নেকড়ের মুখোমুখী হয়ে ইসলামের পথে
মহানবী (সা.)-এর অন্যতম বীর সাহাবি সালামাহ (রা.)। উপনাম নিয়ে মতভেদ রয়েছে। যেমন— আবু ইয়াস (পুত্রের নামে), আবুমুসলিম, আবু আ-মির। পিতা : আমর ইবনে আকওয়া। দাদার দিকে সম্বন্ধ করে তাঁকে বলা হয় সালামাহ ইবনে আকওয়া। আকওয়া’র অপর নাম ‘সিনান ইবনে আব্দুল্লাহ’। সালামাহ (রা.) দৌড় ও তীর চালনায় তিনি সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে ছিলেন সুপ্রসিদ্ধ। (আল-ইসতিআব : ২/৬৩৯পৃ.; উসদুল গাবাহ ২/২৭১পৃ., ক্র.২১৫৪)
ইসলামগ্রহণ ও তার প্রেক্ষাপট
সালামাহ (রা.) ঠিক কোন সনে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তা সীরাতগ্রন্থে পরিষ্কারভাবে পাওয়া যায় না। তবে এতটুকু বলা যায় যে, তিনি ৬ষ্ঠ হিজরি সনের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন। ৬ষ্ঠ হিজরি সনে সংঘটিত বাইআতে রিযওয়ানে তিনি শরিক ছিলেন এবং একে একে তিনবার রাসুল (সা.)-এর হাতে বাইআত (শপথ) করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। প্রথমবার সবার সাথে, এর পর আরও দুই বার বিশেষভাবে প্রিয় নবী (সা.)-এর আহ্বানে। (উসদুল গাবাহ : ২/২৭১পৃ.; রিজালুন হাওলার রাসুল : ১/৪০৮পৃ.)
তাঁর ইসলামগ্রহণের কারণমূলে ইবনে ইসহাক্বসূত্রে একটি অভিনব ঘটনা বর্ণিত আছে। তা হলো— সালামাহ (রা.) বলেন, আমি একবার দেখতে পেলাম একটি নেকড়ে একটি হরিণকে দাঁত দ্বারা কামড়ে ধরেছে। হরিণটির প্রতি আমার দয়া হলো। তাই আমি সাহস করে এগিয়ে গেলাম এবং বাঘের মুখ থেকে হারিণটিকে কেড়ে নিলাম। নেকড়ে মুখ খুলে বলল, এই হরিণ তো তোমার সম্পদ না; এটা আল্লাহর সম্পদ, যা তিনি আমাকে রিজিকস্বরূপ দান করেছেন। তা কেড়ে নেওয়ার অধিকার কে দিয়েছে তোমাকে?
সালামাহ (রা.) বলেন, আমি চিত্কার দিয়ে বললাম, ওহে লোকসকল! কী আশ্চর্য! নেকড়ে কথা বলছে। এবার নেকড়ে বলল, এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে। এর চেয়েও আশ্চর্যের ব্যাপর হলো, আল্লাহর রাসুল তোমাদেরকে আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগীর দিকে ডাকছেন, আর তোমরা তা মানছ না। উল্টো মূর্তিপূজার দিকে ধাবিত হচ্ছ। এ ঘটনার পর আমি রাসুল (সা.)-এর খেদমতে হাজির হলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করলাম। এই নেকড়ে কে বা কী আল্লাহই ভালো জানেন। (আল-ইসতিআব : ২/৬৩৯পৃ.)
যুদ্ধ-জিহাদ
সালামাহ ইবনে আকওয়া (রা.) ইসলামগ্রহণের পর কাফিরদের সাথে সংঘটিত প্রায় সকল যুদ্ধে রাসুল (সা.)- এর সাথে শরিক ছিলেন। কোনো কোনো বর্ণনামতে তিনি সর্বমোট ১৪টি মতান্তরে ১৬টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সাতটি রাসুল (সা.)-এর সাথে অবশিষ্টগুলো রাসুল (সা.)-এর প্রেরিত বিভিন্ন অভিযানের কমান্ডারদের সাথে। অপর এক বর্ণনামতে ৯টি যায়েদ ইবনে হারেছার সাথে। (আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা : ৪/২২৮পৃ., ক্র.৪৯০; আল-ইসতিআব ২/৬৪০পৃ.)
বীরত্ব ও সাহসিকতা
পদাতিক বাহিনীর মধ্যে যারা তীর-বর্শা নিয়ে যুদ্ধ করতেন, তাদের মধ্যে সালামাহ (রা.) ছিলেন অন্যতম দক্ষ ও সুকৌশলী ব্যক্তি। দৌড়ার মধ্যে তিনি সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে ছিলেন সবার শীর্ষে। এমনকি অশ্বের চেয়েও দ্রুতগামী ছিলেন তিনি। একাধিক অভিযানে তিনি একাই বীরত্বের বিরল ইতিহাস রচনা করেছেন। সহযোগী কেউ আছে কি নেই, সেদিকে তিনি নজর দিতেন না। শত্রুপক্ষ একটা দল, আর তিনি একজন ব্যক্তি, একের পক্ষে একটা দলকে পরাস্ত করা কী করে সম্ভব! এ ধরনের ভাবনা বা বিস্ময় তাঁকে একটুও পরাভূত করত না।
হাদিস ও ইলমে ফিকহ
তাঁর থেকে ৭৭টি হাদিস বর্ণিত আছে। তম্মধ্যে বুখারী-মুসলিম যৌথভাবে ১৬টি এবং এককভাবে বুখারী ৫টি ও মুসলিম ৯টি বর্ণনা করেছেন। তিনি আবু বকর (রা.), উমার (রা.), উসমান (রা.) ও ত্বলহা (রা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। আর তাঁর থেকে যারা হাদিস বর্ণনা করেছেন তাঁরা হলেন— তাঁর পুত্র ইয়াস; ইয়াযিদ ইবনে উবাইদ, আব্দুর রহমান ইবনে আব্দুল্লাহ ও মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়্যাহ প্রমুখ। (আসহাবে রাসুলের জীবনকথা : ২/১৩৮পৃ.)
ইন্তেকাল
শেষ বয়সে মরুভূমি ‘রাবাযা’য় বেশ কিছুকাল কাটানোর পর হঠাত্ তাঁর মনের মধ্যে প্রবল ইচ্ছা জাগল মদিনা যাওয়ার। গেলেন মদিনায়। সেখানে দুই দিন থাকার পর তৃতীয় দিন ডাক এল মহান মালিকের পক্ষ থেকে ইহজগত ত্যাগ করে তাঁর সান্নিধ্যে যাওয়ার। এভাবে তিনি প্রিয় হাবিব (সা.)-এর ভূমিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এবং মদিনার পবিত্র মাটিতে অন্যান্য বন্ধুদের সাথে চির নিদ্রায় শায়িত হলেন। তখন কোন সন ছিল তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতভেদ রয়েছে। সর্বাধিক সঠিক মতানুযায়ী ৭৪ হিজরি সন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৮০ বছর। অনুরূপ বলেছেন ইবনে সাদ (রহ.), ইবনে আব্দুল বার (রহ.) ও ইবনে আছির (রহ.)। (রিজালুন হাওলার রাসুল : ১/৪১০পৃ.; আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা : ৪/২৩১পৃ.; আল-ইসতিআব : ২/৬৩৯পৃ., ক্র.১০১৬; উসদুল গাবাহ : ২/২৭১পৃ.)