শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
আন্তর্জাতিক

নেপালে হিমবাহ ধসে বন্যা: মৃত্যু বেড়ে ৫৭৯, নিখোঁজ ১,৯২৪

ড. মো: সাইফুল ইসলাম • 28 আগস্ট 2026, 05:15 বিকাল • 129 বার পঠিত
নেপালে হিমবাহ ধসে বন্যা: মৃত্যু বেড়ে ৫৭৯, নিখোঁজ ১,৯২৪

নেপালের উত্তরাঞ্চলে হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৫৭৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১০১ জন আহত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯২৪ জনে।শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই মৃতের সংখ্যা ৪১ জন বেড়েছে।

এদিন সকালে নেপাল পুলিশ ৪৬৯টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল। উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চলমান থাকায় হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

যেভাবে ঘটল বিপর্যয়

উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে, সঙ্গে নিয়ে আসে বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলি। এনডিআরআরএমএ জানিয়েছে, রাসুয়াগাদি সীমান্ত ক্রসিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লেন্দে নদীতে বরফ-পাথরের ধস নামে, যা থেকেই ভোটেকোশি ও ত্রিশুলী নদী ধরে কাদা-পাথরমিশ্রিত বন্যার স্রোত নিচের দিকে ধেয়ে আসে।কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিমোডের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাসুয়া থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ভাটিতে ধাদিং জেলার গালছিতে ত্রিশুলী নদীর পানি মাত্র ৩০ মিনিটে ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়।

এত দ্রুত পানি বাড়ায় ভাটির মানুষ কার্যত কোনো সতর্কবার্তা পাওয়ার সুযোগই পাননি।

বিপর্যয়টি ২৬ আগস্ট শুরু হয় এবং তিব্বত-নেপাল সীমান্ত দিয়ে ভোটেকোশি ও ত্রিশুলী নদীব্যবস্থায় প্রবল স্রোত, পলি ও বড় বড় পাথর বয়ে নিয়ে যায়।

যেসব এলাকা বিধ্বস্ত

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চীন সীমান্তঘেঁষা রাসুয়া জেলা। জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেসি বসতি দুটি বন্যার কবলে পড়ে। ভাটিতে নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিভিন্ন এলাকাও প্লাবিত হয়। সীমান্তের ওপারে তিব্বতের শিগাৎসে অঞ্চলের গিরং বন্দরেও কাদা ও ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানে।২৭ আগস্ট নাগাদ চিতওয়ানের সমতলে ত্রিশুলী ও নারায়ণী নদীর তীর থেকেও মরদেহ উদ্ধার শুরু হয়; পাশাপাশি নুওয়াকোট, ধাদিং, গোর্খা, তানহু এবং নওয়ালপরাসির দুই জেলা থেকেও মরদেহ পাওয়া যায়।

অর্থাৎ উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরেও প্রাণহানি ঘটেছে।

নতুন আশঙ্কা: উপচে পড়া হ্রদ

উদ্ধার অভিযানের মধ্যেই তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় দফা বন্যার শঙ্কা। ২৭ আগস্ট চীনা কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানায়, ধ্বংসাবশেষে নদী আটকে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার আয়তনের একটি বাঁধ-হ্রদ তৈরি হয়েছে এবং পানি প্রবেশের হার বিবেচনায় সেটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা প্রবল।শুক্রবার তিব্বতের দিকে একটি বাঁধ উপচে পড়ার খবর পেয়ে নেপাল পুলিশ নতুন করে সতর্কতা জারি করে; নিরাপত্তা ও উদ্ধারকর্মীদের উচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়।

নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অবি নারায়ণ কাফলে জানান, উদ্ধার অভিযান বন্ধ হয়নি, তবে তা চলছে উচ্চ সতর্কতার মধ্যে।চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির পানির উচ্চতা আগের দিনের তুলনায় ৩০ ফুটের বেশি কমেছে। তবে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী তিন দিনে বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে, যাতে হ্রদের পানির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।

উদ্ধার অভিযান

নিখোঁজদের সন্ধান, আটকে পড়াদের সরিয়ে আনা এবং ত্রাণ পৌঁছে দিতে ১৫ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী, কয়েক ডজন হেলিকপ্টার এবং একাধিক সংস্থার দল কাজ করছে। চিকিৎসা সহায়তার জন্য একটি সার্জিক্যাল মেডিকেল টিমও মোতায়েন করা হয়েছে।হেলিকপ্টারে করে ৩ হাজারের বেশি মানুষকে কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

