ইসলামে ঐক্য শান্তি ও সংলাপ
ইসলামি জীবনবোধের সর্বত্র পারষ্পরিক পরামর্শ ও শান্তির অনুপ্রেরণা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে কোনো কাজে তোমরা পারষ্পরিক পরামর্শ করো।’ (সুরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৫৯)। পরামর্শ ও সংলাপ ইসলামের আদর্শ, পবিত্র কোরআনের দর্শন, ‘তাদের সব কাজ কর্ম নিজেদের পারষ্পরিক পরামর্শক্রমে সম্পন্ন হয়।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৩৮)। প্রিয়নবী (সা.) সবসময় পরামর্শের নীতি অবলম্বন করতেন। তাঁর নীতি ‘তিনজনের উপস্থিতিতে দু’জনে পারমর্শ না করা’ এমন আদর্শ ও সংলাপের পথই ইসলামের বৈশিষ্ট্য।
‘মুহাদাছাতুন’, ‘মুহাওয়ারাতুন’, ‘হিওয়ারুন’, ‘মুদাওয়ালাতুন’ শব্দের বাংলারূপ সংলাপ। সংলাপের সমার্থক পরামর্শ, মতবিনিময়, আলোচনা ইত্যাদির সমার্থক আরবি হলো—‘মাশাবিরাতুন’, ‘তাশাবুরুন’, ‘আল-মাশাবিরু’। মানব জীবনের নানান পটভূমিতে সংলাপ, ঐক্যের মাধ্যমেই হটকারীতা ও বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। মহান আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষ পাঠিয়েছেন তাঁর দাসত্ব ও আনুগত্য (ইবাদত) করবার জন্য, পারষ্পরিব বৈরিতার জন্য নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবলই আমার ইবাদতের জন্য।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৫৬)
জীবনের সবক্ষেত্রে জটিল সমস্যার সমাধান ও অজানা পথের সন্ধান মিলে সংলাপে। নেতৃত্ব নির্বাচনেও সংলাপের বিকল্প নেই। এজন্যই প্রিয়নবীর (সা.) ইন্তেকালের পর সাহাবিগণ পারষ্পরিক ঐক্য-সংলাপের মাধ্যমে যোগ্যতম ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেই (আবু বকর, রা.) খলিফা মনোনিত করে ছিলেন। কেননা, অযোগ্য নেতৃত্ব ইসলামি চেতনা পরিপন্থি। মহান আল্লাহর নির্দেশ, ‘আল্লাহ যে সম্পদকে তোমাদের অস্তিত্ব রক্ষার উপায় বানিয়ে দিয়েছেন, তা তোমরা অধম, অযোগ্য মূখের্র হাতে তুলে দিও না।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ০৫)।
আবার উচ্চাভিলাষী, পদলোভী নেতৃত্বও ইসলাম সমর্থন করে না। প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘অচিরেই তোমরা ইমারাত ও হুকুমাত লাভের জন্য অভিলাষী হবে...।’ (বুখারি)
ইবাদতমুখী সমাজ ও নেতৃত্বই পারে ঈমান-আমল ও হেদায়াতের আবহ তৈরী করতে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের মধ্য থেকে একদল নেতা সৃষ্টি করেছি, যারা আমার নির্দেশ মোতাবেক মানুষকে হেদায়াতের দিকে আহবান করবে।’ (সুরা সিজদা, আয়াত: ০২)
ইবাদতের চেতনায় মানব জীবনের সর্বত্র শান্তি, সদাচার ও সহাবস্থানের বিকাশ সাধন হলো, আল কোরআনের শিক্ষা- ‘এরাই তারা- আমি যদি এদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতায় বসাই, তাহলে এরা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, লোকদের ভালো কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৪১)।
অথচ ক্ষমতা, নেতৃত্ব ইত্যাদির দ্বন্দে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃংখলা দেখা দেয়— যা কাম্য নয় এবং তা ইসলামের পথও নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও মারাত্মক।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯১)
বরং জীবনের সবক্ষেত্রে সংঘাত ও বিপর্যয় মোকাবেলার উপায় হলো ঐক্যমত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে (বিধান ও রহমত) দৃঢ়তার সঙ্গে ধারণ করো, তোমরা পরষ্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেও না।’ (সুরা আল-ইমরান আয়াত: ১০৩)
মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যকে পবিত্র কোরআনে ‘বুনিয়ানুম মারসুস্’ বা ‘শীসা ঢালা প্রচীর’ বলা হয়েছে, আর হাদিসে এ চেতনাকেই ‘একদেহ’ ‘এক সৌধ’ ‘একই আদমের সন্তান’ তুল্য বলা হয়েছে। আবার ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্টীগত দ্বন্দ্বের কারণে বৃহত্তর ঐক্যের বিনাশ সাধন ইসলামের শিক্ষা নয়।
কাজেই, অনাচার অনৈক্য ও বিশৃ্ঙ্খলা পরিহার করে দেশের সেবা ও স্বার্থ সংরক্ষণ হোক আমাদের সংকল্প ও ইবাদতের প্রেরণা। প্রিয়নবী (স.) বলেন, ‘আমি নির্দেশ দিচ্ছি দলগত জীবন, নেতার আদেশ শ্রবণ ও আনুগত্যের...।’ (ভাবানুবাদ: তিরমিজি)।
আর এজন্যই সব বিভ্রান্তি ও সংকট সমাধানে সংলাপ, শান্তি ও ঐক্যের বিকল্প নেই। মহান আল্লাহর নির্দেশ—
‘তোমরা হয়ো না যেন তাদের মতো
নিজেদের মাঝে হলো যারা বিভক্ত।
স্পষ্ট প্রমাণ পেলো যদিও তারা
রহিয়াছে শাস্তি যেন তাদের ধরা’।
(কাব্যানুবাদ- সুরা আল-ইমরান, আয়াত: ১০৫)
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর ১৭৩০