সক্ষমতা যাচাই না করেই বিদেশী অখ্যাত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়েছিল
ক্রমবর্ধমান জনভারে রাজধানীর আবাসন সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে অনেক আগেই। এ সমস্যা ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ আকার নেবে বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে। রাজধানীবাসীর আবাসন সংকট কিছুটা লাঘবে ২০১৪ সালে কেরানীগঞ্জে ঝিলমিল আবাসন প্রকল্প হাতে নেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ৪৮০ বিঘা জমিতে মধ্য আয়ের মানুষের জন্য ১৩ হাজার ৭২০টি ফ্ল্যাট নির্মাণে মালয়েশিয়ান কোম্পানি বিএনজি গ্লোবাল হোল্ডিংস অ্যান্ড কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ২০১৭ সালের নভেম্বরে চুক্তি করে। পাশাপাশি লেক, খাল, খেলার মাঠসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা বাসিন্দাদের। সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছর। অথচ কোনো ধরনের কাজই শুরু করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে অনেক পরে হলেও রাজউকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এখন স্বীকার করছেন, কোম্পানিটির সক্ষমতা যাচাই না করেই তাদের ফাঁদে পা দিয়েছেন তারা।
বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু-১ থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে ঝিলমিল আবাসিক এলাকা। এর পাশ দিয়েই গেছে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। চুক্তি অনুযায়ী, কেরানীগঞ্জে ৮৫টি বহুতল ভবন নির্মাণের কথা ছিল মালয়েশিয়ার কোম্পানি বিএনজি গ্লোবালের। এর মধ্যে ৬০টি ভবন ২০ তলাবিশিষ্ট এবং ২৫টি ২৫ তলা। মোট ফ্ল্যাট বানানোর কথা ছিল ১৩ হাজার ৭২০টি। ফ্ল্যাটগুলোর আকার থাকবে ১ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ২০০ বর্গফুটের মধ্যে। প্রতিটি ভবন হবে ভূমিকম্প প্রতিরোধী। এতে ব্যবহার করা হবে সর্বাধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি। থাকবে লেক, পার্ক, খেলার মাঠ, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, মসজিদ, বাজার ও কমিউনিটি স্পেস। সেগুলোও কোম্পানিটির তৈরি করে দেয়ার কথা ছিল। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। কিন্তু বিদেশী প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ বছরে কোনো কাজ না করায় আবাসন সমস্যা সমাধানের সেই ঝিলমিল প্রকল্প এখন যেন রাজউকের ঘাড়ে বড় বোঝা।
রাজউকের একাধিক সূত্র জানায়, ঝিলমিল প্রকল্পটি শুরুর দিকেই যেসব প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই হয়েছে সেটি যথেষ্ট ছিল না। এমনকি বিদেশী ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা যাচাইও যথার্থভাবে হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি কতটা পরিচিত, কেমন কাজ করেছে, এত বড় বিনিয়োগের কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব হবে কি না—এসব বিষয় যাচাই না করেই অযোগ্য কোম্পানিটির সঙ্গে রাজউক চুক্তি করে ফেলে। এখন ঠিকই ভুগতে হচ্ছে সরকারের সংস্থাটিকে।
যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই না হওয়ার কারণে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নানা ফাঁদে পা দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রায়ই দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন বিদেশী পরামর্শক সংস্থা আমাদের সামাজিক ও পরিকল্পনাগত বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা ও উন্নয়নবিষয়ক পরামর্শ দিয়ে থাকে। আর সরকারি সংস্থাগুলোও দেশীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করেই সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগ্রহী হয়ে ওঠে। অথচ রাজউক-সংশ্লিষ্টরা যদি একটু ভেবে সিদ্ধান্ত নিত, তাদের নগর পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তাদের কাজে লাগাত তাহলেই বুঝতে পারত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এত উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের প্রজেক্ট একেবারেই মানানসই নয়। মালয়েশিয়ার কেউ একজন এসে বলল মালয়েশিয়ার মতো হাইরাইজ ভবন করে দেবে আর রাজউক সে ফাঁদে পা দেবে এটা তো হতে পারে না। এ ধরনের হাইরাইজ প্রকল্প আবাসনের মূল সংকটে থাকা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সামর্থ্যের বাইরে। যথাযথ জবাবদিহি না থাকার কারণেই রাজউক বারবার এ ধরনের ভুল কাজ করছে আর ঢাকার সমস্যা আরো বাড়িয়ে তুলছে।’
নগরবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্পে তৃতীয় পক্ষ দিয়ে সমীক্ষা করানো দরকার। সমীক্ষায় পরিবেশ থেকে শুরু করে বিনিয়োগ রিটার্ন আসা সবকিছুই থাকতে হবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার বলা সত্ত্বেও তারা ভেরিফিকেশন না করে নানান আজগুবি তথ্য দিয়ে ভ্যালিডিফিকেশন করে ফেলে। খুঁটিনাটি যাচাই-বাছাই না করে, আগের রেট বা দরকে যথাযথ প্রমাণ করে সমীকরণ মেলানো প্রস্তাব বা রিপোর্ট দেয়। এক্ষেত্রে যোগ্য লোকদেরও টিমে রাখা হয় না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। উত্তরায় রাজউক যে ফ্ল্যাটগুলো বানিয়েছে এগুলো মধ্যবিত্তদের জন্য করার কথা বলেছিল কিন্তু সেগুলো এখন কিনছে উচ্চবিত্তরা। পূর্বাচলেও একইভাবে ফেল হয়েছে।’
ঝিলমিল প্রকল্পে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শতভাগ শুল্ক মওকুফের জন্য আবেদন করেছিল মালয়েশিয়ান কোম্পানি বিএনজি গ্লোবাল হোল্ডিংস অ্যান্ড কনসোর্টিয়াম। এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং এনবিআরকে। কিন্তু প্রায় ৬০০ কোটি টাকার এ শুল্ক মওকুফে সায় মেলেনি কারো। এর মধ্যেই আবার গত ডিসেম্বরে ঝিলমিল প্রকল্পের জন্য আরো একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে তারা শুল্ক ছাড়ের দাবি না তুললেও মূল্য পরিশোধ নিয়ে দেনদরবার করছে। এ প্রস্তাবকে নতুন ফাঁদ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। তবে রাজউক-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, কোম্পানিটি নতুন করে প্রস্তাব নিয়ে আসায় অনেকটা অবাকই হয়েছে সবাই। ধারণা করা হচ্ছে, এতদিন সংস্থাটির কাছে বিনিয়োগের টাকা ছিল না। এখন হয়তো কোনো উৎস থেকে টাকা পেয়েছে তাই তারা কাজ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আবার এটা নতুন কোনো ফাঁদও হতে পারে।
প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদ সাদিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে কাজ শুরু করতে চাচ্ছে। এক্ষেত্রে তাদের চুক্তির যে শর্ত সেটা পূরণ করা এখন আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। আগের প্রেক্ষাপটে ছয় বছরের মধ্যে ঝিলমিলের সব ফ্ল্যাট বিক্রি করা সহজ ছিল। কিন্তু কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে।’
রাজউকের একটি সূত্র অবশ্য জানিয়েছে, মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠানটি ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে মার্কেটিং ও অন্যান্যভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। তবুও রাজউকের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজউক ও মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিছু গ্যাপ ছিল, সেগুলো পূরণে মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই
ঝিলমিল আবাসন প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।’