শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

ডোমিনিকান রিপাবলিকে মুসলমানদের একাল-সেকাল

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 08 এপ্রিল 2026, 05:02 বিকাল • 125 বার পঠিত
ডোমিনিকান রিপাবলিকে মুসলমানদের একাল-সেকাল

ক্যারিবিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত সুন্দর দেশ ডোমিনিকান রিপাবলিক। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের এই দেশের বড় অংশ জুড়ে আছে পাহাড় ও বনভূমি। তবে নদী, সমতল ও কৃষি ভূমির পরিমাণও কম নয়। প্রাকৃতিক সম্পদেও সমৃদ্ধ দেশটি। খনি, কৃষি, ব্যবসা, শিল্পোত্পাদন ও পর্যটন দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। সান্তো ডোমিঙ্গো দেশটির সর্ববৃহত্ শহর ও রাজধানী। ডোমিনিকান রিপাবলিকের মোট আয়তন ৪৮ হাজার ৬৭১ বর্গ কিলোমিটার, জনসংখ্য এক কোটি ১৫ লাখ ৩২ হাজার ১৫১ জন। দেশটির বেশির ভাগ মানুষ খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারী। দেশটি স্বল্প সংখ্যক মুসলমান বসবাস করে।

১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে ক্যারিবিয়ান অঞ্চল স্পেনের উপনিবেশে পরিণত হয়। তখন নতুন বন্দোবস্ত গড়ে তোলার প্রয়োজনে বিপুল পরিমাণ দাস আমদানির প্রয়োজন হয়। স্পেন প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত পশ্চিম আফ্রিকা থেকে দাস আমদানি করত। খ্রিস্টীয় ১৬ শতকে আফ্রিকার উলুফ জাতিগোষ্ঠির মুসলিম দাসদের মাধ্যমেই ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ইসলামের প্রথম প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল। তাদের সঙ্গে ছিল স্পেন থেকে নির্বাসিত মুসলিমরাও।

সে সময় রাষ্ট্রীয় শক্তির ছত্রছায়ায় খ্রিস্টান মিশনগুলো আমেরিকায় ধর্মপ্রচারে মরিয়া ছিল। তারা প্রশাসকদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরেও বাধ্য করেছিল। এমনিতেই ধর্মপ্রচারকরা মুসলিম দাসদের পছন্দ করত না, তার ওপর ১৫০৩ সালে মুসলিম দাসরা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ফলে গভর্নর নিকোলাস ডি ওভান্ডো রানি ইসাবেলাকে মুসলিম দাস না পাঠানোর অনুরোধ করেন।

১৫২২ সালে একদল মুসলমানের নেতৃত্বে আমেরিকায় প্রথম বড় আকারের দাস বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এরপর আফ্রিকা থেকে উলুফ দাস আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্রোহটি ক্রিস্টোফার কলম্বাসের পুত্র অ্যাডমিরাল ডন দিয়েগো কোলোনের চিনির বাগানে সংঘটিত হয়। ১৫২২ সালের ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে দাসরা মেলকিওর ডি ক্যাস্ট্রোর গবাদি পশুর খামারে পৌঁছে যায়। ইউরোপীয় মিলিশিয়া বাহিনী নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করে।

ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আরেকটি প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম লাদিনো দাসরা। তারা ইউরোপীয় ভাষা ও সংস্কৃতিতে তুলনামূলক দক্ষ ছিল। তাদের কেউ কেউ দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পালিয়ে গিয়ে স্থানীয় জনগণ ও দাসদের নিয়ে প্রতিরোধী দল গঠনে সচেষ্ট হয়। যারা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ঝটিকা অভিযান চালাত। এই প্রতিরোধ প্রচেষ্টাও কিছুদিনের মধ্যে ভেঙ্গে পড়ে।

ব্যর্থ এসব প্রতিরোধের ফলে ক্যারিয়ান অঞ্চলে মুসলিম দাসদের আমদানির সমাপ্তি ঘটে এবং বহু বছরের জন্য এখানে মুসলমানদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলে দেয়। নতুন মুসলমানের আগমন বন্ধ, নানা ধরনের দমন-পীড়ন এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরের ফলে ক্যারিবিয়ান অঞ্চল এক শতাব্দীর ভেতর মুসলিমশূন্য হয়ে যায়।

ডোমিনিকান রিপাবলিকে মুসলিম আগমনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় উনিশ শতকে। সে সময় লেবানন ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে কিছু মুসলিম পরিবার এই দেশে এসেছিল। যদিও তাদের অনেকেই ধর্মীয় পরিচয় ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। বিশ শতকে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলিম শিক্ষার্থীরা ডোমিনিকান রিপাবলিকে আগমন করলে সেখানে মুসলিম আগমনের তৃতীয় ও সর্বশেষ ধাপ শুরু হয়। এই সময় ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে মুসলিম শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশটিতে আগমন করে। তাদের অনেকে কর্মসূত্রে এখানেই স্থায়ী হয়। তাদের মাধ্যমেই দেশটিতে ইসলামের প্রসার ঘটছে।

ডোমিনিকান রিপাবলিকে বর্তমানে কত সংখ্যক মুসলমান বসবাস করে তার সঠিক কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। তবে তাদের সংখ্যা কয়েক হাজারের বেশি নয়। মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান দ্য মুসলিম সার্কেল অব ডোমিনিকান রিপাবলিক (সিআইডিআর)-এর অনুমান দেশটিতে ৩০ সুন্নি মুসলিম এবং ১০ হাজার অন্যান্য মুসলিম রয়েছে।

সিআইআরডি সান্তো ডোমিঙ্গোর কেন্দ্রস্থলে দেশের প্রথম মসজিদ নির্মাণ করে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়াও শিশুদের দ্বিন শিক্ষা, বয়স্কদের জন্য ধর্মীয় সেমিনার, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বিনা মূল্যে চিকিত্সা সেবার ব্যবস্থা আছে। আন-নুর নামক এই মসজিদই দেশের সবচেয়ে প্রাণবন্ত মসজিদ। এটা ছাড়াও ডোমিনিকান রিপাবলিকে আরো পাঁচটি মসজিদ ও বহু নামাজের স্থান আছে। দেশটির পুন্তা কানায় নির্মিত হচ্ছে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মসজিদ ‘নুরুল ইসলাম’।

ডোমিনিকান রিপাবলিকে মুসলমানরা একটি ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় জনগোষ্ঠি। ধর্মপালনে তারা স্বাধীনতা পালন করলেও তাদের নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। তাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো দ্বিনি শিক্ষার অভাব। এখানে ইসলামী শিক্ষা দানের মতো দক্ষ লোক, ধর্মীয় বিদ্যালয় ও শিক্ষা উপকরণের মারাত্মক অভাব রয়েছে। উপযুক্ত ধর্মীয় শিক্ষা ও পরিবেশের অভাবে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যত দ্বিনদারি ব্যাপারে অভিভাবকদের শংকা রয়েছে।

তথ্যঋণ : ল্যাটিনো দাওয়াহ ডটঅর্গ, মুসলিম পপুলেশন ডটকম, দাওয়াহ ডটসেন্টার ও আজহার ডটইজি