শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

রাজধানীর যানজট নিরসনে বড় উদ্যোগ

আশরাফ উল আসাদ • 03 সেপ্টেম্বর 2026, 10:51 দুপুর • 79 বার পঠিত
রাজধানীর যানজট নিরসনে বড় উদ্যোগ

রাজধানীর যানজট নিরসনে বড় উদ্যোগ: ETC চালু, টার্মিনাল স্থানান্তর ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন পরিকল্পনা

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট, অপরিকল্পিত পরিবহনব্যবস্থা ও সড়কে শৃঙ্খলার সংকট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে রাজধানীর যানজট কমানো, ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৈঠকে রাজধানীর যান চলাচলকে আরও গতিশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে ETC বা Electronic Toll Collection সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা চালু হলে নির্দিষ্ট সড়ক বা অবকাঠামো ব্যবহারের টোল আদায়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে টোল প্লাজায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি কমানোর পাশাপাশি যান চলাচলের গতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার ঘিরে যানজট নিরসনেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে যানবাহনের চাপ, বিভিন্ন রুটের বাসের জটলা এবং সড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত যান চলাচল নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়িয়ে আসছে। বৈঠকে ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক যানজটের কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

রাজধানীর পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ঢাকার কেন্দ্রস্থলে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাসের অতিরিক্ত চাপ কমাতে টার্মিনালগুলোকে রাজধানীর প্রান্তবর্তী এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল স্থানান্তর করা হলে কেন্দ্রীয় ঢাকার সড়কগুলোতে বাসের চাপ কমানোর পাশাপাশি যাত্রী ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় নতুন শৃঙ্খলা আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে গাবতলী বাস টার্মিনালের সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলমুখী বাস চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গাবতলী। টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানো হলে দূরপাল্লার বাস ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা বাস কাউন্টার ও যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ তৈরি হবে।

রাজধানীর যানজটের সঙ্গে শুধু বাস বা ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা নয়, পণ্য পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনাও গভীরভাবে যুক্ত। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারওয়ান বাজার রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় সেখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পণ্যবাহী যান প্রবেশ ও বের হয়। বিশেষ করে ভোর ও সকালে পাইকারি বাজারকেন্দ্রিক যান চলাচল আশপাশের সড়কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।

কিচেন মার্কেট গাবতলীতে স্থানান্তর করা হলে কেন্দ্রীয় ঢাকার ওপর পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে শহরের ভেতরে পণ্য পরিবহনের পরিবর্তে প্রান্তিক এলাকায় বাজারকেন্দ্রিক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে এ সিদ্ধান্ত সফল করতে পরিবহন, বাজার ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের জন্য কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন হবে।

সচিবালয় এলাকাতেও পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এই এলাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী, দর্শনার্থী ও বিভিন্ন কাজে আসা মানুষের যানবাহন প্রবেশ করে। পর্যাপ্ত ও সুশৃঙ্খল পার্কিং ব্যবস্থা না থাকলে সড়কের একটি বড় অংশ পার্কিং হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা যান চলাচলের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে। তাই নির্ধারিত পার্কিং ব্যবস্থা উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অটোরিকশা চলাচলের ক্ষেত্রেও পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর সড়কে অটোরিকশার রুট, চলাচলের সময়, পার্কিং, যাত্রী ওঠানামা এবং অনুমোদিত এলাকার বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকলে একই সড়কে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চলাচল জটিলতা তৈরি করে। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে অটোরিকশা ব্যবস্থাপনাকে আরও শৃঙ্খলিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বৈঠকে অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব যানবাহন যথাযথ অনুমোদন ও নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ না করে যাত্রী পরিবহন করছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে যানবাহনের অনুমোদন, ফিটনেস, রুট পারমিট এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

