ইসলামের দৃষ্টিতে বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য গ্রহণ
মানবজাতিকে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়কে পৃথক বৈশিষ্ট্য, বিশেষ ভারসাম্য ও সৌন্দর্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। ইসলাম এই স্বাভাবিক পার্থক্যকে সংরক্ষণ করতে চায়। এই কারণেই ইসলামে এমন সব কাজকে নিরুত্সাহিত বা নিষিদ্ধ করেছে, যা মানুষের স্বাভাবিক পরিচয়কে বিকৃত করে বা মুছে দেয়। বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য গ্রহণ (তাশাব্বুহ) সেই ধরনেরই একটি কাজ। নিম্নে ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের বিধান তুলে ধরা হলো—
হাদিসের কঠোর সতর্কবার্তা : ইচ্ছাকৃত বিপরীত লিঙ্গের বেশবুশা ধারণ করা, বিপরীত লিঙ্গের মতো আচরণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। যারা এসব করে, মহানবী (সা.) তাদের অভিসম্পাত করেছেন। হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) অভিসম্পাত করেছেন নারীরূপী পুরুষ ও পুরূষরূপী নারীদের উপর এবং বলেছেন, তাদের বের করে দাও তোমাদের ঘর থেকে এবং তিনি অমুক অমুককে বের করে দিয়েছেন। (বুখারি, হাদিস : ৬৮৩৪)
বুখারি শরিফের আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, মহানবী (সা.) ঐ সব পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন যারা নারীর বেশ ধরে এবং ওই সব নারীকে যারা পুরুষের বেশ ধরে। (বুখারি, হাদিস : ৫৮৮৫)
এর কারণ হলো, মহান আল্লাহ নারী-পুরুষ উভয়কে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়ে তৈরি করেছেন, ভিন্ন ভিন্ন গঠন ও স্বভাব দিয়েছেন। কৃত্রিম ভাবে তা ভঙ্গ করা আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন করার শামিল। যা এক দিকে যেমন মারাত্মক গুনাহ। অন্য দিকে অভিশপ্ত কাজ—যে ধরনের কাজ মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত করে। তাই পুরুষদের জন্য নারীদের মতো পোশাক, সাজসজ্জা, আচার-আচরণ ও নারীদের জন্য নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করা উচিত নয়। একইভাবে নারীদের জন্যও পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট বিষয়গুলোতে সাদৃশ্য গ্রহণ করা জায়েজ নয়।
‘বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য’ শুধু পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তবে তা অনেক বিস্তৃত। বিজ্ঞ আলেমদের মতে, তাশাব্বুহ বা সাদৃশ্য বলতে, পোশাক ও সাজসজ্জা, কথা বলার ধরন, চলাফেরা ও অঙ্গভঙ্গি, আচরণ ও প্রকাশভঙ্গি সব অন্তর্ভূক্ত। কেউ যদি সচেতনভাবে বিপরীত লিঙ্গের মতো হতে চেষ্টা করে, তাহলেই তা নিষিদ্ধ সাদৃশ্যের অন্তর্ভুক্ত হবে।
তবে কারো ক্ষেত্রে যদি তা জন্মগত সমস্যা হয়, সৃষ্টিগত ভাবে কেউ তৃতীয় লিঙ্গের হয়, যেখানে তার নিজের কোনো হাত নেই, তাহলে তা ভিন্ন কথা।
আল্লামা তিবি (রহ.) বলেছেন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ দুই ধরনের। এক প্রকারের মানুরা সেভাবেই জন্মেছে। তারা মহিলাদের মতো চরিত্র, সাজগোজ, কথা বলার ধরণ বা চালচলন নকল করার ক্ষেত্রে কোনোরূপ চেষ্টা করে না (স্বাভাবিকভাবেই তার আচরণ এমন)। এসব তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কোনো ভর্ত্সনা, পাপ, দোষ কিংবা শাস্তি নেই। কেননা তারা তো মাজুর।
দ্বিতীয় প্রকার হলো, যারা নারীদের আখলাক, তাদের চালচলন, তাদের হাবভাব, তাদের মতো কথা বলার ধরণ ও তাদের মতো সাজসজ্জা গ্রহণের চেষ্টা করে। হাদিসে বর্ণিত লানতপ্রাপ্ত ব্যক্তি এরা। (শরহে তিবী: ৮/২৬৭, সুবুলুস সালাম: ২/১৯)
বোঝা গেল, ইচ্ছাকৃত বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্যগ্রহণের চেষ্টাকে স্বাভাবিক ভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এই কাজ মহান আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করে। রাসুল (সা.) এ ধরনের কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের নিজের উম্মত হিসেবে স্বীকার করবেন না। কঠিন কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেবেন না। ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘তিন ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়ে দেখবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষবেশিনী বা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণী মহিলা এবং দাইয়ুছ পুরুষ; (যে তার স্ত্রী, কন্যা ও বোনের চরিত্রহীনতা ও নোংরামিতে চুপ থাকে এবং বাধা দেয় না)। (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩০৭১)
অতএব, আমাদের উচিত, এসব কাজ থেকে বিরত থাকা। পরিবারে বা পরিচিত মহলের কারো মধ্যে এরকম প্রবণতা দেখা দিলে তাকে বোঝানো, সচেতন করা। প্রয়োজনে ডাক্তারের সহযোগিতা নেওয়া। মহান আল্লাহ ঘৃণ্য প্রবণতা থেকে আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমিন।