চাঁদে যৌথ মহাকাশ স্টেশন বানাবে চীন ও রাশিয়া
চাঁদে যৌথভাবে মহাকাশ স্টেশন তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। রুশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা রসকসমস বলছে, এ বিষয়ে তারা চীনের জাতীয় মহাকাশ সংস্থার সাথে একটি চুক্তিতে সই করেছে। দু’টি দেশের সরকারের পক্ষে মহাকাশ গবেষণা সংস্থার নেতারা এই চুক্তিতে সই করেন।
তারা বলছেন, গবেষণার জন্য তারা চন্দ্রপৃষ্ঠে বা চাঁদের কক্ষপথে অথবা উভয় স্থানেই কেন্দ্রটি বানাবে। এর নাম দেয়া হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লুনার সায়েন্টিফিক রিসার্চ সেন্টার বা আইএলআরএস।
এ বিষয়ে দু’দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা থেকে একটি যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও চীন ছাড়া অন্য দেশও ইচ্ছে করলে এই কেন্দ্রটি ব্যবহার করতে পারবে। ‘স্টেশনটি সবার জন্য খোলা থাকবে।’
রাশিয়া মহাকাশে প্রথমবারের মতো মানুষসহ যান পাঠানোর ৬০ বছর পূর্তি উদযাপনের প্রস্তুতির সময় এ ঘোষণাটি এলো। দেশটি ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে ইওরি গেগারিনকে প্রথম মহাকাশে পাঠিয়েছিল।
নতুন পরিকল্পনা কেন?
রাশিয়া ও চীনের দুই সংস্থা থেকে দেয়া যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চাঁদে আন্তর্জাতিক এই কেন্দ্রের সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হবে, যার মধ্যে রয়েছে চাঁদে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিভিন্ন কাজে এই উপগ্রহটিকে ব্যবহার করা।
‘চীন ও রাশিয়া নিজেদের অভিজ্ঞতায় মহাকাশ বিজ্ঞান, গবেষণা, মহাকাশ সংক্রান্ত প্রযুক্তি, যন্ত্র-সামগ্রী তৈরি ও এসব ব্যবহারে কাজে লাগাবে। এ জন্য চাঁদে একটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন নির্মাণে তারা যৌথভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।’
এ ছাড়াও চাঁদে মহাকাশ স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা, নকশা ও নির্মাণের পাশাপাশি এটি পরিচালনায় রাশিয়া ও চীন একসাথে কাজ করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
মহাকাশে বর্তমানে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন বা আইএসএস নামের একটি গবেষণা কেন্দ্র আছে, যেখানে নভোচারীরা অবস্থান করছেন। প্রায় ২০ বছর আগে ওই স্টেশনটি মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। এখন পর্যন্ত মহাকাশে এটিই একমাত্র স্টেশন।
চাঁদ ও মহাকাশের আরো গভীরে গবেষণা পরিচালনার জন্য একটি তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলার ব্যাপারেও চীন ও রাশিয়া সম্মত হয়েছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়।
মহাকাশে চীনের শক্তি
চীনের মহাকাশ কর্মসূচির বিষয়ে একজন গবেষক চেন লান বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘এই প্রকল্পটি অনেক বড় বিষয়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণায় চীনের দিক থেকে এটাই হবে সবচেয়ে বড় সহযোগিতা। এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।’
বিশ্লেষকদের মতে, মহাকাশ গবেষণায় তুলনামূলকভাবে অনেক দেরিতে নেমেছে চীন। গত বছরের ডিসেম্বরে দেশটি চাঁদে ‘চাঙ্গ ই-৫’ নামে একটি মহাকাশ যান পাঠায়, যা চাঁদের বুক থেকে পাথর ও ‘মাটি’ সংগ্রহ করে পৃথিবীতে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি দেশ চাঁদ থেকে নমুনা পৃথিবীতে আনতে পেরেছে। এর মধ্যে চীন একটি। চাঁদে চীনের এই অভিযানকে মহাকাশে চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মহাকাশ গবেষণায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছে। দেশটি চাঁদের অভিমুখে ‘চাঙ্গ ই-৭’ নামে আরেকটি যান পাঠানোর কাজ করছে। রাশিয়ার এ সংক্রান্ত পরবর্তী কর্মসূচি ‘লুনা ২৭’। এ দু’টি প্রকল্পেরই লক্ষ্য চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে গবেষণা চালানো।
মহাকাশ গবেষণার সূচনায় বড় ধরনের ভূমিকা ছিল রাশিয়ার। পরে দেশটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। এর আগে একমাত্র রাশিয়াই নভোচারীদেরকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু গত বছর মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেস-এক্সের সাফল্যের পর মহাকাশে রাশিয়ার এখন আর একচেটিয়া ক্ষমতা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্রও কিছু পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে, যাতে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটির চাঁদ সংক্রান্ত গবেষণায় ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। দেশটির এ কর্মসূচির নাম দেয়া হয়েছে ‘আর্টেমিস’, যাতে একজন করে নারী ও পুরুষ চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করবে।
বিশ্লেষকরা বলছে, ১৯৭২ সালের পর এটিই হবে মানুষের প্রথম চাঁদে অবতরণ। মানুষ প্রথম চাঁদের মাটিতে পা ফেলেছিল ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা নাসার ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত ১২ জন নভোচারী চাঁদে নেমেছিলেন।