রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

প্যাসিফিক জিন্স: ভাঙা হচ্ছে পুরনো ভবন, চাকরি গেল ৫ হাজার শ্রমিকের

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 01 নভেম্বর 2026, 01:06 দুপুর • 6 বার পঠিত
প্যাসিফিক জিন্স: ভাঙা হচ্ছে পুরনো ভবন, চাকরি গেল ৫ হাজার শ্রমিকের

‘কাঠামোগত নিরাপত্তা ঝুঁকির’ কারণে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক কোম্পানি প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের একটি কারখানা ভবন ভেঙে ফেলা হচ্ছে।

এতে চাকরি হারাচ্ছেন প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক; যাদের পাওনা পরিশোধ প্রকিয়া শুরু হয়েছে।

প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেড বলছে, ৩৪ বছরের পুরনো ইউনিট-১ কারখানা ভবনে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়ায় কর্মরত শ্রমিকদের সব পাওনা দিয়ে চাকরির অবসান ঘটানো হচ্ছে।

তবে প্যাসিফিক জিন্সের অন্যান্য উৎপাদন ইউনিট ও প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের অন্যান্য কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়ছে।

পুরনো ভবন ভাঙার পর একই স্থানে নতুন কারখানা ভবন নির্মাণে পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রস্তাবিত নতুন ভবনে কারখানাটি চালু হলে ১০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলেও দাবি তাদের।

শনিবার থেকে সোশাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ছবি ও পোস্ট থেকে প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের কারখানা বন্ধ হওয়া নিয়ে নানা পোস্ট দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিষ্ঠানের তরফে একটি বিবৃতি পাঠান।

এতে বলা হয়, “তদারকি প্রতিষ্ঠান রেডি মেইড গার্মেন্টস সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি) কর্তৃক ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করায় প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের একটি পুরাতন ভবন ভেঙে নতুন অত্যাধুনিক শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন ভবনে কারখানাটি চালু হলে ১০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।”

গত দুদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্টে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে মন্তব্য করে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটির (বেপজা) নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) আবু সাঈদ মো. আনোয়ার পারভেজ বলেন, “প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের একটি ইউনিটের একটি ভবন বন্ধ হওয়া নিয়ে বিভিন্নভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, যার কোনো সত্যতা নেই।

“প্যাসিফিক গ্রুপের অন্য সবগুলো কারখানা আগের মতই চালু আছে। এই একটি ভবনের শ্রমিকরা ছাড়া বাকি সব কারখানার সব ইউনিটের শ্রমিকরা যথারীতি কর্মরত আছেন।”

প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপ শিল্পগোষ্ঠীর যাত্রা শুরু ১৯৮৪ সালে। চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) ১৯৯২-৯৩ সালে প্যান্সিফিক জিন্স লিমিটেডের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে কারখানাটি চালু হয়। যে ভবনটি ভাঙা হচ্ছে সেটি সিইপিজেড এ প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের প্রথম কারখানা ভবন।

প্রায় ৩৪ বছর পুরোনো ভবনটিতে আরএমজি সাস্টেইনেবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি) কর্তৃক বিশেষ কাঠামোগত নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং পরবর্তীতে বিস্তারিত প্রকৌশল মূল্যায়ন (ডিটেইল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট) পরিচালনা করা হয়। ওই মূল্যায়নের ফলাফলে ভবনটিতে ‘সম্ভাব্য কাঠামোগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি’ চিহ্নিত করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের ‘জীবন ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে’ ওই ভবনে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের বিবৃতিতে দাবি করা হয়।

ওই ভবনে কর্মরত শ্রমিকদের বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯ অনুযায়ী শনিবার (৩১ অক্টোবর) থেকে পর্যায়ক্রমে চাকরি অবসানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সকল শ্রমিকদের চাকরি অবসানজনিত প্রাপ্য সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য আইনানুগ পাওনা ও প্রযোজ্য সুবিধাদি (যেমন- প্রদেয় বেতন, ওভারটাইম ও অন্যান্য ভাতাদি, অব্যবহৃত অর্জিত ছুটির টাকা, নোটিশ পে, সার্ভিস বেনিফিট, মুনাফাসহ প্রভিডেন্ট ফান্ড) যথাযথভাবে পরিশোধ নিশ্চিত করছে বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়।