নির্মাণাধীন আপার ত্রিশুলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে আটকে পড়া প্রায় ৩৫০ শ্রমিক ও বাসিন্দাকে প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রবল স্রোতের মধ্যেও উদ্ধার করেছে নেপালি সেনাবাহিনী।রেড ক্রস শুক্রবার জানিয়েছে, বন্যায় প্রায় ৯০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নেপালে রেড ক্রসের প্রতিনিধিদল প্রধান ডেভিড ফিশার কাঠমান্ডুতে সাংবাদিকদের বলেন, প্রায় ৯৩ হাজার মানুষের সহায়তা প্রয়োজন। এটি প্রাথমিক হিসাব, কারণ কিছু এলাকায় কেবল হেলিকপ্টারেই পৌঁছানো সম্ভব এবং সেখানে এখনো পৌঁছানো যায়নি। ত্রাণসামগ্রীবাহী রেড ক্রসের ট্রাকগুলো বন্যায় সৃষ্ট একটি হ্রদের কারণে আটকে পড়ে।

অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি

রাসুয়াগাদি, চিলিমে, ত্রিশুলী ৩এ, ত্রিশুলী ৩বি হাব ২২০ কেভি সাবস্টেশন, ত্রিশুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও দেবীঘাট জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতিতে জাতীয় গ্রিড থেকে আনুমানিক ৪৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাদ পড়েছে এবং নির্মাণাধীন আরও ৪৭০ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাসুয়াগাদি শুল্ক কার্যালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ৩০০-র বেশি যানবাহন ভেসে গেছে।সড়ক বিভাগের মুখপাত্র শুভরাজ নেউপানে জানিয়েছেন, প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ বেত্রাবতী-রাসুয়াগাদি সড়কটি পুরো দৈর্ঘ্যজুড়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, একাধিক জায়গায় সড়ক পুরোপুরি বিলীন হয়েছে এবং কয়েকটি কংক্রিটের সেতু ভেসে গেছে।

নিখোঁজদের বড় অংশ পর্যটক

দুর্গত এলাকাটি ল্যাংটাং ট্রেকিং রুটের প্রবেশপথ হওয়ায় নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক, যাদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, বোর্ড, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও পর্যটন খাতের অংশীজনেরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অবস্থানরত পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের অবস্থান ও নিরাপত্তা যাচাইয়ে কাজ করছে।

চীনের দিকের পরিস্থিতি

চীনের দিকে জীবিত উদ্ধারের বিষয়ে খুব একটা তথ্য পাওয়া যায়নি। শুক্রবার সেখানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচে, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে গ্রাম খালি করার ছবি প্রচারিত হয়। এর আগে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল, চীনের দিকে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। গিরং বন্দর এলাকায় সড়ক যোগাযোগ, টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সাড়া

নেপালে সাম্প্রতিক ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মানবিক সহায়তা হিসেবে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বৃহস্পতিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মাহবুবুর রহমান তুহিন এ তথ্য জানান। প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে বাংলাদেশ জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশটির উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে যেকোনো সহায়তা দিতে ঢাকা প্রস্তুত।যুক্তরাষ্ট্র জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র, বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনসহ ত্রাণসামগ্রী সরবরাহে ৫ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে উদ্ধার অভিযানে বিদেশি দল নিতে রাজি হয়নি কাঠমান্ডু। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে কোনো বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই; নিজস্ব নিরাপত্তাবাহিনী ও উদ্ধারকারী দলগুলোই পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম — একাধিক দেশ নিজেদের নাগরিকদের উদ্ধারে সহায়তার প্রস্তাব দিলেও তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এক বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার

এই একই নদীতে অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার এমন বিপর্যয় ঘটল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে লেন্দে নদীতে হিমবাহ-উৎসারিত বন্যায় রাসুয়াগাদির নেপাল-চীন মৈত্রী সেতু ধ্বংস হয় এবং এক ডজনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। সেতুটি সম্প্রতিই পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল।উপগ্রহচিত্র ও ভূকম্পন তথ্য বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে হিমবাহ ধসের ঘটনাই ঘটেছে, যার পেছনে ভূতাত্ত্বিক উত্থান ও জলবায়ু উষ্ণায়নজনিত অস্থিতিশীলতা দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে।

হিমবাহ পাতলা হয়ে আসা এবং উঁচু পাহাড়ের ঢাল ধরে রাখা পার্মাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় বরফ-পাথরের ধস ও তার ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা আরও ঘন ঘন ঘটছে, আর ভাটির মানুষ প্রায় কোনো সতর্কতার সময়ই পাচ্ছেন না।

#প্রাকৃতিক দুর্যোগ #দুর্ঘটনা #পর্যটন