সংসদে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ
করোনায় সৃষ্ট বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট উপস্থাপিত হলো জাতীয় সংসদে। আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল মোট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন বৃহস্পতিবার (১১ জুন)। এটি দেশের ৪৯তম এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রীর দ্বিতীয় বাজেট উপস্থাপন।
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা।
বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটার পর সংসদের অধিবেশন শুরুর পর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর অনুমোদনক্রমে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন শুরু করেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সীমিত আকারে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য এবং সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ডিজিটাল পদ্ধতিতে মাত্র পৌণে এক ঘন্টায় সংসদে বাজেট পেশ করা হয়। এরপর সংসদের অধিবেশন আগামী রবিবার (১৪ জুন) সকাল দশটা পর্যন্ত মুলতবী ঘোষণা করেন স্পিকার। এই বাজেট পাস হবে ৩০ জুন। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন অর্থবছর।
‘অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যত পথ পরিক্রমা’ শিরোনামের এই বাজেটে গতানুগতিক ধারা থেকে কিছুটা সরে এসে স্বাস্থ্যখাতকে সর্বাপেক্ষা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ, প্রণোদনা ও ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির প্রতি দেয়া হচ্ছে অগ্রাধিকার।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, 'প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ও এর অর্থনৈতিক প্রভাব দৃঢ়তার সঙ্গে কাটিয়ে ওঠার স্বার্থে আমরা গতানুগতিক বাজেট থেকে এবার কিছুটা সরে এসেছি। সে কারণে এবারের বাজেটে সরকারের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে কাঠানোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতকে এবার সর্বাপেক্ষা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ, প্রণোদনা ও ক্ষতিপূরণ ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।'
প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) এই খাতে বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা।
আ হ ম মুস্তফা কামাল আরও বলেন, 'কৃষি হচ্ছে আমাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত। আমরা অধিক খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ,সেচ ও বীজে প্রণোদনা, কৃষি পুনর্বাসনে জোর এবং সারের ওপর ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রাখব। আমাদের তৃতীয় অগ্রাধিকার খাত হচ্ছে দীর্ঘ সাধারণ ছুটি ও লকডাউনজনিত কারণে দরিদ্র কর্মজীবী মানুষের কষ্ট লাঘবে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা সম্প্রসারণ করা।'
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আংশিক বন্ধ থাকায় শিল্প উৎপাদন, এসএমই, সেবাখাত ও গ্রামীণ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মহীনতা এবং কর্মহীন হয়ে দেশে ফেরত আসা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ব্যাপক কর্মসৃজন ও পল্লী উন্নয়ন হলো চতুর্থ অগ্রাধিকার খাত। এছাড়া, কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার লক্ষ্যে বিভিন্ন আর্থিক ও প্রণোদনামূলক কার্যক্রমের ওপর এবারের বাজেটে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়ন ও মুজিববর্ষের একটি প্রধান কার্যক্রম হিসেবে গৃহহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহনির্মাণকেও অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে।'
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার কর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আয় আসবে মূলত আয়কর, ভ্যাট এবং আমদানি ও রফতানি শুল্ক থেকে। এনবিআর-বহির্ভূত করব্যবস্থা থেকে ১৫ হাজার কোটি এবং করবহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আহরিত হবে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি ব্যাংক ঋণ, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের অর্থে মেটানো হবে।
এর আগে দুপুর ১২টায় মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে সংসদে উপস্থাপনের জন্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেওয়া হয়।