা সাইফুল ও তার দলের মাধ্যমে হতো। ২০১৪ এর শেষ পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা থাকে। এই সময়ে প্রায় ১০০ জনের টিম সাইফুল লিড করেন। তখন প্রচুর ইঞ্জিনিয়ার নেওয়া হয়েছিল। স্যামসাংয়ে সাইফুলের হাত ধরেই চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন ৫০ থেকে ১০০ জন ইঞ্জিনিয়ার। ৫০০ থেকে ১০০০ প্রার্থীর ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। বর্তমানে স্যামসাংয়ে যারা আছেন, তাদের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা ইঞ্জিনিয়ার সাইফুলের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন।
২০১২ ও ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকারকে ২ বিলিয়ন ডলারের একটা প্রস্তাব দিয়েছিল স্যামসাং কোরিয়া। তা হলো, স্যামসাংয়ের সমস্ত পণ্য উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশে ফ্যাক্টরি করা হবে। কিন্তু সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া হয়। যা সেই সময়ে খুব আলোচনা সমালোচনা তৈরি করেছিল। এত বড় অঙ্কের টাকার প্রস্তাব এবং কাজটা পরে চলে যায় ভিয়েতনামে। বাংলাদেশ একটি বড় সুযোগ হারায়।
ওই কাজটি বাংলাদেশের বাইরে চলে যাওয়ায় এই দেশে স্যামসাংয়ের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। যদিও তা হয়নি। তবে কাজের পরিসর কমে আসে। সেই ধাক্কায় পরবর্তীতে ধীরে ধীরে স্যামসাং প্রায় ৫০০ জনের মতো ইঞ্জিনিয়ারকে ছাটাই করে। প্রতিষ্ঠানটি চলতে থাকে ২০০ থেকে ২৫০ ইঞ্জিনিয়ারের ওপর ভর করে।
পরে এমডি বদল হলো। নতুন এমডি আসেন নতুন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে। সাইফুলের অধীনে ছিল বড় একটি টিম। সেটা কমে ২২ জনের মতো একটি দলে রূপ নেয়।
সাইফুলকে যে কাজের জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল সেটা চলে যাওয়ায় তাকে দেওয়া হলো স্যামসাংয়ের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম টাইজেন। টাইজেনের ৪.০ থেকে ৮.০ বাইনারি রিলিজ, গ্লোবাল বাইনারি ম্যানেজমেন্ট রিলিজ, পাবলিক রিলিজ নিয়ে কাজ করে সাইফুলের টিম। স্যামসাংয়ে তার প্রমোশন হয় লিড ইঞ্জিনিয়ার থেকে টেকনিক্যাল লিড, সেখান থেকে চিফ ইঞ্জিনিয়ার। স্যামস্যাংয়ে তার শেষ পদ ছিল সিনিয়র চিফ ইঞ্জিনিয়ার।
২০২৪ এর ১ জানুয়ারি স্যামসাং ছাড়েন সাইফুল। মোবাইল অপারেশন, টাইজেন অপারেটিং সিস্টেম, টাইজেনের মধ্যে স্যামসাংয়ের ফ্যামিলি হাব, রোবোটিক আরবি ফাইভ, স্যামসাং টিভি, স্যামসাং ফ্রিজ, স্যামসাং স্মার্ট ওয়াচ-এরকম অনেকগুলো বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন।
স্যামসাংয়ে থাকা অবস্থাতেই পিএইচডি শুরু করেন সাইফুল। ২০২০ সালের মার্চে মালয়েশিয়ায় তার পিএইচডি শুরু হয়।