জান্নাতের নেয়ামত কেমন হবে, হুরদের বর্ণনা
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন যে, আমরা হজরত রাসূল (সা) থেকে জানতে চেয়েছিলাম যে, জান্নাত কি জিনিস থেকে বানানাে হয়েছে? তিনি এরশাদ করলেন, একটি ইট স্বর্ণের, আরেকটি রৌপ্যের, আর গাঁথুনীর মসল্লা মেশকের। মাটি থাকবে জাফরানের। যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে কোনো প্রকার নেয়ামত থেকেই নিরাশ ও বঞ্চিত হবে না। সে সব সময় স্থায়ীভাবে জান্নাতে থাকবে, কখনাে মৃ্ত্যু আসবে না। তার কাপড় কখনাে পুরনো হবে না, যৌবন কখনাে শেষ হবে না।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ও হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, হজরত রাসূল (সা) এরশাদ করেন, আমার উম্মতের মধ্যে যারা সবার আগে জান্নাতে যাবে, তাদের চেহারা (মুখমণ্ডল) চৌদ্দ তারিখের চাঁদের ন্যায় উজ্জল হবে। তারপরের (ব্যক্তিদের চেহারা) তীব্রোজ্জল নক্ষত্রের মত হবে, অতঃপর একের পর এক বিভিন্ন অবস্থার হবে। জান্নাতে পশ্রাব-পায়খানা হবে না, নাক-মুখে শ্লেষ্মাও হবে না। চিরুনি স্বর্ণের, আংটি ‘উদ’ এর তৈরি হবে। ঘাম মেশকের মত সুগন্ধিযুক্ত হবে।
সবার দেহাকৃতি এক সমান হবে। হজরত ঈসা (আ.)-এর মত ৩৩ বছরের যুবক হবে, হজরত আদম (আঃ)-এর মত ৬০ হাত লম্বা হবে এবং দাড়ি বিহীন হবে। মাথা, ভ্রূ ও চোখের পলক ছাড়া আর কোথাও চুল হবে না। রং ফর্সা এবং পােশাক সবুজ হবে। কোনো ব্যক্তি দস্তরখানা বিছালে সামনে থেকে একটি পাখি এসে বলবে, হে আল্লাহর ওলী! আমি সালসাবিল নদীর পানি পান করেছি। আরশের নিচে জান্নাতের বাগানে চারণ করেছি এবং অমুক অমুক ফল খেয়েছি। তখন সে জান্নাতি ওই পাখির এক পার্শ্ব থেকে পাকানাে এবং অপর পার্শ্ব থেকে ভূনা গােশত খেতে পারবে। একজন জান্নাতি সওরটি পােশাক পরিহিত হবে। প্রত্যেক পােশাকের রং ভিন্নতর হবে। তার আঙ্গুল সমূহে দশটি আংটি হবে।
জান্নাতের অপার নেয়ামত
হজরত সােহাইব (রা.) বলেন যে, হুজুর আকরাম (সা.) এরশাদ করেন, যখন জান্নাতিরা জান্নাতে এবং দোযখিরা দোযখে চলে যাবে, তখন একজন ঘােষক ডাক দয়ে বলবেন, হে জান্নাতিগণ! আল্লাহ পাক তােমাদের কাছে (যে) ওয়াদা করেছিলেন, সে ওয়াদা এখন পূরণ করতে চান। জান্নাতিগণ বলবেন, সেটা আবার কি? আল্লাহ কি আমাদের মীজান ভারী করে দেননি? আমাদের চেহারা কি উজ্জ্বল করেননি? আমাদেরকে কি জান্নাতে প্রবেশ করান নি? এবং দোযখ থেকে কি মুক্তি দেননি? (তাহলে আবার কি ওয়াদা বাকী রইল)।
আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর এরশাদ মুতাবিক জানা যায় যে, এ অবস্থায় তখন পর্দা উঠিয়ে দেয়া হবে, ফলে জান্নাতিগণ আল্লাহর দিদারে সৌভাগ্যবান হবেন। আল্লাহর কসম! জান্নাতিগণের জন্যে এর চেয়ে অধিক প্রিয় এবং উত্তম নেয়ামত কোনটাই হবে না। (হে রাহমানুর রাহীম আল্লাহ আমাদের সকলকে এ নিয়ামত নসীব করুন । – আমীন)
