শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

ড. সাইফুলের তাবলীগ ও হজ্জ গাইড জীবন

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 01 মে 2026, 05:35 বিকাল • 145 বার পঠিত
ড. সাইফুলের তাবলীগ ও হজ্জ গাইড জীবন

ড. মো: সাইফুল ইসলামের কর্মময় জীবনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি দিক হলো আধ্যাত্মিকতার। বোঝার বয়স হওয়া থেকে মসজিদমুখী সাইফুল। কলেজ জীবন থেকে তাবলীগ জামাতের সাথী। এছাড়া হজ্জ গাইড হিসেবে কাজ করেন বলে প্রায় প্রতি বছরই পবিত্র হজ্জ পালনের সৌভাগ্য হয় তার। হজ্জ ও ওমরা পালন নিয়ে তার প্রকাশিত বইও আছে। ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবন হলেও ধার্মিক হিসেবে খুবই সাধারণ জীবনযাপন তার।

ধর্মকে খুব গভীরভাবে পালনের বিষয়টা মূলত পরিবারের মধ্য থেকে এসেছে। তারপর সেই শেকড় ছড়িয়েছে আরো ভেতরে। চারটি বিষয় তার মধ্যে খুব কাজ করেছে।

ছোটবেলা থেকে বাবা-মাকে ধার্মিক পেয়েছেন। তাদের নামাজ কখনো কাজা হতে দেখেননি। তার বাবা প্রতিদিন সকালে ১ ঘণ্টা কুরআন তেলওয়াত করতেন, কখনো মিস হতো না। প্রতি রমজানে সাইফুলের বাবা কুরআন ট্রেনিংয়ের জন্য কোনো না কোনো জেলায় সফর করতেন। এটা ছিল একটি প্রেরণা।

দ্বিতীয় অনুপ্রেরণা হলো তাবলীগ। যা সাইফুলকে আমূল বদলে দেয়। ১৯৯৭-৯৮ সালে যখন কলেজে ছিলেন তখন তার হোস্টেল সুপারের মাধ্যমে তাবলীগে হাতেখড়ি হয়। এরপর মাদ্রাজে পড়াশুনা করার সময়ও কিছু সময় তাবলীগে ব্যয় করেন। পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরে চাকরি জীবনে ঢোকার পর তাবলীগের সঙ্গে আরো জড়িয়ে পড়েন। ২০০৭ সালে তাবলীগের তিনদিনের সফরে নিয়মিত যাওয়া শুরু করেন। ২০০৮ সালের মার্চে তিন চিল্লায় যাওয়ার নিয়ত করে পরের মাসে সফরে বের হয়ে যান। ১২০ দিনের সফরের শুরুতে ছিলেন নাটোর সদরে ও সিংড়ায়। ওখানে ৬০ দিন শেষ করে রংপুরের বদরগঞ্জ থানার রামনাথপুর ইউনিয়নে ৪০ দিন কাটে। শেষ ২০ দিনে ধামরাইয়ে তিনি হন জামাতের জিম্মাদার। 

তৃতীয় যে বিষয়টা তার মধ্যে কাজ করেছে সেটি একজন ব্যক্তিকেন্দ্রিক। হযরত হাফেজ্জি হুজুরের (রহ:) একজন খলিফা ছিলেন যার সঙ্গে হৃদ্যতা তৈরি হয় সাইফুলের। তার নাম হযরত শেখ শিহাবউদ্দিন (রহ:)। ২০০৯ সালের অক্টোবরে তার সঙ্গে সম্পর্কের শুরু। তার সঙ্গে এতটাই ঘনিষ্ঠতা হয় যে ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল বা পহেলা বৈশাখে তিনি খেলাফত দেন সাইফুলকে। ওই সময় বেশ কিছুদিন ধরে সারা বাংলাদশে বৃষ্টি হচ্ছিলো না। এমন সময়ে সেখানে গিয়ে হযরত শিহাবউদ্দিন (রহ:) ইস্তিস্কার নামাজ পড়ান এবং গ্রামের সবার সামনে সাইফুলের খেলাফতের বিষয় ঘোষণা করেন। সম্পর্কটা এমনই ছিল যে প্রতি সপ্তাহে সাইফুল তার খোঁজ নিতেন বা তিনি সাইফুলের খোঁজ নিতেন। এবং ওলামায়ে কেরামের মজলিসে তিনি তাকে সবার সামনে তার কাছে বসাতেন। 

