শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

জান্নাত কারো একচেটিয়া অধিকার নয়

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 08 মে 2026, 05:11 বিকাল • 132 বার পঠিত
জান্নাত কারো একচেটিয়া অধিকার নয়

মুমিনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন জান্নাত লাভ। এই স্বপ্ন শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি একটি বিশ্বাস, একটি সংগ্রাম। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখিÑঅনেক জাতি ও গোষ্ঠী এই জান্নাতকে নিজেদের একচেটিয়া অধিকার মনে করে ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত হয়েছিল। তারা ভেবেছিল, তাদের নাম বা বংশ-পরিচয় জান্নাত লাভে সহায়তা করবে। অথচ জান্নাত কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়; এটি অর্জন করতে হয় ঈমান ও আমলের মাধ্যমে। তাই আমাদের প্রয়োজন আÍসমালোচনা, সংশোধন এবং সত্যের পথে ফিরে আসা।

আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে বলেন, ‘আহলে কিতাবদের অনেকেই কামনা করেÑতোমরা ঈমান আনার পর যেন আবার কুফরের দিকে ফিরে যাও। এটি তাদের অন্তরের হিংসার ফল, যদিও সত্য তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। সুতরাং তোমরা তাদের ক্ষমা করো এবং উপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আল­াহ তাঁর নির্দেশ দেন। নিশ্চয়ই আল­াহ সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। তোমরা সালাত কায়েম করো এবং জাকাত আদায় করো। তোমরা নিজেদের জন্য যে সৎকর্মই অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ তা সম্পর্কে অবগত। আর তারা বলে, ইহুদি বা খ্রিস্টান ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এগুলো তাদের কল্পনা মাত্র। বলুন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তবে তোমাদের প্রমাণ উপস্থাপন করো। বরং যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করে এবং সৎকর্মে নিয়োজিত থাকে, তার প্রতিদান তার রবের কাছে আছে। তাদের কোনো ভয় থাকবে না, আর তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০৯-১১২) 

এই আয়াত আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় : জান্নাত লাভের পথ কোনো গোষ্ঠীগত পরিচয়ে নয়; বরং তা নির্ভর করে বিশুদ্ধ ঈমান, আন্তরিক আÍসমর্পণ এবং সৎকর্মের উপর। তাই যদি আমরা সত্যিই জান্নাতে প্রবেশ করতে চাই, তবে আমাদের হƒদয়কে বিদ্বেষ, হিংসা ও ঘৃণা থেকে পরিশুদ্ধ করতে হবে এবং ভালোবাসা, ক্ষমা ও ন্যায়ের পথে চলতে হবে।

ইহুদিরা বলেছিল, ‘ইহুদি ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ আর খ্রিস্টানরা বলেছিল, ‘খ্রিস্টান ছাড়া কেউ জান্নাতে যাবে না।’ এভাবে উভয় সম্প্রদায়ই জান্নাতকে শুধু নিজেদের জন্য নির্ধারিত করে নিয়েছিল। ইহুদিরা চাইত, তাদের ছাড়া আর কেউ যেন জান্নাতে প্রবেশ করতে না পারে; আর খ্রিস্টানরা ভাবত, জান্নাত শুধু তাদেরই অধিকার। এমনকি তারা বিশ্বাস করত, মুসলমানরা এ মর্যাদার যোগ্য নয়। এ কারণেই মহান আল্লাহ তাদের এ দাবিকে ‘তাদের কল্পনা’ বলে অভিহিত করেছেন।

এই ভ্রান্ত ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা তাদের হƒদয়কে গ্রাস করেছিল; ফলে তাদের অন্তর ভরে গিয়েছিল ঘৃণা, বিদ্বেষ ও হিংসায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ইহুদিরা বলে, ‘খ্রিস্টানদের কোনো ভিত্তি নেই,’ আর খ্রিস্টানরা বলে, ‘ইহুদিদের কোনো ভিত্তি নেই,’ অথচ তারা উভয়েই ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে। একইভাবে অজ্ঞরাও তাদের মতোই কথা বলে। অতএব, যেসব বিষয়ে তারা মতভেদ করত, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের মধ্যে তার ফয়সালা করে দেবেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১১৩)

