শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

সেহরির সময় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ, শরীরে আগুন নিয়ে বেরিয়ে আসেন সবাই

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 23 ফেব্রুয়ারি 2026, 03:18 দুপুর • 151 বার পঠিত
সেহরির সময় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ, শরীরে আগুন নিয়ে বেরিয়ে আসেন সবাই

চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরের ছয়তলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পরপরই আগুন ধরে যায়। তারপর শরীরে আগুন নিয়ে ঘর থেকে একে একে সবাই বের হয়ে আসেন। এমন দৃশ্যের কথা উঠে এসে এসেছে প্রতিবেশীদের বয়ানে।

এই দুর্ঘটনা ঘটেছে সোমবার ভোর ৪টা ৩১ মিনিটে নগরীর হালিশহর এইচ ব্লকে হালিম মঞ্জিল নামের ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে। দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিন শিশুসহ ৯ জন দগ্ধ হয়েছেন; তারা সে সময় সেহরি করছিলেন।

দগ্ধরা হলেন- আয়েশা (৪), আনাছ (৭), আইমান (১০), শাওন (১৭), সাখাওয়াত (৪৬), শিপন (৩২), সুমন (৪০), রানী (৪০) ও পাখি (৩৫)।

গ্যারেজ মালিক সাখাওয়াত হোসেন ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিলেন দেড় বছর আগে। সেখানে তিনি দুই সন্তান, স্ত্রী এবং তার গ্যারেজের এক কর্মচারীসহ পাঁচজন থাকতেন। কদিন আগে তার ছোট ভাই পরিবার নিয়ে তার বাসায় এসেছিলেন ডাক্তার দেখাতে। সাখাওয়াতের গ্যারেজটি হালিশহর এলাকায়।

দগ্ধ নয়জনের সবার অবস্থাই 'আশঙ্কাজনক' বলছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎকরা। দুর্ঘটনার পরপরই তাদের হাসপাতলে ভর্তি করা হলেও দুপুরে বার্ন ইউনিটের রেজিস্ট্রার আশফাকুল আতিক বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য ৯ জনকেই ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

ভর্তির পর হাসপাতাল বার্ন ইউনিটের প্রধান চিকিৎসক রফিক উদ্দিন আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “দগ্ধদের সকলেরই শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের সকলের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।”

তাদের মধ্যে রানী, পাখি ও সাখাওয়াতের শরীর শতভাগ পুড়ে গেছে। এছাড়া শিপনের ৮০, সুমন ও শাওনের ৪৫, আইমান ও আনাছের ২৫, আয়েশার শরীরের ২০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের (জোন-১) উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে রান্নাঘরে গ্যাস জমে ছিল। চুলার আগুন ধরাতে গিয়ে এ বিস্ফোরণ হয়ে আগুন ধরে যায়।”

এছাড়া ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রত্যেকটি ফ্ল্যাটের দরজা জানালা ভেঙে গেছে।

যা ঘটেছিল

সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলা ভবনটির নিচ তলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা। অন্য তলাগুলোতে চারটি করে ইউনিট আছে। তৃতীয় তলায় যে ফ্ল্যাটটিতে আগুন ধরে যায় সেটি ছাড়াও ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রত্যেকটি ফ্ল্যাটের দরজা জানালা ভেঙে গেছে। তৃতীয় তলায় লিফটের দরজা ভেঙে গেছে আর দ্বিতীয় ও চতুর্থ তলায় লিফটের দরজা বাঁকা হয়ে গেছে।

তৃতীয় তলায় সাখাওয়াত হোসেনের যে ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, সেটি ছাড়াও আরও তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে সেখানে। একটিতে পরিবার নিয়ে থাকেন জসীম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। তার ফ্ল্যাটটি সাখাওয়াতের ফ্ল্যাটের ঠিক মুখোমুখি।

পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন শামীমা আক্তার তমা নামে এক নারী। সেখানে তিনি একটি বিউটি পার্লার পরিচালনা করেন। অপর ফ্ল্যাটটির বাসিন্দারা সবাই ঢাকায় থাকার করার কারণে সেটি ছিল তালাবদ্ধ।

ওই তলার প্রতিটি ফ্ল্যাটের দরজা-জানালা ভেঙে যাওয়াসহ কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জসীম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সেহেরির জন্য ভোরে আমরা উঠেছিলাম। আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে বিকট শব্দে আমাদের ঘরের মূল দরজাসহ জানালার গ্লাসগুলো ভেঙে যায়। এমনকি ঘরের সিলিং ফ্যান বাঁকা হয়ে যায় ও ফ্রিজও পড়ে যায়।”

বিউটি পার্লারের কর্ণধার শামীমা আক্তার তমা জানান, বিস্ফোরণের সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার। এরপর তিনি দেখেন ঘরের দরজা উড়ে গিয়ে তার পার্লারের আলমারি ও শোকেসের গ্লাস ভেঙেছে।

তমা বলেন, “ওই বাসাটি থেকে চিৎকার শুনে দরজায় গিয়ে দেখি তারা দৌঁড়ে ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন। আর ঘরের ভেতর আগুন জ্বলছিল। বের হওয়ার সময় তাদের শরীরে আগুনও দেখা গেছে।

“বাসাটির ডাইনিং টেবিলে প্লেটে ভাত দেখা গেছে। মনে হচ্ছে সেহেরি খাওয়ার সময় বিস্ফোরণে আগুন ধরেছে। খাওয়ার শেষ দিকে হয়ত এ বিস্ফোরণ ঘটেছে।”

পার্লারের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা যায়, ভোর ৪টা ৩১ মিনিটের দিকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। এসময় ঘর থেকে চিৎকার শোনা যাচ্ছিল এবং ঘরের সবাই দৌঁড়ে বের হয়ে যাচ্ছেন। আগুন লাগা অবস্থায় এক নারীকে দৌঁড়ে নিচে নেমে যেতে দেখা যায়।

ভবনটির মালিক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী দিদারুল আলম; তবে তার পরিবার থাকে হালিশহর জি ব্লকে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দিদারুল বলেন, ১৬ বছর আগে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানে মোট ২২টি ইউনিট আছে।

দিদারুলের দাবি, ভবনের গ্যাস লাইনে ‘কোনো ধরনের ধরনের ত্রুটি ছিল না। সব সময় তারা সেগুলো মেরামত করে রাখেন।”

ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মো. সম্রাটের ভাষ্য, “বিস্ফোরণের শব্দ বিকট ছিল। মনে হচ্ছে ভবনসহ ভেঙে পড়ে যাবে।”

তিনি বলেন, “মূল ফটকের পকেট গেইট খুলে দিয়ে সেহেরি করে শুতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ বিস্ফোরণের পর দেখি উপরের থেকে ওই ঘরের লোকজন নেমে আসছে। তাদের সবাই দগ্ধ হয়েছিলেন।”