শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

নাটোরের প্রাচীন ও পরিত্যক্ত আবদাল সম্প্রদায়ের মসজিদ

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 07 মে 2026, 04:45 দুপুর • 94 বার পঠিত
নাটোরের প্রাচীন ও পরিত্যক্ত আবদাল সম্প্রদায়ের মসজিদ

নাটোর জেলার অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হলো বাগাতিপাড়া। ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং উপনিবেশিক শিল্প-উন্নয়নের নানা স্মৃতি এ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা ও নিদর্শনে সংরক্ষিত রয়েছে। পদ্মা নদীর শাখা বড়াল নদী থেকে উত্পন্ন একটি বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় নদী—এই অঞ্চলের ভূগোল, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই নদীকেন্দ্রিক জনপদের ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন স্থাপনা— আবদালের মসজিদ, যা আজ প্রায় বিস্মৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পরিণত। 

আবদাল সম্প্রদায় : ঐতিহাসিক অনুসন্ধান ও লোকমুখে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, বড়াল নদী হতে উত্পন্ন একটি নদী এ অঞ্চল দিয়ে প্রবাহমান ছিল। এই নদী শুধু একটি জলধারা ছিল না; বরং এটি ছিল একটি সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। ঝিনুক ও শামুকের প্রাচুর্যের কারণে এখানে গড়ে ওঠে একটি গুরম্নত্বপূর্ণ শিল্প— চুন উত্পাদন। প্রাচীন বাংলায় চুন ছিল নির্মাণশিল্পের অপরিহার্য উপাদান। ঝিনুক ও শামুক পুড়িয়ে উত্পাদিত চুন ব্যবহার হতো দালান-কোঠার গাঁথুনি, পস্নাস্টার, এমনকি অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যবর্ধনেও। এই চুন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল এক বিশেষ জনগোষ্ঠী ‘আবদাল’ সমপ্রদায়। আরবি উত্সজাত শব্দ আবদাল অর্থ সাধক বা দরবেশ শ্রেণীর মানুষ; তবে এখানে এটি একটি পেশাভিত্তিক মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নির্দেশ করে, যারা মূলত চুন উত্পাদন ও সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত ছিল। 

আবদাল সম্প্রদায়ের মসজিদ নির্মাণ : বাগাতিপাড়া উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ক গবেষক আজিজুর রহমান, উপজেলা আনসার ও ভিডিপি অফিসার (অব.)-এর সাক্ষাত্কার ও অপ্রকাশিত পা্লুলিপি থেকে এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, প্রায় ৩০০ বছর আগে সম্ভবত বাংলায় নওয়াবি শাসনের প্রতিষ্ঠাতা নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ (১৯০০-১৯২৭)—এর শাসনামলে বাগাতিপাড়া উপজেলার চকমাহাপুর গ্রামে নদীর তীরে আবদাল সমপ্রদায়ের লোকজন এমসজিদ নির্মাণ করেন। স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণকৌশলের দিক থেকে এটি ছিল অত্যন্ত উন্নতমানের, যা সেই সময়কার গ্রামীণ স্থাপত্যে এক ব্যতিক্রমী নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। স্থানীয় জনগণের কাছে এটি ‘আবদালের মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। 

মসজিদের বর্তমান অবস্থা : কালের প্রবাহে এই অঞ্চলের নদ-নদী, খাল-বিল ধীরে ধীরে ভরাট হতে শুরু করে। ফলে ঝিনুক ও শামুকের উত্পাদন হ্রাস পায় এবং একসময় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় চুন শিল্প। এর ফলে আবদাল সমপ্রদায়ের মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে এবং জীবিকার তাগিদে তারা বিকল্প পেশা গ্রহণ করে। এই পেশাগত পরিবর্তনের ফলে তাদের সামাজিক মর্যাদা হ্রাস পায় এবং মূলধারার সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। আবদাল সমপ্রদায়ের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তাদের নির্মিত মসজিদটিও পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন অযত্ন ও অবহেলায় এটি জঙ্গলে আচ্ছাদিত হয়ে যায় এবং বর্তমানে একটি বিলুপ্তপ্রায় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বা সরকারি উদ্যোগে এখন পর্যন্ত এর সংরক্ষণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে এই মসজিদ আজ ইতিহাসের অন্তরালে হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ মসজিদ কখনো পরিত্যক্ত হতে দেওয়া যায় না। মসজিদ আল্লাহর ঘর এবং যতদিন ঈমান থাকবে, ততদিন মসজিদও জীবন্ত থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। যথাযথ গবেষণা, সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা সময়ের দাবি। অন্যথায়, ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে এটি কেবল লোককথার একটি অস্পষ্ট অধ্যায় হয়ে থাকবে।