শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

সমাজ ও রাষ্ট্রে অপচয়ের প্রভাব

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 04 এপ্রিল 2026, 11:01 দুপুর • 134 বার পঠিত
সমাজ ও রাষ্ট্রে অপচয়ের প্রভাব

মহান আল্লাহ মানবজাতিকে অসংখ্য নিয়ামত দিয়েছেন। শারীরিক সুস্থতা, অর্থ-সম্পদ, মেধা, প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে শুরু করে জীবনের পরতে পরতে মহান আল্লাহর দেওয়া অগণিত নিয়ামত রয়েছে। যার সবই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। মানুষের দায়িত্ব এই আমানতগুলো যথাযথ ভাবে রক্ষা করা। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে যথাযথ ভাবে ব্যবহার করা। অপব্যবহার বা অবহেলা না করা। কোনো অবস্থাতেই যেন নিয়ামতের অপচয় না হয়, সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকা। কেননা প্রতিটি অপচয়ই নীরবে ক্ষতি ও বিপদ ডেকে আনে। যার প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত পড়তে পারে। অপচয় সম্পর্কে সতর্ক করে মহান আল্লাহ বলেছেন, অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ। (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৭)

এ আয়াত আমাদের বুঝিয়ে দেয়, অপচয় কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি ঈমান ও নৈতিকতার সাথেও গভীরভাবে জড়িত।

লোক দেখানো কিংবা প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্যে অপ্রয়োজনীয় খরচ করা জীবনে নানাবিধ অকল্যাণ ডেকে আনে। এই অপচয় শুধু এক অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তার সঙ্গে যোগ হয়, অহংকার ও বড়াই করার অপরাধ। যা আল্লাহ তাআলাকে ক্রোধান্বিত করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর জমিনে বড়াই করে চলো না; তুমি তো কখনো জমিনকে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড় সমান পৌঁছতে পারবে না।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৭)

তাই লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে অপচয় করা মূর্খতা বৈ কিছু নয়। এটি একটা পর্যায়ে গিয়ে জীবনের বরকত তুলে নেয় এবং মানসিক চাপ বাড়ায়। সমাজে ব্যাপক ভাবে এই প্রতিযোগিতা চললে, তার প্রভাব সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও পড়ে। যেমন বিদ্যুত, গ্যাস বা জ্বালানি ইত্যাদির অপচয়ের প্রবণতা যদি ব্যাপক হারে দেখা দেয়, তাহলে গোটা রাষ্ট্রই কোনো না কোনো সময় সংকটের মুখে পড়ে। যেমন এক সময় বাংলাদেশের মানুষ বাড়ির কাপড় শুকানো কিংবা দিয়াশরাইয়রে কাঠি বাঁচানোর জন্য সারাদিন গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখত। আর এখন কোনো কোনো এলাকায় জরুরি রান্না বান্না করার জন্যও ভালো ভাবে গ্যাস পাওয়া যায় না।

গণমাধ্যমের তথ্য মতে, গত দুই দশকে দেশে শিল্পোন্নয়ন ও বিদ্যুত্ উত্পাদনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও নিজস্ব জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা উল্টো কমেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জ্বালানির অপচয়। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, দক্ষতার ঘাটতি ও দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার জ্বালানি নষ্ট হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত ও দোকান-পাটে প্রতিদিন যে পরিমাণ অপ্রয়োজনীয় ডিভাইস চালানো হয়, তা যদি বন্ধ করা সম্ভব হতো, তাহলে আমাদের দেশের বিদ্যুত ও জ্বালানি খাত আরো শক্তিশালী হতো। 

একই আমরা প্রতিদিন যে পরিমাণ সময় নষ্ট করি, তা যদি রোধ করা যেত এবং সঠিক ভাবে ব্যবহূত হতো, তাহলে আমাদের ইহকাল-পরকাল আরো সুন্দর হতো। 

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, এমন দু’টি নিয়ামত আছে, যে দু’টোতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হচ্ছে, সুস্থতা আর অবসর। (বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)

একবার জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, পৃথিবীর মোট উত্পাদিত খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অপচয় হয়, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ১৩০ কোটি টন। অথচ অপচয় হওয়া বিপুল পরিমাণ এই খাবারের এক-চতুর্থাংশও যদি বাঁচানো যায়, তাহলে তা দিয়ে ৮৭ কোটি দুস্থ মানুষের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব, যা আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।

খাবারের অপচয়ও ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ। কেননা মহান আল্লাহ বলেছেন, হে আদাম সন্তান! প্রত্যেক সলাতের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ কর, আর খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)

এক কথায় বললে, অপচয় কেবল একটি খারাপ অভ্যাস নয়; এটি একটি ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতি, যা ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত সবকিছু গ্রাস করে। যদি আমরা ব্যক্তিজীবনে সংযম শিখি, তাহলে পরিবার ঠিক হবে; পরিবার ঠিক হলে সমাজ ঠিক হবে; আর সমাজ ঠিক হলে রাষ্ট্রও শক্তিশালী হবে।