দুঃখজনক হলেও সত্য যে মুসলিম উম্মাহ আজ বিভিন্ন দল ও সম্প্রদায়ের বিভক্ত। প্রত্যেকেই অন্যকে পথভ্রষ্ট বলছে, নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করছে এবং আল­াহর সরল পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এতে মূলত তারা আগের ইহুদি ও নাসারাদের পথে হাঁটছে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিদের পথ হুবহু অনুসরণ করবে-হাতের পর হাত, বিঘতের পর বিঘত। এমনকি তারা যদি টিকটিকির গর্তে প্রবেশ করে, তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে।’

সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কথা বলছেন?’ তিনি বললেন, ‘তবে আর কে?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৩২০)

এই হাদিস আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। তাই, আমাদের উচিত-অহংকার, বিদ্বেষ ও দলাদলি পরিহার করে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং সত্যের পথে অবিচল থাকা। কারণ জান্নাত কোনো দলের একচেটিয়া সম্পদ নয়; বরং তা অর্জিত হয় বিশুদ্ধ ঈমান, আন্তরিকতা ও সৎকর্মের মাধ্যমে।

বাস্তবতা হলো : এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কিছু দল এমনও দাবি করে যে, একমাত্র তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর বাকিরা জাহান্নামে যাবে; ঠিক সেই একই ভ্রান্ত ধারণা, যা একসময় ইহুদি ও খ্রিস্টানরা পোষণ করেছিল। সত্যিই বিস্ময়কর! তারা কত নির্লজ্জভাবে আল্লাহ সম্পর্কে এমন দাবি করে, নিজেদেরই একমাত্র ধার্মিক হিসেবে উপস্থাপন করে, যেন জান্নাত-জাহান্নামের চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাদের হাতেই ন্যস্ত! আজকের যুগে ইন্টারনেট, বইপত্র কিংবা বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন বক্তব্য প্রায়ই দেখা যায়। যা খুবই নিন্দনীয়। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সেই দাবির কথা আল্লাহ তাআলা এভাবে তুলে ধরেছেন, ‘তারা বলে, ‘ইহুদি বা খ্রিস্টান ছাড়া কেউ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১১১)

এই ধরনের বক্তব্য শুনে একজন সচেতন মুসলিম বিস্মিত হয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করা উচিত, এসব পরস্পরবিরোধী দাবির মাঝে আমার অবস্থান কোথায়?’ দুঃখজনকভাবে, এসব গোষ্ঠীগত দাবি সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ, দ্ব›দ্ব ও সন্দেহের জন্ম দেয়। শুধু তাই নয়, এসব কথাবার্তা অমুসলিমদের মনেও ইসলামের প্রতি সন্দেহ তৈরি করে। তারা ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে, কারণ মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা অনেকটা অমুসলিমদের বিভক্ত অবস্থার মতোই হয়ে উঠেছে। সত্যিই, এটি এক বড় বিপর্যয়!

অতএব, স্পষ্ট হয়ে যায়, জান্নাত কোনো গোষ্ঠী বা দলের একচেটিয়া অধিকার নয়। এটি অর্জিত হয় প্রকৃত ঈমান, বিশুদ্ধ আমল এবং আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হ্যাঁ, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে এবং সৎকর্মে নিয়োজিত থাকে, তার প্রতিদান তার রবের কাছেই আছে। তাদের জন্য কোনো ভয় নেই, আর তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১১২)

এটাই সেই সার্বজনীন নীতি, যার সামনে সব মানুষ সমান। মহান আল­াহর দরবারে কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব বা বৈষম্যের স্থান নেই। যে সত্যিকারের ঈমান ও সৎকর্মে অগ্রসর হবে, সেই-ই সফলতা অর্জন করবে। তাই জান্নাতের ব্যাপারে কোনো জাতি, বর্ণ, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হবে না। কেননা জান্নাত কোনো নাম, পরিচয়, জাতীয়তা বা মতবাদের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং নির্ভর করে আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ আÍসমর্পণের ওপর। অতএব, আমাদের উচিত-ভ্রান্ত দাবির মোহ থেকে বেরিয়ে এসে কোরআনের এই চিরন্তন নীতিকে আঁকড়ে ধরা। বিভেদ নয়, ঐক্য; বিদ্বেষ নয়, ভালোবাসা; অহংকার নয়, বিনয়-এসব গুণই আমাদের জান্নাতের পথে এগিয়ে নেবে। কারণ আল্লাহর দরবারে কোনো পরিচয়ের অহংকার নয়, বরং হƒদয়ের তাকওয়া ও আমলের বিশুদ্ধতাই হবে চূড়ান্ত।