শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

মৌমাছির স্বভাব ও মুমিনের জ্ঞানতৃষ্ণা

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 23 এপ্রিল 2026, 12:53 দুপুর • 108 বার পঠিত
মৌমাছির স্বভাব ও মুমিনের জ্ঞানতৃষ্ণা

প্রকৃত মুসলমান ময়লার মাছির মতো নির্লজ্জ নয় যে, সে মানুষের পেছনে লেগে থাকবে এবং তার থেকে ভালো-মন্দা যা-ই পাক তা গ্রহণ করবে। মুসলমানের স্বভাব হলো সে সর্বত্র সর্বোত্তম জিনিসের সন্ধান করবে। এমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তির প্রশংসা করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুসংবাদ দাও আমার বান্দাদেরকে, যারা মনোযোগসহ কথা শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম তা গ্রহণ করে। তাদেরকে আল্লাহ সত্পথে পরিচালিত করেন এবং তারাই বোধশক্তি সম্পন্ন।’ (সুরা ঝুমার, আয়াত : ১৭-১৮)

যে কোনো সভ্যতা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও জ্ঞানের ব্যাপারে এটাই মুমিনের নীতি ও আচরণ। সে যে কোনো বিষয়ের সর্বোত্তম অংশটুকু গ্রহণ করে, সঞ্চয় করে এবং নিজের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে। সাহিত্য-সংস্কৃতির ব্যাপারে মুমিনের উপমা মৌমাছি। মৌমাছি আল্লাহর নির্দেশনায় পরিচালিত হয়, সে বৃক্ষ তরু লতা ফল ও ফুলের জগতে বিচরণ করে। সেখান থেকে উত্তম খাবার গ্রহণ করে। এরপর আল্লাহর নির্দেশনা অনুসারে ফিরে আসে। খাবার হজম হওয়ার পর তার থেকে উপাদেয় মধু বের হয়, যাতে আল্লাহ মানুষের আরোগ্য রেখেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের উপমা মৌমাছির মতো। সে কেবল উত্তম জিনিস খায় এবং উত্তম জিনিসই প্রদান (বা ত্যাগ) করে।’ (জামিউস সগির, হাদিস : ৫৮৪৭)

সুতরাং একজন পরিণত মুসলিম, যে ঈমান ও জ্ঞানে সুদৃঢ়—সে যে কোনো দর্শন, আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতি অথবা অন্য কিছু পাঠ করতে পারে। অতঃপর সেগুলো থেকে সে কেবল তা-ই বেছে নেবে যা তার বিশ্বাস, অস্তিত্ব, জ্ঞান ও মূল্যবোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। আর যা কিছু স্রষ্টার অস্তিত্ব, সৃষ্টিজগত, মানুষ, জীবন ও ইতিহাসের ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মেলে তা। কোনো এক কবি বলেছেন, ‘তিনি যা গ্রহণ করেন স্বচ্ছ উপলব্ধির সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং যা বর্জন করেন তা বিচক্ষণতার সঙ্গেই বর্জন করেন।’

একজন মুমিন যখন পরিপক্কতা ও জ্ঞানের গভীরতা অর্জন করে তখন সে কোন মতবাদ বা মতাদর্শ পাঠ করল তা নিয়ে ভয়ের কিছু নেই, যেমন একজন অভিজ্ঞ সাতারু ও দক্ষ ডুবুরি পানিতে নামলে কোনো ভয় থাকে না। ভয় সেই ব্যক্তিকে নিয়ে যে সাতারে অদক্ষ এবং যে জানে না সমুদ্রের তলদেশ কেমন। একজন দক্ষ সাতারু যেমন সমুদ্রের চোরাগুপ্ত স্রোত এবং বিপজ্জনক এলাকা এড়িয়ে এগিয়ে যায়, জ্ঞানে-প্রজ্ঞায় অগ্রসর মুসলিম বিপজ্জনক মত ও মতাদর্শ দেখেও তা এড়িয়ে সামনে এগিয়ে যায়, সে প্রবৃত্তি পূজারীদের মায়াজাল ছিন্ন করে নিজের ঈমান ও ইসলামকে রক্ষা করে।

