শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

আমার ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলেছে পুলিশ`: ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 20 আগস্ট 2025, 09:48 রাত • 357 বার পঠিত
আমার ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলেছে পুলিশ`: ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি

“আমার একমাত্র ছেলে শহীদ হয়েছে। ছেলেটা ১০ পারা কোরআনের হাফেজ ছিল। খুব আদরযত্নে তাকে বড় করেছি। কিন্তু তারা বাঁচতে দিলো না। ছেলে হারানোর যন্ত্রণা আমি বুঝি। আপনি কী বুঝবেন? সন্তান আমার হারিয়েছে, আপনাদের না। আমি সন্তান হারিয়েছি, আপনি আর কী জিজ্ঞেস করবেন?”— কান্নায় ভেঙে পড়ে আদালতের জেরাকক্ষে এই কথাগুলো বলেন শহীদ শেখ মেহেদী হাসান জুনায়েদের মা সোনিয়া জামাল।

বুধবার (২০ আগস্ট ২০২৫), জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন তিনি। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল তার জবানবন্দি গ্রহণ করে। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।

আদালতে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন, যিনি শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স হিসেবে নিয়োজিত, তিনি যখন তাকে প্রশ্ন করছিলেন, তখন সোনিয়া নিজের সন্তান হারানোর যন্ত্রণার কথা তুলে এই আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানান।

জবানবন্দিতে সোনিয়া জানান, তার ছেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া উইল পাওয়ার স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল এবং তার বয়স ছিল ১৪ বছর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখারপুল এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হয় জুনায়েদ। সে ১ জুলাই থেকে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছিল—যা তার মা শুরুতে জানতেন না।

৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নাশতার পর জুনায়েদ সোনিয়াকে বলে, বন্ধু সিয়ামকে নিয়ে আন্দোলনে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সোনিয়াও মেয়ে নাফিসা নাওয়ালকে সঙ্গে নিয়ে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে আন্দোলনে যোগ দিতে রওনা দেন। পথে তাদের রিকশা দুই দফা পুলিশ দ্বারা আটকানো হয়। একপর্যায়ে হেঁটেই আন্দোলনে পৌঁছান সোনিয়া।

তিনি বলেন, দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে তারা আন্দোলনে পৌঁছান। ঘণ্টাখানেক পর ছোট ভাই আসিফের ফোনে জানতে পারেন, জুনায়েদ আহত হয়েছে। বাসায় গিয়ে ভাশুরের কক্ষে ছেলেকে বিছানায় শুইয়ে থাকতে দেখেন তিনি। গুলিবিদ্ধ ছিল তার চোখের বাঁ পাশে এবং মাথার পেছনে বড় একটি গর্ত তৈরি হয়েছিল। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল সে।

এ অবস্থায় আদালতের ডায়াসে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন সোনিয়া। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ওইদিন শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটের বিপরীত পাশের ফুটপাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় তার ছেলে। বন্ধু সিয়াম ও আব্দুর রউফ তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জানান, সে আগেই মারা গেছে। পরে তারা লাশ বাসায় নিয়ে আসে।

আসরের পর জুনায়েদের জানাজা হয় ধূপখোলা মাঠে, একই স্থানে শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের জানাজাও অনুষ্ঠিত হয়। পরে দুজনকেই জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

সোনিয়া ট্রাইব্যুনালে আরও বলেন, চানখারপুল এলাকার নবাব কাটরা এলাকায় এডিসি আক্তারুল ইসলামের নেতৃত্বে কনস্টেবল সুজন, ইমাজ, নাসিরুল গুলি চালিয়ে তার ছেলে জুনায়েদসহ আনাস, ইয়াকুব, রাকিব, ইমতিয়াজ ও মানিককে হত্যা করে। এই অভিযান পরিচালিত হয় ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশে— এমন দাবি করেন তিনি।

তিনি জানান, তার সন্তানকে গুলি করার একটি ভিডিও তাকে সরবরাহ করেছেন আব্দুর রউফ, যা আদালতে প্রদর্শিত হয়। ভিডিওতে জুনায়েদের রক্তাক্ত লাশ শনাক্ত করেন তিনি। লাশের বাঁ চোখে ব্যান্ডেজ এবং মাথার পেছনে রক্ত দেখা যায়। ভিডিও দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সোনিয়া।

এরপর রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন তাকে জেরা শুরু করলে, সন্তান হারানোর যন্ত্রণা থেকে আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি বলেন, “আমি সন্তান হারিয়েছি, আপনি আমাকে আর কী জিজ্ঞেস করবেন?” জবাবে আইনজীবী বলেন, “আমরাও মর্মাহত। কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব থেকে কিছু প্রশ্ন করতেই হয়।”