প্রত্যেক শ্রমিকদের চূড়ান্ত পাওনা তাদের স্ব স্ব ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে চাকরি অবসানের তারিখেই পরিশোধ করা হচ্ছে এবং তাদের পাওনার বিস্তারিত বিবরণ সংবলিত পে-স্লিপ এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুবিধার্থে অভিজ্ঞতার সনদ ও প্রশংসাপত্র প্রদান করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটি (বেপজা) নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) আবু সাঈদ মো. আনোয়ার পারভেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শ্রমিকদের টার্মিনেশন বেনিফিটসহ যত রকম পাওনা আছে সব দিয়ে গতকাল থেকে তাদের চাকরি অবসায়ন শুরু হয়েছে। প্রথমদিন কাটিং সেকশনের শ্রমিকদের পাওনা দেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে তিন সপ্তাহের মধ্যে সবার দেনা পরিশোধ করা হবে।

“প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের প্রস্তাবিত নতুন কারখানায় বর্তমান শ্রমিকদের পুনরায় নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।”

শিল্প পুলিশ চট্টগ্রাম এর পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পুরনো ভবন ভাঙার জন্য সেখানে উৎপাদন বন্ধ হচ্ছে। এখানে মোট প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। গতকাল ৫০৯ জনের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে।

“এ নিয়ে কোনো অসন্তোষ নেই। শ্রমিকদের সব রকমের পাওনা শ্রম আইন অনুসারে পরিশোধ করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের অভিজ্ঞতা সনদও দেওয়া হচ্ছে। যাতে পরবর্তীতে নিয়োগের বেলায় এই শ্রমিকরা অগ্রাধিকার পান।”

প্রস্তাবিত ভবনে ১০ হাজার কর্মসংস্থান

পুরনো যে ভবনের কত শ্রমিক ছিল তা প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের তরফে স্পষ্ট করা হয়নি।

প্যাসিফিক গ্রুপের অধীনে ১০টি কোম্পানিতে ৩৫ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত আছে।

প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের ইউনিট-১ এর যে ভবনটি ভাঙা হচ্ছে, সেখানকার প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর চাকরির অবসান হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেড বলঠে, কাঠামোগত নিরাপত্তাজনিত কারণে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেড তার দীর্ঘমেয়াদি শিল্প উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং কর্মীদের কল্যাণের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে।

“উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের চাকরি অবসানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আরএসসির নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন সাপেক্ষে প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি ভাঙার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।”

ভবন ভাঙা শেষ হলে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পর একইস্থানে একটি নতুন, ‘পরিবেশবান্ধব, অত্যাধুনিক ও বহুতলবিশিষ্ট’ কারখানা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত নতুন ভবনে কারখানা চালু হলে ১০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং প্রস্তাবিত নতুন কারখানায় বর্তমান শ্রমিকদের পুনরায় নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছে প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেড।

বেপজার নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) আবু সাঈদ মো. আনোয়ার পারভেজ বলেন, “প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেড বিশ্বে সুপরিচিত একটি কমপ্লায়েন্স প্রতিষ্ঠান। পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার কারণে আপাতত যে শ্রমিকদের চাকরির সমাপ্তি হচ্ছে তাদের পাওনা পরিশোধের বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।

“ভবিষ্যতে নতুন ভবন নির্মাণ হলে আরো আধুনিক মানের কারখানা হবে। সেখানে ১০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়েছে।” তবে প্রস্তাবিত ভবনের নির্মাণকাজ কবে নাগাদ শেষ হবে, সে বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে কিছু বলা হয়নি।