জান্নাতের বৃক্ষ
হজরত রাসূলে পাক (সা.) এরশাদ করেন যে, জান্নাতে এমন একটি বৃক্ষ আছে যে, যার ছায়ায় জান্নাতিরা শত শত বছর চললেও তা শেষ করতে পারবে না। এবং জান্নাতে এমন নেয়ামত আছে যে, যা কোনো চোখ কোন দিন দেখেনি, কোন কান কোনো দিন শোনেনি, কোনো হৃদয় কোনোদিন কল্পনায়ও ভাবতে পারেনি।
জান্নাতে তুবা নামে একটি বৃক্ষ হবে, প্রত্যেক ঘরে এটার ডাল থাকবে। এতে বিভিন্ন ধরনের ফল ধরবে এবং উটের মত বড় পাখি এসে এতে বসবে। যদি কোন জান্নাতি কোন পাখি (খাইবার) আশা করে, তাহলে তা তৎক্ষণাৎ দস্তরখানে এসে পৌঁছে যাবে। সে ব্যক্তি এই একই পাখির এক পার্শ্ব থেকে শুকনাে এবং অপর পার্শ্ব থেকে ভূনা গােশত খাবে, অতঃপর উক্ত পাখি উড়ে চলে যাবে। (সােবহানাল্লাহ্)
জান্নাতের বাজার
হজরত রাসূল (সা) এরশাদ করেন, জান্নাতে বাজার বসবে, কিন্তু এতে ক্রয়-বিক্রয় হবে না। বরং বন্ধু-বান্ধবদের গােল টেবিল বৈঠক হবে, আর দুনিয়ার কথা-বার্তা বলবে যে, কেমন করে দুনিয়ায় এবাদত করতাে, গরীব এবং ধনীদের কি অবস্থা ছিল। মৃত্যু কীভাবে এসেছিল এবং কত মুসীবত পাড়ি দিয়ে, সহ্য করে এখন জান্নাতে পৌঁছেছে।
জান্নাতিদের সৌন্দর্য্য
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন যে, জান্নাতিগণের শােভা-সৌন্দর্য্য যথারীতি বৃদ্ধিই হতে থাকবে, দুনিয়ায় তাে ধীরে ধীরে বার্ধক্যে আসতে থাকে, কিন্তু আখেরাতে রূপ-যৌবন বাড়তেই থাকবে।
জান্নাতে পেশাব-পায়খানার দরকার হবে না
হযরত যায়দ ইবনে আরকাম (রা.) বলেন যে, জনৈক আহলে কিতাব হযরত রাসূল (সা.)-এর খেদমতে এসে বলতে লাগলাে, আপনার মতে কি জান্নাতে খানা-পিনার ব্যবস্থা আছে? তিনি রাসূল (সা.) ফরমালেন, হ্যাঁ, জান্নাতে এক ব্যক্তিকে পানাহার ও সহবাসের ক্ষেত্রে একশত ব্যক্তির শক্তি দেয়া হবে।
সে বলতে লাগলাে, পানাহারের পর তাে পেশাব পায়খানা অবশ্যই হয়ে থাকে, তাহলে জান্নাতের মত পবিত্র স্থানে এমন নােংরা কাজ কিভাবে হবে? তিনি রাসূল (সা.) এরশাদ করলেন, জান্নাতে পেশাব-পায়খানার প্রয়ােজন হবে না। বরং মেশকের সুগন্ধিযুক্ত ঘাম বেরুবে মাত্র, এতেই খানাপিনা সব হজম হয়ে যাবে।
জান্নাতের হুরের বর্ণনা
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলে পাক (সা.) এরশাদ করেন যে, বেহেস্তে এমন এক হুর আছে, যার নাম লু’বা। তাকে চারটি উপাদান দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। যেমন- মেশক, আম্বর, কর্ফুর ও জাফরান দ্বারা। এবং এই জিনিসকে “মায়ে হায়ওয়ান” (এক প্রকারের বিশেষ পানি) দ্বারা মিশানাে হয়েছে। বেহেস্তের সমস্ত হুর তার ওপর আশেক। সে যদি সমুদ্রের কোথাও থুথু ফেলে, তাহলে সমুদ্রের সমস্ত পানি মিষ্ট হয়ে যাবে। তার কপালে লেখা আছে- “যে আমাকে চায়, সে যেন তার মহান রবের আনুগত্য করে”।