শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

পূর্ব তিমুর: মুসলমানদের হারানো ভূমি

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 24 এপ্রিল 2026, 05:00 বিকাল • 135 বার পঠিত
পূর্ব তিমুর: মুসলমানদের হারানো ভূমি

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপ রাষ্ট্র পূর্ব তিমুর। যার দাপ্তরিক নাম ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব তিমুর লেস্তে, সংক্ষেপে তিমুর লেস্তে বলা হয়। দেশটির পশ্চিমে আছে ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম তিমুর। একমাত্র ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেই পূর্ব তিমুরের স্থল সীমান্ত আছে। পূর্ব তিমুরের বেশির ভাগ ভূমি পাহাড়ি। সামান্য কৃষি ভূমি ও কিছু মৌসুমি নদীও আছে। এর অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল পূর্ব তিমুরের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ। দিলি পূর্ব তিমুরের সর্ববৃহৎ শহর ও রাজধানী। পূর্ব তিমুরের মোট আয়তন পাঁচ হাজার ৭৯৪ বর্গ মাইল। মোট জনসংখ্যা ১৩ লাখ ৪১ হাজার ৭৩৭ জন। জনগণের বেশির ভাগ খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসী। পূর্ব তিমুরে মুসলিমরা ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাস করে। আরডা (ARDA)-এর তথ্য মতে, পূর্ব তিমুরে মুসলমানদের সংখ্যা ৩.৫৯ শতাংশ। তবে এর ব্যতিক্রম তথ্যও পাওয়া যায়।

পূর্ব তিমুরে ইসলামের আগমন হয়েছিল আরব বণিকদের মাধ্যমে। খ্রিস্টীয় ১৩ থেকে ১৫ শতকে মুসলিম আরব ব্যবসায়ীরা ভারত সাগর পাড়ি দিয়ে জাভা হয়ে এই অঞ্চলে আগমন করেছিল। তাদের সঙ্গে ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিম ব্যবসায়ীরাও এই অঞ্চলে এসেছিল। মুসলিম ব্যবসায়ীরা এখান থেকে চন্দন কাঠ, মধু, মোম ও দাস সংগ্রহ করে ভারত, চীন ও আরবে নিয়ে যেত। তাদের মাধ্যমে এই অঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে ইসলামের প্রসার ঘটে, তবে তা ছিল খুবই সীমিত।

ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সুফি আলেম ও প্রতিবেশী মুসলমানরাও এখানে ইসলাম প্রচারে অবদান রাখেন। কিন্তু দ্বীপটি ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় এখানে ইন্দোনেশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের মতো মুসলিম বণিক ও সুফিদের বিচরণ ঘটেনি। পাশাপাশি ইসলামের রাজনৈতিক বিজয় না আসায় এখানে কখনোই ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটেনি। পূর্ব তিমুরে এখনো আরব বণিকদের বংশধররা টিকে আছে। তারা রাজধানী দিলির কাম্পুং আলোর জেলায় বসবাস করে।

১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব তিমুরে পর্তুগিজ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার আগে খ্রিস্টীয় ১৬ শতকে এখানে ইসলামের প্রসার সবচেয়ে বেশি হয়েছিল। পর্তুগিজরা এখানে খ্রিস্টধর্মের জোরাল প্রচার চালায়। খ্রিস্টান মিশনারি ও ঔপনিবেশিক প্রশাসন পরস্পরের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে তারা মুসলিমদের ওপর নানা ধরনের বিধি-নিষেধ আরোপ করে, মুসলিম বণিকদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণকারীদের নানা ধরনের সুবিধা প্রদান করে। ফলে দ্রুত ক্যাথলিক ধর্ম প্রসার লাভ করে এবং ইসলামের প্রসার স্তমিত হয়ে যায়। তারপরও উনিশ শতকের শেষভাগে ইয়েমেনের হাদারামাউত থেকে আলকাতিরি গোত্রের একদল আরব পূর্ব তিমুরে এসে বসতি স্থাপন করে।

১৯৭৪ সালে পর্তুগালে বিপ্লব ঘটলে পূর্ব তিমুরে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ইন্দোনেশিয়ার সেনা বাহিনী ১৯৭৫ সালে পূর্ব তিমুরে প্রবেশ করে। তারা পূর্ব তিমুরকে ২৭তম প্রদেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে একীভূত করার ঘোষণা দেয়। এ ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি ছিল—তিমুর দ্বীপের পশ্চিম অংশ ইন্দোনেশিয়ার, সুতরাং বাকি অংশও তাদেরই হওয়া উচিত। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবে পূর্ব তিমুরের জনগণ খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হলেও তারা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে যুক্ত। এছাড়াও পূর্ব তিমুর ইন্দোনেশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ভবিষ্যতে অন্যান্য অঞ্চলেও বিচ্ছিন্নতাবাদী মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। আভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে ইন্দোনেশিয়া পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতা মেনে নিতে বাধ্য হয়। ২০ মে ২০০২ সালে পূর্ব তিমুর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা লাভ করে।

পূর্ব তিমুরকে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে একীভূত করার পর ঔপনিবেশিক বাধা দূর হয়, ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। এ সময় মুসলমানদের হার ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ১৯৯৯ সালে পূর্ব তিমুরে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট হয়। রাজনৈতিকভাবে মুসলিম ইন্দোনেশিয়ার পক্ষে হওয়ায় গণভোটের আগে ও পরে মুসলমানরা ব্যাপক সহিংসতার শিকার হয়। এই সময় তারা দেশ ছেড়ে পশ্চিম তিমুরসহ ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য হয়। ফলে স্বাধীনতার পর পর পূর্ব তিমুরে মুসলমানদের দ্রুত কমে যায়। 

১৯৪০ সালে আরব মুসলিমরা দিলিতে প্রথম মসজিদ আন নুরের নির্মাণের কাজ শুরু করে। ১৯৫৫ সালে হাজি হাসান বিন আবদুল্লাহ বালাতিফ মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ করেন। আন নুর ছাড়াও দেশটিতে একাধিক মসজিদ ও প্রার্থনা কক্ষ আছে। পূর্ব তিমুরে মুসলিম প্রায় স্বাধীনভাবেই ধর্ম পালন করতে পারে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে মুসলিম প্রতিষ্ঠানে হালমার প্রবণতা দেখা যায়। মারি বিন আমুদি আলকাতিরি পূর্ব তিমুরের হাদরামি বংশোদ্ভূত একজন মুসলিম নেতা। তিনি দেশটির স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এবং ২০০২-২০০৬ পর্যন্ত এবং ২০১৭-২০১৮ পর্যন্ত দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।