এআই ক্যামেরার নজরদারি আখিরাতকে মনে করিয়ে দেয়
ইদানিং রাজধানী ঢাকার রাস্তায় বসানো কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা (AI) সম্পন্ন ক্যামেরা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী গাড়িকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে। কোনো গাড়ি উল্টো পথে চললে, সিগন্যাল অমান্য করলে বা নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গ করলেই সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল মামলা হয়ে যাচ্ছে।
মানুষের মুখে এখন একটি কথাই বেশি শোনা যাচ্ছে, এআই ক্যামেরার কোনো আবেগ নেই, কোনো অনুভূতি নেই। তাকে মা-চাচার ভয় দেখিয়ে কিংবা ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করার সুযোগ নেই। যার অপরাধ ধরা পড়বে, তাকেই মামলা দেওয়া হবে।
এই বাস্তবতা আমাদের আখিরাতের জবাবদিহিতার কথাও গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। কারণ মানুষের দুনিয়াবি অপরাধ যেমন ক্যামেরায় ধরা পড়ে, তেমনি মানুষের প্রতিটি কাজ মহান আল্লাহর দরবারেও সংরক্ষিত হয়ে যাচ্ছে। পার্থক্য হলো, দুনিয়ার ক্যামেরার শক্তি সীমিত (তার অ্যালগরিদম পরিবর্তন করিয়ে বা হ্যাক করে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব), কিন্তু আল্লাহর নজরদারি সর্বব্যাপী ও নির্ভুল।
মহান আল্লাহ মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন সব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত। কোনো কথা, কোনো দৃষ্টি, এমনকি অন্তরের গোপন চিন্তাও তাঁর অজানা নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সর্বদা তীক্ষ দৃষ্টি রাখেন। (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ১)
শুধু এই আয়াত নয়, পবিত্র কোরআনের আরো বহু আয়াতে মহান আল্লাহর সার্বক্ষণিক নজরদারির কথা উল্লেখ রয়েছে।
দুনিয়ার ক্যামেরা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট সড়ক বা মোড়ে সীমাবদ্ধ। কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টি আকাশ-জমিনের সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে। অন্ধকার রাত, বন্ধ ঘর, নির্জন স্থান কিংবা মানুষের অন্তরের গোপন ইচ্ছা, কোনো কিছুই তাঁর জ্ঞানের পরিধির বাইরে নয়।
মহান আল্লাহ মানুষের সঙ্গে এমন কিছু ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন, যারা মানুষের প্রতিটি কথা ও কাজ লিখে রাখেন। তারা কখনো ভুল করেন না, ক্লান্ত হন না এবং কারও প্রভাবেও প্রভাবিত হন না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা গ্রহণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।’ (সুরা ক্বাফ, আয়াত : ১৮)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘অবশ্যই তোমাদের উপর নিযুক্ত আছে তত্ত্বাবধায়কগণ; সম্মানিত লেখকগণ (যারা লিপিবদ্ধ করছে তোমাদের কার্যকলাপ), তারা জানে, যা তোমরা কর।’ (সুরা ইনফিতার, আয়াত : ১০-১২)
অর্থাত্ ফেরেশতারা প্রত্যেক ব্যক্তির প্রত্যেকটি কাজ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। সব জায়গায় সব অবস্থায় সকল ব্যক্তির সাথে তারা এমনভাবে লেগে আছে যে, তারা জানতেই পারছে না যে, কেউ তাদের কাজ পরিদর্শন করছে। কোন ব্যক্তি কোন নিয়তে কি কাজ করেছে তাও তারা জানতে পারে। তাই তাদের তৈরি করা রেকর্ড একটি পুর্ণাঙ্গ রেকর্ড। এই রেকর্ডের বাইরে কোন কথা নেই।
আজকের এআই ক্যামেরা যেমন ভিডিও ফুটেজে অপরাধ দেখিয়ে দেয়, আখিরাতেও মানুষের আমলনামা তার সামনে খুলে ধরা হবে। তখন মানুষ নিজের অপরাধ অস্বীকার করার সুযোগ পাবে না। কিয়ামতের দিন মানুষ নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। এমনকি তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। কিয়ামতের দিনের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে পবিত্র কোরআনে এসেছে, (তাকে বলা হবে) ‘পাঠ কর তোমার কিতাব, আজ তোমার হিসাব নেয়ার ব্যাপারে তুমিই যথেষ্ট।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ১৪)
কিয়ামতের দিন মানুষের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার ব্যাপারে এসেছে, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব এবং তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে ও তাদের পা সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত : ৬৫)
তাই আমাদের উচিত, সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর এই কঠোর নজরদারিকে ভয় করা। কোনো কিছুই আল্লাহর নজরদারি থেকে লুকানোর সুযোগ নেই। কোনো শক্তি দিয়ে আল্লাহর নিয়োজিত করা ফেরেশতাদের প্রভাবিত করার সুযোগ নেই।
মানুষ দুনিয়াতে অনেক সময় ক্ষমতা, সম্পর্ক বা ঘুষের মাধ্যমে শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু আখিরাতে কোনো সুপারিশ, কোনো প্রভাব, কোনো প্রতারণা কাজে আসবে না। আল্লাহর নিয়োজিত ফেরেশতারা তাঁর হুকুমের বাইরে এক চুলও নড়ার কোনো সাধ্য নেই।
দুনিয়ার নজরদারির আওতায় থাকলে মানুষ অপরাধ করতে ভয় পায়। রাস্তায় ক্যামেরা বসানোর পর যেমন অনেকে মামলার ভয়ে ট্রাফিক আইন মানতে শুরু করেছে, তেমনি প্রতিটি মুমিনেরও উচিত, সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর নজরদারির কথা স্মরণ করা। সব ধরনের গুনাহ থেকে নিজেদের বিরত রাখা। মহান আল্লাহ সবার অন্তরে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা সৃষ্টি করুন। আমিন।