ভোগ্য পণ্যের পরীক্ষা ৪০ শতাংশই ভেজাল!
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার গোপীনাথপুর মজমপাড়া এলাকার গাছি ককেল মিয়া শীত মৌসুমজুড়ে খেজুরের গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেজুরের গুড়ের চাহিদা বেশ বেড়েছে তাঁর। বিপরীতে রসের পরিমাণ কমছে। এতে গুড়ের দামও বেশ ভালো পাওয়া যাচ্ছে। এই লোভ সামলাতে পারেননি তিনি। ঝোলাগুড়ের সঙ্গে চিনি আর চুনের মিশেলে ভেজাল গুড় তৈরির পথ ধরলেন। তাঁর মতো এলাকার আরো দু-তিনজন একই পথে খেজুরের গুড় তৈরি করতে লাগলেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তিনি ধরা পড়লেন।
শুধু গুড়ের ক্ষেত্রে নয়, বর্তমানে প্রায় সব খাদ্যেই এমন ভেজাল দেওয়া হচ্ছে হরহামেশা। গ্রামের সহজ-সরল মুড়ি তৈরিকারী থেকে শুরু করে বড় বড় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত খাদ্যে ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন সময় অভিযানে। মাছ ও শাক-সবজিতে ফরমালিন, বিষাক্ত জেলি ও কীটনাশক, ভোজ্য তেলে অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট, মসলায় রং, ইট ও কাঠের গুঁড়া, মুড়িতে ইউরিয়া, পানিতে কলেরার জীবাণু, গরুর দুধে পাউডার ও পানি মিশ্রণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মিষ্টি ও বেকারি পণ্য তৈরি, হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারে বাসি-পচা ও পোড়া তেল ব্যবহার ইত্যাদি নানা উপায়ে হাতের কাছের সব খাবারেই ভেজাল মিশছে প্রতিদিন। বাদ যাচ্ছে না শিশুখাদ্যও।
.jpg)
মুগদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে এখন নানা উপায়ে খাদ্যে ভেজাল মিশছে। এর কারণে তাত্ক্ষণিক কিছু রোগ হয়। যেমন : ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, বমি হওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে হৃদরোগ, কিডনি রোগ, ব্রেনের সমস্যা ও ক্যান্সারসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। যেমন : ফরমালিনে লিভার, কিডনি ড্যামেজ হয়ে যায়। খাদ্যে নানা ধরনের কেমিক্যাল ও প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়। অনেক খবারে হেভি মেটাল থাকে। এসব উপাদান শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনে।’
দেশে স্বাধীনতার পর থেকে খাদ্য উৎপাদন যত বেড়েছে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির চ্যালেঞ্জও তত বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্য মতে শুধু ট্রান্সফ্যাট ঘটিত হৃদরোগে মৃত্যুর সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ডাব্লিউএইচওর ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের কারণে বাংলাদেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বছরে পাঁচ হাজার ৭৭৬ জন মানুষ মারা যায়। খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা পিএইচও, যা ডালডা বা বনসপতি ঘি নামে সুপরিচিত। পিএইচও বা ডালডা সাধারণত বেকারি পণ্য, প্রক্রিয়াজাতকৃত ও ভাজা-পোড়া স্ন্যাকস এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সড়কসংলগ্ন দোকানে খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় ঢাকার পিএইচও নমুনার ৯২ শতাংশে ডাব্লিউএইচও সুপারিশকৃত ২ শতাংশ মাত্রার চেয়ে বেশি ট্রান্সফ্যাট (ট্রান্সফ্যাটি এসিড) পাওয়া গেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম পিএইচও নমুনায় সর্বোচ্চ ২০.৯ গ্রাম পর্যন্ত ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে, যা ডাব্লিউএইচওর সুপারিশকৃত মাত্রার তুলনায় ১০ গুণেরও বেশি।
জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সারা দেশ থেকে সংগৃহীত ৪৩টি ভোগ্য পণ্যের মোট পাঁচ হাজার ৩৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করে তার মধ্যে ৪৩ ধরনের পণ্যেই ভেজাল পাওয়া যায়। এসব নমুনা তারা নিজেদের ল্যাবে পরীক্ষা করে। এ ক্ষেত্রে ভেজালের পরিমাণ গড়ে ৪০ শতাংশ? এর মধ্যে ১৩টি পণ্যে ভেজালের হার প্রায় শতভাগ। ভোগ্য পণ্যে কী পরিমাণ ভেজাল আছে তা দেখতে এই পরীক্ষা করা হয়।
নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর ২০১৯ সালে বাজার থেকে মোট তিন হাজার ৫৬৬টি খাদ্য নমুনা সংগ্রহ করে। তা থেকে দুই হাজার ৪৬২টি পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। পরীক্ষা শেষে তার থেকে ৩৭৪টি খাদ্য নমুনায় ভেজাল পাওয়া যায়। অর্থাৎ বাজারের ১৫ শতাংশ খাবারেই ভেজাল পাওয়া গেছে।