তার সঙ্গে সাইফুলের হৃদ্যতা কেমন ছিল বোঝাতে একটা ঘটনা বলা যায়।  একবার মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন সাইফুল। তার মা কান্নাকাটি করেন এই ভেবে যে ছেলে হয়তো বাঁচবেই না। অবস্থাটা তেমনই ছিল। বিরাট এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন সাইফুল। এই সময়ে হযরত শিহাবউদ্দিনকে (রহ:) ফোন করে সাইফুল জানান, হজ্জে যাওয়া হচ্ছে না তার। টাকা পয়সা জোগাড় হয়নি। সেদিন সালাম বিনিময়ের পর হযরত শিহাবউদ্দিন (রহ:) তাকে বলেন, হাজী সাহেব কেমন আছেন? সাইফুল জবাবে বলেন, আমাকে হাজী সাহেব বলছেন অথচ আমার হজ্জে যাওয়া হচ্ছে না। জবাবে হযরত বলেন, আপনি আলহামদুলিল্লাহ বলেন এবং আপনি হজ্জে যাবেন। 

এরপর ২০১২ সালে মাকে নিয়ে প্রথমবার হজ্জে যান সাইফুল। সেই সফরে খুব বেশি না হলেও যতোটা মায়ের খিদমত করতে পেরেছেন তাই হয়তো আল্লাহ কবুল করেছেন। পরের বছর তিনি বাবার কাজা হজ্জের জন্য যাবেন। কিন্তু সৌদি সরকারের নিয়মের কারণে সেটা হয়ে উঠছিল না। পরে এক এজেন্সির সঙ্গে সম্পর্ক হলো। তারা তাকে হজ্জ গাইড হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নিয়ে গেল। যদিও সেবার পুরো টাকা দিয়েই হজ্জ করেছেন সাইফুল। 

সেই থেকে সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল এবং প্রায় প্রতি বছর তিনি হজ্জে যাচ্ছেন। অনেকে তার সঙ্গে হজ্জ করতে যান। যারা যাচ্ছেন তারাই আবার পরের বছরের জন্য হাজী দিচ্ছেন। বলতে গেলে নূন্যতম চেষ্টাতেই হাজী পাচ্ছেন সাইফুলরা।
 
শেষ ১০-১২ বছরে হাজীদের ট্রেনিং দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। অনসাইট, অনলাইন ট্রেনিং দিচ্ছেন। রেকর্ডেড অনেক সেশন আছে তার। একদিন বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের হাদিস বিভাগের প্রধান মুফতি আব্দুস সালামকে (দা:) ট্রেনিং এর প্রেজেন্টেশন দেখান সাইফুল। তখন তিনি এটাকে বই আকারে প্রকাশ করতে বললেন। তাতে সাধারণ মানুষের উপকার হবে বলে জানান তিনি। 

এরপর ২০২৫ সালে সাইফুলের নামে ‘সহজ হজ্জ ও ওমরা’ বইটি বাজারে আসে। এই বইয়ে অবদান আছে মুফতি নাসির উদ্দিনের। তার সাথে কয়েকটি বই প্রকাশে তার আগে অবদান রেখেছেন সাইফুলও। সবচেয়ে বড় যে বইটি তারা প্রকাশ করেছেন সেটির নাম ‘আমার সালাত’। যত সালাত আছে তা কখন কিভাবে পড়তে হবে, লাভ কী তার বিস্তারিত আছে ওই বইয়ে। প্রায় সাড়ে পাঁচশ পৃষ্ঠার বই। সেখানে কিছু লেখা আছে সাইফুলের। ‘হাফেজের‌ মর্যাদা’ বইটিতেও ভূমিকা আছে সাইফুলের। তার প্রকাশনা থেকে বইটির প্রকাশ। 

শেষে তার নিজের নামে প্রকাশিত বইটি প্রকাশের আগে বইয়ে লেখক হিসেবে নিজের নাম দেওয়া নিয়ে একটু সংশয় কাজ করছিল সাইফুলের। কারণ, ইসলামিক পথে পড়াশুনা করেননি তিনি। জেনারেল লাইনে পড়ালেখা বলে মানুষ কিভাবে সেটি নেয়। মুফতি আব্দুস সালামকে (দা:) তা জানান তিনি। মুফতি আব্দুস সালাম (দা:) রায় দেন, যেহেতু হজের আমল সংক্রান্ত পুরোটাই সাইফুলের কৃতিত্বে তাই তার নামেই বইটি প্রকাশ হোক। তাই হয়েছে। ওটাই সাইফুলের নামে প্রকাশিত প্রথম বই।