রোজা ও রমজান: পর্ব-১৬ বিষয়: রোজা ফরজ হওয়ার ইতিহাস
সিয়াম হচ্ছে ইসলামের গুরুত্বপূর্র্ণ একটি বিধানের নাম। মহান আল্লাহর হুকুম। সিয়াম সাধনা পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই প্রচলিত ছিল। হযরত আদম (আ.) চন্দ্রমাসের মাঝা-মাঝিতে সিয়াম পালন করতেন। তিনি তিনটি সিয়াম পালন করতেন। হযরত মূসা (আ.) মুহাররম মাসের ১০ তারিখে সিয়াম পালন করতেন এবং আসমানি কিতাব তাওরাত লাভ করার আগে ৪০ দিন সিয়াম পালন করেছিলেন। এজন্য ৪০ টি সিয়াম পালন করা ভালো মনে করতো। বিশেষ করে চল্লিশতম দিনটিতে সিয়াম পালন করা ফরয ছিল। বর্তমানের ইহুদীরা বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংসকে স্মরণ করে আগস্টের ৯ তারিখে সিয়াম পালন করে থাকে। এছাড়া ১৩ মার্চ, ১৭ জুলাই, ১৩ নভেম্বর এবং বিভিন্ন দিনে তারা সিয়াম পালন করে।
হযরত দাউদ (আ.) একদিন পরপর সিয়াম পালন করতেন। হযরত ইলিয়াস (আ.) ৪০ দিন পর্যন্ত সিয়াম পালন করতেন। হযরত দানিয়াল (আ.) এক সপ্তাহ সিয়াম পালন করতেন। অন্যান্য নবী-রাসূলগণও বিভিন্ন সময়ে সিয়াম পালন করতেন। হযরত নূহ (আ.) প্রতি মাসে তিনটি সিয়াম পালন করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতি মাসে তিনটি সিয়াম পালন করতেন। তিনি হিজরত করে মক্কা থেকে মদীনায় যাবার পর আরও একটি সিয়াম পালন করতেন। তা হচ্ছে মুহাররম মাসের দশম তারিখের সিয়াম। আমাদের দেশে এই সিয়ামকে আশুরার সিয়াম বলে থাকি।
তিনি আশুরার সিয়াম রাখার কারণ হচ্ছে, তিনি যখন মক্কা থেকে মদীনায় গেলেন সেখানে গিয়ে দেখলেন মদীনার ইহুদীরা আশুরার দিনে সিয়াম পালন করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এই দিনে সিয়াম পালন করার কারণ কি? তারা বলল, হযরত মুসা (আ.) যে দিন ফিরাউন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন ঐদিন তারা সিয়াম পালন করে ছিলেন। এই জন্য আমরাও আশুরার দিনে সিয়াম পালন করি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন মুসার অনুসরণ করার অধিকার আমাদের আরও বেশি। অর্থাৎ আমাদের জন্য উচিত মুসার অনুসরণ করা। তাই আমিও এই দিনে সিয়াম পালন করব।
এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিনে সিয়াম পালন করতেন। আশুরার সিয়াম পালন করার নিয়ম হচ্ছে হয়ত মুহররাম মাসের নবম এবং দশম তারিখ সিয়াম পালন করা নতুবা দশম এবং একাদশ তারিখে সিয়াম পালন করা। যেন ইহুদীদের সিয়ামের সাথে মিল না হয়। তবে মুহররাম মাসের দশম তারিখ সিয়াম পালন না করে, নবম এবং একাদশ তারিখে সিয়াম পালন করা নিষেধ। আশুরার এই সিয়াম পালন করা তখন ওয়াজিব ছিল। যা হোক এভাবে চলতে লাগল। কিছু দিন পর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সিয়ামের বিধান ঘোষণা করা হল। আয়াত নাযিল হল-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে।’
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর আশুরার সিয়াম রাখার ওয়াজিব বিধান বাতিল হয়ে গেল। এখন যদি কেউ রাখে সেটা সুন্নত হিসেবে আদায় হবে।
যা হোক ইসলামে সিয়াম ফরয হওয়ার পর এর নিয়ম-কানুন ছিল ভিন্ন রকম। যেমন ইসলামের প্রথম যুগে সিয়ামের বিধান ছিল হয়ত কেউ সিয়াম পালন করবে নতুবা সিয়াম পালন করবে না। যদি সিয়াম পালন করে তো ভাল। কিন্তু যদি কেউ সিয়াম পালন না করে তাহলে সে একটি সিয়ামের পরিবর্তে একজন ফকির বা মিসকিনকে দু বেলা পেট ভরে খাওয়াবে। কিছু দিন পর এই সুযোগ বাতিল ঘোষণা করা হলো। নাযিল হলো একটি নতুন আয়াত। যেই আয়াতে সিয়াম সম্পর্কে এই বিধান দেয়া হয়েছে যে, এখন থেকে যারাই রমযান পাবে তারাই সিয়াম পালন করতে হবে। এখন থেকে যদি কেউ সিয়াম পালন না করে তাহলে সে একটি সিয়ামের পরিবর্তে একজন ফকির বা মিসকিনকে দু বেলা পেট ভরে খাওয়ালে চলবে না। সিয়াম না রেখে গরীব, মিসকিনকে খাওয়ালে সিয়াম পালন থেকে মুক্ত হতে পারবে না। তাকে অবশ্যই সিয়াম পালন করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন-
فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
‘কাজেই এখন থেকে তোমাদের মধ্যে যারা এ মাসটি পাবে, সে অবশ্যই এ মাসের সিয়াম পালন করবে।’
