ইবাদতে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পাঁচটি কার্যকরী টিপস!
একজন মুসলিমের জীবনে আত্মবিশ্বাসের গুরুত্ব সবসময়ই বেশি। এবং এই আত্মবিশ্বাসটি কখনোই তাওয়াক্কুলের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং এর শাখা প্রশাখা।
এই ব্যাপারে আজ আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব৷ আত্মবিশ্বাস আসলে কীভাবে আল্লাহর উপর ভরসা রাখার একটি অংশ হতে পারে?
আল্লাহর প্রতি আমাদের বিশ্বাস কিংবা ভরসা যত বেশি থাকবে, তিনি আমাদেরকে কুরআনে যা বলেছেন তার প্রতি আমাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হবে।
আর তাই যখন তিনি আমাদেরকে বলেন যে নির্দিষ্ট একটি কাজ আমাদের জন্য সহজ, তখন সেটির ক্ষেত্রে আমরা শক্তভাবে বিশ্বাস করব যে সেই কাজ করার সামর্থ্য আমাদের আছে (আত্মবিশ্বাস)। একবার যদি আমরা কাজটি সম্পন্ন করি, পরের বার সেটি আমাদের জন্য আরও সহজ হয়ে যাবে। এটাই হচ্ছে তাওয়াক্কুল এবং আত্মবিশ্বাসের ক্রমবর্ধমান চক্র।
এই ব্যাপারটি আমাদের জাগতিক কাজের চেয়ে ইবাদতের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রযোজ্য। যেহেতু আল্লাহ আমাদেরকে দিনে পাঁচবার সালাত আদায়ের নির্দেশ দিলেন, তার অর্থ এই যে আমাদের সেটা করার সামর্থ্য আছে। যদি আমরা দিনে পাঁচবার সালাত আদায় করতে না পারতাম, আল্লাহ কখনোই আমাদেরকে তা করতে বলতেন না।
"আমি আগে খুব ধার্মিক মুসলিমাহ ছিলাম," এক বান্ধবী সেদিন আমার কাছে এভাবে তার মনের যন্ত্রণা তুলে ধরছিল। "কিন্তু আমি এখন কিছুই করতে পারি না।"
আত্মবিশ্বাসের অভাব কখনো কখনো আধ্যাত্মিকতার জায়গাটিকে দুর্বল করে দেয়। এটি আত্মিক প্রবৃদ্ধিতে বাধা প্রদান করে এবং এমনকি কারও ইসলামের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
নিজের সামর্থ্যের প্রতি বিশ্বাসের অভাব ব্যক্তিকে আল্লাহর উত্তম ইবাদতকারী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করে। হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ বলেছেন:
"আমার বান্দা আমার ব্যাপারে যা ভাবে, আমি সেরকমই।"
(আল-বুখারী ৭৫০৫)
ইবাদতের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায়
১. জেনে রাখুন, আল্লাহই আপনাকে বাছাই করেছেন
পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে থেকে আল্লাহ আপনাকে মানুষ হিসেবে জীবন দিয়েছেন, বোধ বুদ্ধি উপহার দিয়েছেন। বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের মাঝে তিনি আপনাকে মুসলিম হিসেবে বাছাই করেছেন, হেদায়াত দিয়েছেন, নিজের বুদ্ধিকে ব্যবহারের সামর্থ্য দিয়েছেন।
আল্লাহ আপনার মাঝে বিশেষ কিছু দেখতে পেয়েছেন যা হয়তো আপনি এখনো দেখেননি। আপনি আল্লাহর বিশেষ পছন্দনীয় একজন। আল্লাহর পছন্দের উপর ভরসা রাখুন।
২. তিনি আপনার সামর্থ্যের বাইরের কিছু আপনাকে কখনোই চাপিয়ে দেবেন না, জেনে রাখুন
আল্লাহ বলেন:
"এবং সংগ্রাম কর আল্লাহর পথে যেভাবে সংগ্রাম করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠিনতা আরোপ করেননি।"
(সূরা হজ্ব, আয়াত: ৭৮)
কেউ আমাকে একবার বলেছিল: "আমি দিনের সব সালাতই ঠিকভাবে আদায় করতে পারি, শুধুমাত্র ফজরে উঠতে পারি না।"
অন্য আরেকজন ব্যক্তি বলেছিল: "আমি পাঁচ ওয়াক্ত সালাতই আদায় করি, কিন্তু আমি সেগুলো দিনের শেষে একসাথে আদায় করি। সময়মত সেগুলো আদায় করা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না, আমার জীবন খুবই কর্মব্যস্ত।"
বিষয়টি হলো, আল্লাহ আমাদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সঠিক সময়ে তা আদায় করতে বলেছেন।
"নিশ্চয় নামাযকে বিশ্বাসীদের জন্য নির্ধারিত সময়ে অবশ্য কর্তব্য করা হয়েছে।"
(সূরা নিসা; আয়াত: ১০৩)
আপনি কি মনে করেন আল্লাহ আপনাকে এমনকিছু করতে বলেছেন যা আপনার জন্য করা অসম্ভব?
"আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। যে ভাল উপার্জন করবে সে তার (প্রতিদান পাবে) এবং যে মন্দ উপার্জন করবে সে তার (প্রতিফল পাবে)..."
(সূরা বাকারা; আয়াত: ২৮৬)
যখন আমাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস খুব কম থাকে, তখন খুব সহজ কাজও আমাদের কাছে পাহাড়সম কঠিন বলে মনে হয়। এর অর্থ কিন্তু কাজটি অসাধ্য নয়; আমাদের শুধুমাত্র নিজের হাত শক্তভাবে ধরতে হবে এবং এভাবেই আমাদের যা করা প্রয়োজন, আমরা তাই ই করতে পারব।
"আল্লাহ তোমাদের (জন্য যা) সহজ (তা) করতে চান, তিনি তোমাদের কষ্ট চান না।"
(সূরা বাকারা; আয়াত: ১৮৫)
৩. আত্মবিশ্বাসী মানুষকে বন্ধু বানান
আত্মবিশ্বাসী মানুষের সাহচর্যে থাকুন, কেননা এটি দেখে শিখতে সাহায্য করে।
রাসূলের ভাষায়:
"সৎ সঙ্গী এবং অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হচ্ছে আতর বিক্রি কারী এবং হাপরওয়ালার ন্যায়। আতর ওয়ালা তোমাকে নিরাশ করবে না; হয় তুমি তার কাছ থেকে ক্রয় করবে কিংবা তার কাছে সুঘ্রাণ পাবে। আর হাপরওয়ালা, হয় তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে আর না হলে তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।"
(আল-বুখারী ৫৫৩৪)
৪. জেনে রাখুন আপনার সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা আসে শয়তানের কাছ থেকে
যখন আপনার মনে এরকম চিন্তা আসে, "আমি এটা করতে পারব না।" মনে রাখবেন এটা আপনার মনের কথা নয়; এটা হচ্ছে শয়তানের কথা। আপনি কীভাবে আপনার মস্তিষ্কে থাকা শয়তানের কথা পছন্দ করবেন, যে আপনাকে প্রতিনিয়ত অনুৎসাহ দিচ্ছে? আপনি কীভাবে শয়তানের কথা মেনে চলতে পছন্দ করছেন?
নিজেকে শয়তানের কবল থেকে সুরক্ষিত করুন। কুরআনের সাথে সম্পর্ক মজবুত করুন এবং আল্লাহর স্মরণে নিজেকে বেশি ব্যস্ত রাখুন, বিশেষত সকাল এবং সন্ধ্যায়।
৫. সবক্ষেত্রে পরিপূর্ণ হতেই হবে- এমন মনোভাব থেকে সতর্ক থাকুন
"যখন আমি হিজাব করতে শুরু করব, আমাকে পরিপূর্ণভাবে তা করতে হবে," আমি এরকম কথা অনেকবার শুনেছি।
"আমি কেবলমাত্র তখনই পরীক্ষা দিবো যখন আমি জানবো যে আমি শতভাগ নাম্বার পেতে পারি," যদি আপনি এভাবে সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে কি আপনি আদৌ প্রথম গ্রেডেও উত্তীর্ণ হতে পারবেন?
আল্লাহ কি আমাদের কাছ থেকে পারফেকশন চান?
"অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর, শুন, আনুগত্য কর এবং ব্যয় কর। এটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর..."
(সূরা তাগাবুন; আয়াত: ১৬)
যখন একটি শিশু ওষুধের পুরো ট্যাবলেটটি গিলতে পারে না, তখন বুদ্ধিমতী মা সেটিকে দুই বা তিন টুকরা করেন এবং এক সময়ে তাকে এক টুকরা ওষুধ খাইয়ে দেন। কী হতো যদি তিনি শিশুটিকে তাড়া দিতেন যে তুমি দ্রুত বড় হয়ে যাও যাতে পুরো ট্যাবলেটটি একবারেই গিলে ফেলতে পারো?
বীজ থেকে বাদামী বৃক্ষ হয়ে ওঠার জন্য সময় প্রয়োজন। নিজেকে সময় দিন। শুধু এটুকু নিশ্চিত করুন যে আপনি ক্রমাগত উন্নতির দিকেই ধাবিত হচ্ছেন। নিজেকে কখনোই অন্যের সাথে তুলনা করবেন না, বরং অতীতের আপনি এবং বর্তমানের আপনির সাথে তুলনা দিন।