শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

জনদুর্ভোগ: ঈমান, ধৈর্য ও নৈতিকতার পরীক্ষা

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 13 এপ্রিল 2026, 12:20 দুপুর • 94 বার পঠিত
জনদুর্ভোগ: ঈমান, ধৈর্য ও নৈতিকতার পরীক্ষা

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে গত কিছুদিন ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার খবর ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাব এসে পড়েছে আমাদের দেশেও। দেশের পেট্রল পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন, ভিড় ও বিশৃঙ্খলা।

যাদের তেলচালিত বাহন ব্যবহার করতে হয়, তাদের বাধ্য হয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েই তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু একটি দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা নয়, বরং একটু চিন্তা করলে বোঝা যায়, এটি আমাদের নৈতিকতা ও ঈমানের একটি পরীক্ষাও বটে। 

নিম্নে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কিছু উপায় তুলে ধরা হলো—

অনৈতিক মজুদ থেকে বিরত থাকা : দেশে তেল নিয়ে তীব্র তেলেসমাতি সৃষ্টির পেছনে যে কয়েকটি বিষয়কে দায়ী করা হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো, অনৈতিক ও অবৈধ মজুদদারি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরে দেখা যাচ্ছে, প্রায়ই বিভিন্ন অবৈধ মজুদদারিকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। জরিমানা করা হচ্ছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জনদুর্ভোগ তৈরি করার উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ করা ইসলামের দৃষ্টিতেও নিষিদ্ধ। মুসলিম শরীফের একটি হাদিসে আছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, গুদামজাতকারী ব্যক্তি পাপাচারী। (মুসলিম, হাদিস : ৪০১৪)

তাই একান্ত প্রয়োজন ছাড়া নিছক গুদামজাতের উদ্দেশ্যে তেলের লাইনে দাঁড়ানো উচিত নয়। 

গুজব না ছড়ানো : বিভিন্ন সময় তেলের পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা হতে দেখা যায়, এর পেছনে অনিয়মের পাশাপাশি গুজবও কাজ করে। মুমিনের জন্য যাচাই বাছাই ছাড়া কোনো খবর প্রচার করা উচিত নয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘সব শোনা কথা (যাচাই-বাছাই করা ছাড়া) বলা কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯২)

লাইনে দাঁড়ানোর আদব রক্ষা করা : কোনো সেবা গ্রহণের জন্য লাইনে দাঁড়ানোও একটি সামাজিক পরীক্ষা। লাইনে দাঁড়ানোর নৈতিকতা বজায় রাখাও এক ধরনের আমানত। যে আগে এসেছে, সে পাওয়াই ন্যায়সঙ্গত। এটা তার হক। যারা আল্লাহর ওপর ঈমান রাখে, তাদের উচিত, কোনো ছরচাতুরি করে এই হক নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা। হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেয়, সেদিন আসার আগে যেদিন তার কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না। সেদিন তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার জুলুমের পরিমাণ তার কাছ থেকে নেওয়া হবে আর তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ থেকে নিয়ে তা তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯) 

লাইনের ক্রমানুসারে রক্ষার ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর জীবনের একটি ঘটনায় সুন্দর শিক্ষা রয়েছে। সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর কাছে একটি পেয়ালা আনা হলো। তিনি তা থেকে পান করলেন। তখন তাঁর ডান দিকে ছিল একজন বয়ঃকনিষ্ঠ বালক আর বয়স্ক লোকেরা ছিলেন তাঁর বাম দিকে। তিনি বললেন, হে বালক! তুমি কি আমাকে অবশিষ্ট (পানিটুকু) বয়স্কদেরকে দেওয়ার অনুমতি দিবে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার কাছ থেকে ফজিলত পাওয়ার ব্যাপারে আমি আমার চেয়ে অন্য কাউকে প্রাধান্য দিব না। অতঃপর তিনি তা তাকে প্রদান করলেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৩৫১)

সুবহানাল্লাহ, মহানবী (সা.) কত সুন্দর ভাবে আমাদের জীবনের প্রতিটি বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষ হক রক্ষার ব্যাপারে সচেতন করেছেন। 

ধৈর্য ধারণ করা : লাইনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা অনেক কষ্টের। এ সময় বিরক্ত হয়ে অন্যের সঙ্গে রূঢ় আচরণ না করে আল্লাহর জন্য ধৈর্য ধারণ করাই মুমিনের করণীয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, মহান আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৩)

কাউকে কষ্ট না দেওয়া : লাইনে দাঁড়িয়ে ধাক্কা-ধাক্কি, চিৎকার চেঁমামেটি বা ঝগড়া করে অন্যকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। হাদিসে আছে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদে থাকে, সেই প্রকৃত মুসলিম। (তিরমিজি, হাদিস : ২৬২৭)

রাস্তার হক আদায় করা : আবু সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, তোমরা রাস্তার উপর বসা ছেড়ে দাও। লোকজন বলল, এ ছাড়া আমাদের কোনো পথ নেই। কেননা, এটাই আমাদের উঠাবসার জায়গা এবং আমরা এখানেই কথাবার্তা বলে থাকি। মহানবী (সা.) বলেন, যদি তোমাদের সেখানে বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করবে। তারা বলল, রাস্তার হক কি? তিনি (সা.) বললেন, দৃষ্টি অবনমিত রাখা, কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেওয়া, সত্কাজের আদেশ দেয়া এবং অন্যায় কাজে নিষেধ করা। (বুখারি, হাদিস : ২৪৬৫)

দুর্বলদের প্রতি সহানুভূতি : রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি সেবায় নিয়োজিত গাড়ি-মটর সাইকেল আরোহী বা অসুস্থ ব্যক্তির প্রতি নরম আচরণ করা। তাদের নিজের হক ছেড়ে দেওয়া ইহসানের অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ কর। (সুরা কাসাস, আয়াত : ৭৭)

মনে মনে জিকির করা : তেল নিতে গেলে অনেক সময় দীর্ঘ লাইনে থাকতে হয়। কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় বসে থাকতে হয়। এ সময়গুলো আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে কাটালে তা বরকতময় সময়ে পরিণত হতে পারে। হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে বুসর (রা.) হতে বর্ণিত, এ লোক বলল, হে আল্লাহর রাসুল! ... আমাকে এমন একটি বিষয় জানান, যা আমি শক্তভাবে আঁকড়ে থাকতে পারি। তিনি বললেন, সর্বদা তোমার জিহ্বা যেন আল্লাহ তাআলার জিকিরের দ্বারা সিক্ত থাকে। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৭৫)