সত্য ও জ্ঞানের অনুসন্ধান বন্ধ করে দেওয়া কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়, এমনকি তা ইসলামের নামে হলেও না। সুতরাং পূর্ববর্তী আসমানি ধর্মের সব জ্ঞান, বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসীদের সব জ্ঞান, যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের সব জ্ঞান-গবেষণা, আধুনিক বিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখাগুলোর সব জ্ঞান সত্যের পরিপন্থী ঘোষণা করে তা প্রত্যাখ্যান করা কখনোই উচিত নয়। কেননা এসব জ্ঞানের উত্সগুলো যদিও শতভাগ নির্মল নয়, তবুও ঈমান ও ধর্মীয় জ্ঞানে সুদৃঢ় ব্যক্তিদের তা থেকে উপকৃত হওয়ার বিপুল সুযোগ আছে। 

অনেক আগে ইমাম গাজালি (রহ.) একটি ফেতনা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তা হলো, ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসীদের কিতাবে বিদ্যমান সত্য প্রত্যাখ্যান করা। তিনি এটাকে একটি বড় সমস্যা মনে করতেন। তাঁর মতে, জ্ঞানে ও মেধায় পশ্চাত্পদ ব্যক্তিদের একটি দল মনে করে, এই কথা যেহেতু তাদের (ভ্রান্ত দল) বইয়ে আছে এবং এতে তাদের ভ্রান্ত চিন্তা মিশ্রণ আছে, তাই এগুলো ত্যাগ করা এবং উল্লেখ না করা উচিত। তাদের দুর্বল মেধার বিচার হলো ভ্রান্ত মানুষের কথা যেহেতু, তা অবশ্যই বাতিল হবে। কিন্তু এমনটি করা উচিত নয়। যেমন কেউ বলল, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং ঈসা (আ.) আল্লাহর রাসুল। এখন একজন খ্রিস্টানের কথা হিসেবে পুরো বাক্য কি প্রত্যাখ্যানের সুযোগ আছে? খ্রিস্টান ব্যক্তি যদি এর মাধ্যমে মহানবী (সা.)-এর নবুয়াত অস্বীকার করতে চায় তবুও তার কথার প্রথমাংশ আমাদের অনুকূল। আর যদি সে নিছক ঈসা (আ.)-এর রাসুল হওয়ার সংবাদ দিতে চান, তবে আমরাও তো তাঁকে রাসুল হিসেবে বিশ্বাস করে থাকি!

এজন্য আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, ‘সত্যকে ব্যক্তি দিয়ে বিচার কোরো না, বরং তুমি সত্যকে সত্যের মতো বিচার কোরো এবং তার ধারককে চিনে নাও।’ (হুরমাতু আহলিল ইলম, পৃষ্ঠা-৩৭০)

ভ্রান্ত চিন্তায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের গ্রন্থে আছে—এই যুক্তিতে যদি আমরা সব প্রত্যাখ্যানের নীতি অবলম্বন করি, তবে আমাদের কোরআনের অসংখ্য আয়াত, হাদিস, পূর্বসূরীদের ঘটনা, সুফি ও দার্শনিকদের বক্তব্য পরিহার করতে হবে। কেননা ভ্রান্ত পণ্ডিত গোষ্ঠি ‘ইখওয়ানুস সফা’ তাদের গ্রন্থে এগুলো উদ্ধৃত করেছে এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করতে তা দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছে। আর এই নীতির মন্দ দিক হলো ভ্রান্ত লোকেরা আমাদের হাত থেকে সত্যকে ছিনিয়ে নেবে। 

জ্ঞানীর সর্বনিম্ন স্তর হলো, ব্যক্তি নিজেকে অন্ধ ও বিভ্রান্তদের থেকে পৃথক করতে পারে। সুতরাং সে হিজামা দেওয়ার সিং-এ মধু পেলে তা প্রত্যাখ্যান করে না। কেননা সে জানে, হিজামার সিং মধুর সত্তাতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। এখন কেউ যদি মধুকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করে যে, তা এমন পাত্রে রাখা হয়েছে যাতে দূষিত রক্ত থাকে, তবে তা মূর্খতার পরিচায়ক। কেননা সে জানে না দূষিত রক্ত তার সত্তাগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই নোংরা, এতে পাত্রের কোনো ভূমিকা নেই। আর পাত্র পরিষ্কার করে তাতে মধু রাখলে রক্ত তাতে প্রভাব ফেলতে পারে না।

আল্লাহ সবাইকে সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার তাওফিক দিন। আমিন।