মহান রব্বুল `আলামীন আপনার জন্য সবকিছু সহজ করতে চান
সূরা আল বাকারা'য় একটি চমৎকার আয়াত রয়েছে যেটি মানবাত্মার প্রশান্তির জন্য যথেষ্ঠ। আলহামদুলিল্লাহ
এটা হলো ১৮৫ নং আয়াত, যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু তা'য়ালা বলেছেন-
আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান এবং তিনি তোমাদের কষ্ট দিতে চান না...
এই আয়াতটি আমাদের দ্বীনে একইসাথে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বেশি পদদলিত নীতির মধ্যে একটি।
কুরআন অর্ধ ডজন বা ৬ টি আয়াতে এই বিষয়টির অবতারণা করেছে এবং নবী (সা) তা স্পষ্টভাবে আমাদেরকে জানিয়েছেন।
১ - সূরা মায়িদায় আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন বলেন:
"...আল্লাহ তোমাদেরকে কোনো প্রকার কষ্ট দিতে চান না..."
(৫:৬)
অর্থাৎ আল্লাহ সবকিছু সহজ করে দিতে চান, তিনি আমাদের জন্য কাঠিন্য চান না।
২ - সূরা আরাফের ১৫৭ নং আয়াতে আমরা দেখি রাসূল (সা) কে পাঠানো হয়েছে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ প্রদানের জন্য।
এবং সেখানে আল্লাহ আরও বলেছেন যে, নবী করীম (সা) তাদের উপর থাকা সব ধরনের বাধা এবং বন্দীত্বের শেকলকে দূরে সরিয়ে দেন, তা থেকে তাদেরকে মুক্ত করেন।
সুতরাং কুরআন এবং সুন্নাহ এসেছে শেকল ভাঙার জন্য, আমাদেরকে মুক্ত করে জীবনধারণ সহজ করার জন্য।
৩ - সূরা হজ্জ্বে আল্লাহ বলেছেন:
"...তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনো কঠিনতা আরোপ করেননি...
(২২:৭৮)
৪ - সূরা বাকারা'য় আমরা পড়ি:
"আল্লাহ কাউকেই তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না..."
(২:২৮৬)
৫ - সূরা নিসা'য় আল্লাহ তা'য়ালা বলেন:
"আর আল্লাহ তোমাদের বোঝা হালকা করতে চান..."
(৪:২৮)
ইসলাম হলো স্বাচ্ছন্দ্যে পূর্ণ
এবং কুরআনে এভাবেই দ্বীনের সহজতার ব্যাপারে তুলে ধরা হয়েছে...
আর এ কারণেই ইসলামী ফিকহের পাঁচটি মূল নীতির মধ্যে একটি হলো কঠিনকে সহজ করা।
অর্থাৎ যত কঠিন বিষয় সামনে আসুক, শরীয়াহ তত সহজ হয়ে যাবে।
যদি আপনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে না পারেন, তাহলে বসে আদায় করুন।
যদি আপনি অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে না পারেন, সেই দিনগুলোতে রোজা রেখেন না...
এবং এভাবে শরীয়াহ থেকে হাজার হাজার উদাহরণ পাওয়া যায় যার মধ্যে কেবলমাত্র দুটি এখানে উল্লেখ করা হলো।
রাসূল (সা) ধর্মের সহজতা কিংবা স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যাপারটি অসংখ্য হাদীসে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেছেন:
"ধর্মের মধ্যে ঐ বিষয়টি সবচেয়ে বরকতময় যেটি সবচেয়ে সহজতম”।
এবং আঈশা (রা) বলেছেন:
যদি শরীয়াহ লঙ্ঘিত না হত এবং কোনো হারামের সম্ভাবনা না থাকত, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লামকে দু’টি পছন্দ দেওয়া হলে তিনি তার মধ্যে তুলনামূলক সহজটি বেছে নিতেন।
কেউ হয়তো বলতে পারে, ধর্ম কীভাবে সহজ হতে পারে যখন আমাদেরকে ফজরে উঠতেই হয়, এবং এটা কি কঠিন?
