শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস ও ইসলাম

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 26 এপ্রিল 2026, 07:04 বিকাল • 129 বার পঠিত
বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস ও ইসলাম

২৬ এপ্রিল বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস (World Intellectual Property Day)। ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর জাতিসংঘের ‘বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থা’র আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য IP and Sports: Ready, Set, Innovate ‘আইপি এবং খেলাধুলা : প্রস্তুত, শুরু, উদ্ভাবন’। বাংলাদেশে ‘গ’ শ্রেণিভুক্ত দিবস ‘বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস’।

দিবসের লক্ষ্য হলো : মেধাসম্পদের কৃতিস্বত্ব (পেটেন্ট), বিপণন স্মারক (ট্রেডমার্ক) কপিরাইট সুরক্ষার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভাবক, গবেষকদের শিল্পসুষমা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং সমাজ উন্নয়ন-পরিবর্তনে তাঁদের ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো। রবীন্দ্রনাথের উচ্চারণে

‘কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,

যে আছে মাটির কাছাকাছি

সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি।

.....সত্য মূল্য না দিয়েই সাহিত্যের খ্যাতি করা চুরি।

ভালো নয়, ভালো নয় নকল সে শৌখিন মজ্দুরি।’

মানব প্রতিভার সাধনা হলো intellectual labor, ভোগবাদী সমাজে সাধনাটির তেমন মূল্যায়ন নেই। সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ স্বপ্নাবিলাসী। ‘মেধা’ মানুষের স্বপ্নজয়ের শক্তি। বিশ্বজয়ী সবাই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছেন তাদের মেধা তথা তার ভেতরের শক্তি বিকাশের মাধ্যমে। 

মহান আল্লাহ আমাদের দান করেছেন অফুরন্ত অনুগ্রহ। ‘মেধা’ এমনই গুরুত্বপূর্ণ অনুগ্রহ। ‘মেধা’ মানুষকে বানিয়েছে আশরাফুল মাখলুকাত (সৃষ্টির সেরা)। মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণির মেধাগত উদ্ভাবনী যোগ্যতা নেই। মেধার জোরেই মানুষ শক্তিশালী এবং বিষাক্ত প্রাণি-কে বশে এনেছে, নিজের প্রয়োজনে। মহান আল্লাহ বলেন ‘যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করো, তবে তা গুণে শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত : ৩৪) সুরা ‘আর-রহমান’-এর জিজ্ঞাসা ফাবিআয়্যি-আলা-ই-রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান অর্থাত্ ‘অতএব, হে জিন ও মানুষ! তোমরা উভয়ে তোমাদের রব্বের কোন কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?’ (সুরা আর রাহমান, আয়াত : ১৩)

বর্তমানে মেধার আলোচনায় আমরা বুঝি আইনস্টাইন, স্টিফেন হকিং, স্টিভ জবস, মার্ক জাকারবার্গ। আমরা বুঝি না ইমাম আবু হানিফা, ইমাম বুখারি, ইমাম গাজ্জালি (রহ.)! অথচ তাঁরা মেধার জোরেই নিজেদের মেলে ধরেছেন বিশ্বজয়ী কালজয়ীর উচ্চশিখরে।

মানুষের আন্তর্নিহিত মেধাসম্পদ (Intellectual Property) বিকাশে পবিত্র কোরআনের ৭৫৬ আয়াতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ থাকায় মহামনীষীরা বিনয়াবনত চিত্তে ঘোষণা করেছেন : ‘হে আমাদের রব, আপনি এ গুলো অনর্থক সৃষ্টি করেননি।’ (সুরা আল ইমরান, আয়াত : ১৯১)

মেধাচর্চা সার্বক্ষণিক ইবাদত। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘জ্ঞানের কথা জ্ঞানীর হারানো মহামূল্যবান ধন, তা সে যেখানেই পাবে, তা গ্রহণ করবার অধিকার আছে তার।’ (ইবনু মাজাহ)

এজন্যই জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের মেধার স্বাক্ষর সুস্পষ্ট :

 জাবির ইবনু হাইয়্যান—রসায়ন শাস্ত্রের পথিকৃত।

 আল-বিরুনি— বিশ্বসেরা ভূগোল বিশারদ।

 ইবনু সিনা—চিকিত্সা শাস্ত্রের পথিকৃত।

 আল ফারাবি—পদার্থ বিজ্ঞানের নানান সূত্র আবিষ্কারক।

 ওমর খৈয়াম—অ্যানালেটিক জ্যামিতির পথিকৃত।

 আল কিন্দি—সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধারকারী।

 আল খাওয়ারিজমি—বীজগণিতের পথিকৃত।

 আল রাজি—গুটি বসন্তের আবিষ্কারক।

মানবমেধা, জ্ঞানের মূল উত্স ‘ওয়াহি’। মহান আল্লাহর প্রথম আদেশ—‘পাঠ করো তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন... তিনি মানুষকে তাই শিখিয়েছেন যা সে জানতো না।’ (সুরা আলাক, আয়াত : ০১— ০৫)

ইসলামের আলোকে মেধাবিকাশ ক্ষেত্র :

• ‘ইলমুল ইয়াকিন’ বা বিশ্বাসগতজ্ঞান, 

• ‘আইনুল ইয়াকিন’ বা চাক্ষুষজ্ঞান, 

• ‘হাক্কুল ইয়াকিন’ বা সত্যজ্ঞান। 

ভূগর্ভস্থ খনিজসম্পদ উত্তোলন যেমন মানবমেধার জীবন্ত উদাহরণ তেমনি আদর্শবান উদ্ভাবক, গবেষকের পরিচর্যা ও অধ্যবসায়েই বিকশিত হয় মানবমেধার নানান অধ্যায়। মানুষের মেধা-প্রতিভা প্রসঙ্গে প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘সোনা ও রুপার খনির মতো মানুষও খনিতুল্য।’ (মুসলিম)

প্রিয় নবী (সা.)-এর অনুপ্রেরণায় আজওয়াজে মুতাহহারা, আহলে বাইত, সাহাবা কিরাম, তাবেঈ-তাবেতাবেঈন এবং তাফসির, হাদিস, ফিকহ, তাসাউফের ইমাম, মুজতাদি, আউলিয়ারা হলেন উচ্চনৈতিকতা ও শ্রেষ্টত্বের দ্যুতিবাহক। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় :

‘...মুক যারা দুঃখে সুখে

নতশির স্তব্ধ যারা বিশ্বের সম্মুখে।

ওগো গুণী, কাছে থেকে দূরে যারা তাহাদের বাণী যেন শুনি।

তুমি থাকো তাহাদের জ্ঞাতি

তোমার খ্যাতিতে তারা পায় যেন আপনারি খ্যাতি...।’

বস্তুত, ইলম ও আমলের সমন্বিত ধারায় বিকশিত মানুষের মেধাসম্পদের মূল্য অপরিসীম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই জ্ঞানীরাই আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে।’ (সুরা ফাতির, আয়াত : ২৮)