শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

ধর্মীয় জ্ঞানার্জনে মেধা ও প্রজ্ঞার ব্যবহার

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 03 এপ্রিল 2026, 07:24 বিকাল • 113 বার পঠিত
ধর্মীয় জ্ঞানার্জনে মেধা ও প্রজ্ঞার ব্যবহার

প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা মুসলমানের জন্য ফরজ। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের প্রতি উত্সাহিত করা হয়েছে, এমনকি কোরআন নাজিলের সূচনা হয়েছিল ‘ইকরা’ (পড়ো) নির্দেশের মাধ্যমে। তাই মুসলমানের জীবনে জ্ঞানের চর্চা অপরিহার্য। মুসলিম তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে ধর্মীয় জ্ঞান লাভে সক্ষম হবে। মেধা, মনন ও শ্রমের সমন্বয় হলেই মুমিন জ্ঞানের কাঙ্ক্ষিত চূড়ায় আরোহন করতে পারবে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং আল্লাহ তোমাদেরকে নির্গত করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হূদয়, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৭৮)

উল্লিখিত আয়াত থেকে প্রমাণ হয় জ্ঞান লাভের জন্য শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি তথা ইন্দ্রীয় শক্তি এবং হূদয় তথা বোধ-বুদ্ধির সমন্বয় হওয়া আবশ্যক। 

ধর্মীয় জ্ঞানার্জনে ইচ্ছুক ব্যক্তির প্রথম দায়িত্ব হলো পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে সর্বোচ্চ শ্রম দান করা। যেন কাঙ্ক্ষিত জ্ঞানের ব্যাপারে ব্যক্তি কোনো অস্পষ্টতা না থাকে। অতঃপর তার দায়িত্ব হলো জ্ঞান থেকে ফিকহের স্তরে উন্নীত করা। ফিকহ দ্বারা ইসলামী শরিয়তের ব্যবহারিক আইন উদ্দেশ্য নয়, বরং উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানের উচ্চতর স্তর। যা আয়ত্ব, অনুসন্ধান, অনুধাবন ও রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে অর্জিত হয়। যে ব্যক্তি ধর্মীয় জ্ঞানের এই স্তরে উপনীত হতে চায় তাদের করণীয় হলো জ্ঞানের বাহ্যিক দিকের পরিবর্তে তার উদ্দেশ্যের প্রতি মনোযোগী হওয়া, শব্দের পরিবর্তে অর্থের প্রতি মনোযোগী হওয়া, খণ্ডিত চিন্তার পরিবর্তে সামগ্রিক চিন্তাকে সামনে রাখা। 

পবিত্র কোরআনে তাফাক্কুহ তথা গভীর জ্ঞানকেই মুমিনের জ্ঞানচর্চার লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের প্রত্যেক দলের এক অংশ বহির্গত হয় না কেন, যাতে তারা দ্বিন সম্পর্কে গভীর জ্ঞানানুশীলন করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে যাতে তারা সতর্ক হয়।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১২২)

আর হাদিসে এই স্তরকে কল্যাণ বলা হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাঁকে তাফাক্কুহ তথা দ্বিনের গভীর জ্ঞান দান করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১১৬)

ধর্মের গভীর জ্ঞান অর্জন করার পথ হলো বর্ণনা থেকে বোধের দিকে যাওয়া, মুখস্থ থেকে অনুধাবনের দিকে যাওয়া। আর জ্ঞানের বোধ ও অনুধাবনের পথে চলতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলে সূত্র ধরে; বিশুদ্ধ চিন্তা ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমদের সান্নিধ্য ও সহায়তায়। মনে রাখতে হবে, অধিক তথ্য আত্মস্থ করার নাম ইলম বা ধর্মীয় জ্ঞান নয়, ইলম আল্লাহপ্রদত্ত নুর বা জ্যোতি, যা মুমিনের অন্তরে প্রজ্জ্বলিত হয়। এজন্য হাদিসে বলা হয়েছে, ‘ফিকহের অনেক বাহক ফকিহ নন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৩৬৬০)

হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য তারা শব্দ ও তথ্যের ধারক হলেও এর মর্ম ও তত্ত্বকথা অনুধাবন করতে পারেনি, তা তাদের আত্মস্থ হয়নি। যারা বাহ্যিক জ্ঞানের অধিকারী অথচ তারা এর গভীরতম শিক্ষা, প্রজ্ঞা ও রহস্যগুলো জানে না তাদেরকে কোরআনে সেই গাধার সঙ্গে তুলনা করেছে যে গাধা জ্ঞানের উপকরণ বহন করে, অথচ সে এর মর্ম অনুধাবন করতে পারে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছিল, কিন্তু তারা তা বহন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত পুস্তক বহনকারী গর্দভ!’ (সুরা জুমা, আয়াত : ৫)

অন্যদিকে হাদিসে ধর্মীয় জ্ঞান হূদয়াঙ্গমকারী আলেমকে উর্বর ভূমির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যে নিজে ইলম দ্বারা উপকৃত হয় এবং অন্যরাও দ্বারা উপকৃত হয়। আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা আমাকে যে হেদায়াত ও ইলম দিয়ে পাঠিয়েছেন তার দৃষ্টান্ত হলো জমিনের ওপর পতিত প্রবল বর্ষণের মতো। কোনো কোনো ভূমি থাকে উর্বর যা সে পানি শুষে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঘাসপাতা এবং সবুজ তরুলতা উত্পাদন করে। আর কোনো কোনো ভূমি থাকে কঠিন যা পানি আটকে রাখে। পরে আল্লাহ তাআলা তা দিয়ে মানুষের উপকার করেন; তারা নিজেরা পান করে ও (পশুপালকে) পান করায় এবং তা দ্বারা চাষাবাদ করে। আবার কোনো কোনো জমি রয়েছে যা একেবারে মসৃণ ও সমতল; তা না পানি আটকে রাখে, আর না কোন ঘাসপাতা উত্পাদন করে। এই হলো সে ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে দ্বিনের জ্ঞান অর্জন করে এবং আল্লাহ তাআলা আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তাতে সে উপকৃত হয়। ফলে সে নিজে শিক্ষা করে এবং অপরকে শেখায়। আর এটা সে ব্যক্তিরও দৃষ্টান্ত যে সে দিকে মাথা তুলে দেখে না এবং আল্লাহর যে হেদায়াত নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি, তা গ্রহণও করে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৯)

আল্লাহ তাআল্লাহ সবাইকে দ্বিনি ইলম হূদয়াঙ্গম করার তাওফিক দিন। আমিন।