যখন আমাদেরকে গরমের দিনগুলোয় রোজা হয়, এবং এটা কি যন্ত্রণাদায়ক?
ধর্ম কীভাবে এত সহজ হতে পারে যখন আমরা জুনের তপ্ত গরমে ১৬-১৭ ঘন্টা যাবত নিজেদেরকে খাদ্য পানীয় থেকে দূরে রাখি?
এটা কীভাবে সহজ হতে পারে যেখানে আমরা এত কষ্ট সহ্য করছি?
এবং এক্ষেত্রে উত্তরটি হচ্ছে- অসুবিধা বা কষ্টের দুটো ধরন রয়েছে।
প্রথমটি হচ্ছে - যেটি অস্বস্তিকর কিন্তু সহ্য করা যায় এমন।
এটি হয়তো বেমানান কিন্তু এটি এমন কিছু নয় যা যুক্তির বাইরে ...
এই ধরনের বোঝা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা, ভালো থেকে খারাপকে সরিয়ে নেয়ার জন্য।
এবং এটি এমন কিছু যা হয়তো শরিয়তে আংশিকভাবে থাকতে পারে।
যাইহোক, যদি এরকম পরীক্ষা আসে, তবুও এর বিনিময়ে যে পুরস্কারগুলো পাবেন তা আপনার অসুবিধা কিংবা কষ্টের চেয়ে শত সহস্র গুণ বেশি।
এই ছোটখাটো অসুবিধা থেকে যে স্বাচ্ছন্দ্য আসবে তা আপনার পাওয়া যন্ত্রণার চাইতে অনেক বেশি হবে।
এবং একটি সহজ উদাহরণ দিই- ধরুন, আজ আমাদের রোজার প্রথম দিন ছিল এবং আমি জানি আপনি বলবেন এটি ছিল চমৎকার এবং খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে পূর্ণ। কীভাবে এটি হলো?
কেননা আল্লাহ বলেছেন:
"আল্লাহ তোমাদের জন্য কোনোকিছু কষ্টসাধ্য করতে চান না।"
অসুবিধা কিংবা কষ্টের দ্বিতীয় ধরনটি হলো- যেটি অযৌক্তিক এবং অসহনীয়।
এটি হলো এমন ধরন যা কুরআন বাতিল করেছে। ইসলামে এর কোনো অবস্থান নেই।
ধর্মের কারণে আপতিত এমন কোনো অসহ্যকর যন্ত্রণা কিংবা কষ্টের অস্তিত্বই নেই।
চরমপন্থার দিকে যাবেন না
চমৎকার একটি হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন:
“দ্বীন সহজ। আর দ্বীনকে তার উপর বিজয়ী করা ব্যতীত কেউই ধর্মকে কঠিন করে তুলবে না।”
আর আপনি কখনোই দ্বীনের উপর জয়ী হতে পারবেন না।
আপনি যদি ধর্মান্ধ হন, শরীয়াহ যতটুকু চায় তার চেয়ে আপনি যদি অতিরিক্ত ধার্মিক হয়ে যান, হালালকে হারাম বানান, যদি ভাবেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) যা করেছেন তার চেয়েও বেশি কিছু করতে পারবেন, তবে সেই ধর্মান্ধতা আপনাকে ধ্বংস করে ছাড়বে…
এ কারণেই রাসূল (সা) চরমপন্থা এবং ধর্মান্ধতার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
তিনি বলেছেন:
"দৃঢ়, পরিমিত এবং আন্তরিক হও।"
আপনার স্তর অনুযায়ী আপনি যা করার সামর্থ্য রাখেন তাই করে যান। তাহলেই আপনি নিজের গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন...
দ্বীন সহজ… এখানে কাঠিন্যের কোনো স্থান নেই…
এবং মনে রাখবেন, আল্লাহ আমাদের জন্য সবকিছু সহজ করে তুলতে চান। সুতরাং, মধ্যপন্থী হোন এবং যা করার সামর্থ্য রাখেন তাই করুন এবং অবিচল থাকুন। রাসূলুল্লাহ (সা) যেমন বলেছেন নিজেকে তেমন মানুষে পরিণত করুন।