রাজধানীর যানজট নিরসনে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সড়কের কার্যকর ব্যবহার, ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহনের রুট পুনর্বিন্যাস, পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, পথচারীদের চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং আইন প্রয়োগ—সবগুলো বিষয়কে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। বৈঠকে তাই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ হলো একই সড়কে নানা ধরনের পরিবহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল। বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, অটোরিকশা, রিকশা, মোটরসাইকেল, পণ্যবাহী ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলও অনেক ক্ষেত্রে সড়কের কার্যকর ধারণক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে একটি অংশে সামান্য যানজট তৈরি হলে তা দ্রুত আশপাশের একাধিক সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ETC ব্যবস্থার পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, রিয়েল-টাইম ট্রাফিক মনিটরিং, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ এবং তথ্যভিত্তিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা গেলে রাজধানীর যান চলাচল আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।

তবে প্রযুক্তি চালুর পাশাপাশি এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করার পর সেটি নিয়মিতভাবে পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আপগ্রেড করা না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।

ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল স্থানান্তর এবং গাবতলী টার্মিনাল সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তও বৃহত্তর পরিবহন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। শুধু টার্মিনাল সরিয়ে নিলে হবে না; নতুন টার্মিনালের সঙ্গে শহরের গণপরিবহন, রেল, সড়ক এবং অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকলে টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে দেওয়ার ফলে উল্টো যাত্রীদের অতিরিক্ত দুর্ভোগ তৈরি হতে পারে।

একইভাবে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও সরবরাহব্যবস্থা নতুনভাবে পরিকল্পনা করা জরুরি। ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের চলাচল, পণ্য ওঠানামা, পাইকারি ও খুচরা বিক্রির কাঠামো এবং পণ্যবাহী যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় নির্ধারণের মতো বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

সচিবালয় এলাকার পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়নও কেবল অতিরিক্ত পার্কিং স্পেস তৈরির বিষয় নয়। কোথায় গাড়ি থামবে, কতক্ষণ থামবে, কোন যানবাহন কোথায় প্রবেশ করবে এবং কোন এলাকায় পার্কিং নিষিদ্ধ থাকবে—এসব বিষয়ে কঠোর ও স্বচ্ছ নির্দেশনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এই নির্দেশনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ রাজধানীর যানজট নিয়ে বাংলাদেশে বহু বছর ধরে নানা পরিকল্পনা, প্রকল্প ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ধীরগতি, সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং নিয়মিত তদারকির ঘাটতির কারণে অনেক উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।

ঢাকার যানজট কোনো একক সংস্থার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, গণপরিবহন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসনসহ বহু পক্ষ সরাসরি যুক্ত। ফলে একটি সংস্থা একা কাজ করলে টেকসই সমাধান পাওয়া কঠিন।

যানজট নিরসনের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত নগর পরিবহন কর্তৃপক্ষের মতো কার্যকর সমন্বয় কাঠামো, যেখানে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকবে। কোন এলাকায় কোন ধরনের যান চলবে, কোথায় টার্মিনাল থাকবে, কোথায় বাজার থাকবে, কোথায় পার্কিং হবে এবং কোন রুটে গণপরিবহন চলবে—এসব সিদ্ধান্ত বিচ্ছিন্নভাবে না নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় নেওয়া প্রয়োজন।

ঢাকার মানুষের কাছে যানজট শুধু সময় নষ্টের সমস্যা নয়। প্রতিদিন কর্মঘণ্টার একটি বড় অংশ সড়কে আটকে থাকা, জ্বালানি অপচয়, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, মানসিক চাপ এবং ব্যবসায়িক উৎপাদনশীলতার ক্ষতির সঙ্গে যানজট সরাসরি যুক্ত। ফলে যানজট কমানো অর্থনীতির গতি বাড়ানো এবং নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

নতুন সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় ধাপে ধাপে কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সিদ্ধান্তগুলো কত দ্রুত, কতটা সমন্বিতভাবে এবং কতটা কঠোরতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তার ওপর।

ঢাকার যানজটের সমাধান কোনো একটি ফ্লাইওভার, একটি টার্মিনাল বা একটি প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর গণপরিবহন, সুশৃঙ্খল বাজারব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পার্কিং, কঠোর ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো সেই সমন্বিত উদ্যোগের দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো সিদ্ধান্তগুলো কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা। রাজধানীর কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে বাস্তবায়নের গতি, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দৃঢ়তা।