তবে এই সিয়াম পালনের নিয়ম-নীতি ছিল একটু ভিন্ন রকম। যেমন, ইসলামের প্রথম দিকে সিয়াম পালনের সিস্টেম ছিল কেউ সিয়াম পালন করলে রাত্রের বেলায় এশার সালাতর পর ঘুমানোর আগে-আগে পানাহার এবং স্ত্রী সম্ভোগ করতে পারবে। কিন্তু এশার সালাতের পর ঘুমিয়ে পড়লে পরদিন ইফতার করার আগ পর্যন্ত আর কোনো ধরণের পানাহার এবং স্ত্রী সম্ভোগ করতে পারবে না। অতঃপর ‘কায়েস ইবনে সরমা’ নামক এক আনসারী সাহাবী সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত অবস্থায় বাড়িতে ফিরতেন। এক দিন তিনি এশার সালাত আদায় করে ঘুমিয়ে পড়লেন। কোনো কিছু পানাহার না করেই পরদিন সিয়াম পালন করেন। কিন্তু তিনি খুবই দুর্বল হয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ব্যাপার কি?’ তখন তিনি সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। (ইবনে কাছির)
এদিকে তাঁর ব্যাপারে তো এই ঘটনা ঘটেছে, ওদিকে হযরত ওমর (রাদি.) ঘুমিয়ে যাবার পর রাত্রে জেগে উঠে স্ত্রীর সাথে মিলিত হলেন। এমন দূর্ঘটনার জন্য অনুতপ্ত হলেন এবং সমাধানের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলেন। তিনি অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের সাথে এই দোষ স্বীকার করলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে। ফলে বিষয়টির সমাধান দিয়ে পবিত্র কুরআনের আরেকটি নাযিল হয়। আয়াতটিতে মহান আল্লাহ বলেন-
أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ .....
‘এখন থেকে সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য হালাল করে দেয়া হয়েছে যে, তোমাদের স্ত্রীদের সাথে মিলন করতে পার .....।’ সূরা বাক্বারা, আয়াত- ১৮৭
এই আয়াতটিতে একথা পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, মাগরীব থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত পানাহার এবং স্ত্রী সম্ভোগ বৈধ বা হালাল। সুতরাং আমরা এতক্ষণে এ কথা জানতে পারলাম যে, সিয়ামের বিধান সব যুগেই ছিল, ইসলামেও আছে এবং থাকবে। যদিও ইসলামের প্রথম দিকে সিয়ামের নিয়ম-কানুন ভিন্ন রকম ছিল। যা আমরা ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি। এখন সিয়ামের যে নিয়ম-কানুন আছে তা থাকবে, আর কোনো দিন পরিবর্তন হবে না। কারণ তা আমাদের কল্যাণের জন্য আমাদের উপর ফরয করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ
আয়াতটিতে বলা হয়েছে ‘তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমনভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিল।’
এই আয়াতে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছিল।’ অর্থাৎ পূর্ববর্তীরাও সিয়াম পালন করতেন, এর দ্বারা একটি উদ্দেশ্য হলো, আমরা যেন সিয়ামের কথা শুনে ঘাবড়ে না যাই। কেননা মানুষ যখন একাকীত্ব অনুভব করে তখন মানুষ ঘাবড়ে যায়। আর যদি জানতে পারে যে, এই ধরনের কাজ অন্যরাও করেছে, তখন মানুষ মানসিক শক্তি লাভ করে। ফলে ঐ কাজের জন্য উদ্যোগী হয়। কাজটি সম্পাদন করতে উদ্যোমী হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে কঠিন কাজটি করার জন্যও পরস্পরে প্রতিযোগিতা করার মনোভাব তৈরী হয়। তাই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের জানিয়ে দিলেন যে, সিয়াম পালন করা নতুন কিছু নয়, বরং তা পৃথিবীর শুরু থেকেই চলে আসছে। এ কথা শুনিয়ে তিনি আমাদেরকে সিয়াম পালনের জন্য মনোবল তৈরী করিয়েছেন। মানসিক শক্তি যোগিয়েছেন। তিনিই সিয়াম পালনের কাজটিকে আরো সহজ এবং বেগবান করার জন্য একথাও বলে দিয়েছেন-
أَيَّامًا مَعْدُودَاتٍ
অর্থাৎ রমযানের এ সিয়াম দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়, বরং তা হচ্ছে হাতেগণা কয়েকটি দিন। সুতরাং সিয়াম পালনে ঘাবড়ে যাবার কারণ নেই। আরও ভাববার বিষয় হচ্ছে, সিয়াম পালনের এই কয়েকটি দিনে কেউ অসুস্থ হলে বা দূরে কোথাও সফরে বের হলে সে ঐ দিনগুলোতে সিয়াম পালন না করে পরবর্তীতে অন্য সময়েও করতে পারবে। মহান আল্লাহ বলেন-
فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ
‘তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে সিয়াম পূর্ণ করতে পারবে।’ সূরা বাক্বারা, আয়াত- ১৮৪
অতএব সিয়াম পালন করা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক বা ফরয। যদি কেউ সিয়াম পালন না করে তাহলে তার জন্য রয়েছে কঠিন পরিণাম, আর যে সিয়াম পালন করবে তার জন্য রয়েছে সুসংবাদ। অনেক বড় ফযিলত।
মুফতি মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন
সাতাউক মধ্যগ্রাম, লাখাই, হবিগঞ্জ
আমলের কথা জানতে ইউটিউবে সার্চ করুন, 01712961470