শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

গাজায় প্রাচীন পাণ্ডুলিপি রক্ষার অন্তহীন সংগ্রাম

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 11 মে 2026, 05:04 বিকাল • 106 বার পঠিত
গাজায় প্রাচীন পাণ্ডুলিপি রক্ষার অন্তহীন সংগ্রাম

গাজায় জীবন রক্ষা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংগ্রাম একই সুতোই গাঁথা। কেননা চলমান ইসরাইলি গণহত্যা মানুষ ও সংস্কৃতি উভয়কে সমানভাবে ধ্বংস করে চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে ৩৩ বছর বয়সী নারী হানিন আলআমসি ইসরাইলি আগ্রাসন থেকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলো রক্ষায় নিজেকে উত্সর্গ করেছেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করছে এক দল তরুণী স্বেচ্ছাসেবী, যারা তাঁর মতোই গাজার ইতিহাস রক্ষা ও তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। 

হানিন জানান, গাজার নিদারুণ অন্ধকার থেকেই তাদের এই উদ্যোগের জন্ম। তাঁর স্বেচ্ছাসেবী দলের প্রথম লক্ষ্য হলো আল ওমরি মসজিদ পাঠাগারের অবশিষ্ট বই ও পাণ্ডুলিপির প্রাথমিক চিকিত্সা প্রদান করত সংরক্ষণ করা। ২০২৩ সালের পর ইসরাইল এখানে তিনবার হামলা চালিয়েছে। হামলায় মসজিদের ঐতিহাসিক ভবনসহ পুরো কমপ্লেক্স মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, শত শত বছরের ইতিহাস চাপা পড়েছে ধ্বংসস্তুপের নিচে। 

ব্যক্তিগত জীবনে হানিন একজন শিল্পকর্ম, ভাস্কর্য ও ম্যুরাল পুনরুদ্ধার কর্মের বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী এবং আইজ অন হেরিটেইজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। তিনি ভারাক্রান্ত হূদয়ে ২০২৩ সালের আগের আল ওমরি মসজিদ পাঠাগারের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, এটা ছিল স্কুল শিক্ষার্থীদের একটি প্রিয় স্থান। গাজায় প্রাথমিক স্তরের এমন কোনো শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে না যে এই পাঠাগারে আসেনি এবং এর ঐতিহ্যের ভাণ্ডার ও পাণ্ডুলিপিগুলো স্পর্শ করেনি।

গাজার প্রাচীন শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ওমরি মসজিদের এই পাঠাগার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক স্থাপত্য। এই ভবন আক্কর, জেরুজালেম ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতদের ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। এই পাঠাগারে হাতেলেখা গুরুত্বপূর্ণ সুপ্রাচীন পাণ্ডুলিপি ছিল। প্রায় দেড় হাজার বছর এই ভবন ফিলিস্তিনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে অবদান রেখেছে। ধ্বংস হওয়ার আগে পাঠাগারে ২০ হাজার সংগ্রহ ও নিদর্শন ছিল, যার মধ্যে ছিল দুর্লভ বই, সাময়িকী, চুক্তিপত্র ও জার্নাল। 

হামলায় দুর্লভ সংগ্রহশালার প্রায় পুরোটা ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংসের তালিকায় আছে মামলুক আমলে লেখা দিওয়ানে ইবনে জুকাল আল গাজীও আছে। পাণ্ডুলিপিটির বয়স সাত শ বছর। হানিন ধ্বংসস্তুপের ভেতর তা খুঁজে পেয়েছে কিন্তু তা পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব। 

গাজার ঐতিহ্যবাহী পাঠাগারগুলোর ভেতর এটাই আংশিকভাবে টিকে আছে। অন্যগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। হানিনের মতে, এটা পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক গণহত্যার শামিল। তিনি বলেন, যা কিছু উদ্ধার করা সম্ভব আমরা তা উদ্ধার করছি যেন পাঠাগারটি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। যদিও এর ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ ও বর্ণনাতীত। ইউনেস্কো এরই মধ্যে গাজায় ১৬৪টি সাংস্কৃতিক নিদর্শন ধ্বংসের তথ্য যাচাই করছে। গাজার দেড় শ বছরের পুরাতন সেন্ট্রাল আর্কাইভসহ কমপক্ষে ১৩টি প্রধান পাঠাগার ধ্বংস করা হয়েছে। 

২০০৯ সালে ঐতিহাসিক ড. আবদুল লতিফ আবু হাশিম আইজ অন হেরিটেইজ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ২০১৪ সালে ইসরাইল বিমান হামলা করে সংস্থাটির সদর দপ্তর ধ্বংস করে এবং ২০২৫ সালে পুনরায় বিমান হামলার শিকার হয়ে তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। সে সময় শত শত নথিপত্র, পাণ্ডুলিপি ও আর্কাইভ ধ্বংস হয় ও হারিয়ে যায়। হানিন বলেন, সংস্থাটি স্বাধীন ও রাজনীতিমুক্ত হওয়ায় গাজার সাধারণ মানুষ তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষা এর ওপর অনেক বেশি আস্থা রেখেছিল।

সেই ধ্বংসই তাঁকে পাঠাগারের অবশিষ্ট অংশ রক্ষায় উদ্যোগী করেছে। তিনি একদল স্বেচ্ছাসেবী তরুণীকে প্রথমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তারা ধুলো, পশুর দেহাবশেষ, উচ্চ আদ্রতা ও পঁচনশীল বইয়ের স্তুপের ভেতর উচ্চ ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। কাজের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তারা নিজেরাই সংগ্রহ করেছে। যেমন ব্রাশ, দাস্তানা ও স্পঞ্জ ইত্যাদি। অনেক স্বেচ্ছাসেবী নিজের বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। যেমন টিস্যু, তোয়ালে, ঝাড়ু ইত্যাদি। প্রতিটি পদক্ষেপের আগে তারা পরস্পরের সঙ্গে পরামর্শ করে নেন। তারা উদ্ধারকৃত বইগুলো সংরক্ষণে প্রাথমিক কাজগুলোই করছে। পুরো উদ্ধার কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ও রাসায়নিকের অভাব থাকা তা সম্ভব হচ্ছে না। 

হানিন জানান, গত ২৯ জানুয়ারী তারা কাজ শুরু করেছে। এই কাজ পুরোপুরি শেষ করতে ২০-৩০ বছর সময়ও লাগতে পারে। ইসরাইলি আগ্রাসনে গাজার ৮০ শতাংশ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই অবশিষ্ট ঐতিহ্যগুলো রক্ষা করা অপরিহার্য। এই কাজে তিনি ও তাঁর দল পুরো জীবনকাল উত্সর্গ করতে প্রস্তুত। যেন এক শ বছর পরে যারা আসবে তারা হাজার বছর আগের ইতিহাস জানতে পারে।