ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ালেন কেন ট্রাম্প?
ইরান বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হবে—তা ঠিক করতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকালে হোয়াইট হাউসে তার জাতীয় নিরাপত্তা দলকে নিয়ে জরুরি এক বৈঠকে বসেছিলেন।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানে পরবর্তী দফার আলোচনায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সকে নিয়ে যেতে জয়েন্ট বেইজ অ্যান্ড্রুজে বসে আছে এয়ার ফোর্স টু। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন পড়ে আছে ধাঁধায়; কারণ- ইরানিরা একেবারেই নীরব।
দিন কয়েক আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে কিছু শর্ত পাঠিয়েছিল, যেগুলো পরবর্তী দফার আলোচনার আগেই ইরানিরা মেনে নেবে বলে আশা ছিল ওয়াশিংটনের।
কিন্তু দিনের পর দিন পেরোলেও তেহরানের কাছ থেকে কোনো জবাব না পাওয়ায় ভ্যান্স এবং অন্যরা ইসলামাবাদে মুখোমুখি বৈঠক থেকে আদৌ কতটুকু অর্জন করতে পারবেন তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় বলে বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত তিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প যখন ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, চেয়ারম্যান অব দ্য জয়েন্ট চিফস ড্যান কেইন ও সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের সঙ্গে বসেছিলেন, তখনও ইরানিরা ‘চুপ’।
ভ্যান্স এয়ার ফোর্স টু-তে ওঠার আগেই ইরানিদের কাছ থেকে কোনো না কোনো প্রতিক্রিয়া এনে দিতে মার্কিন কর্মকর্তারা তখন পাকিস্তানের মূল মধ্যস্থতাকারী ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে বারবার তাগাদা দিয়ে যাচ্ছেন।
অথচ, এর কয়েক ঘণ্টা পরও ‘কোনো উত্তর নেই’।
এতে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টাদের ধারণা জন্মাল, ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে মতভেদের কারণেই তারা তাদের দিক থেকে কোনো জবাব পাচ্ছেন না। অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের পাঠানো তারবার্তাও তাদের এ ধারণাকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছিল, বলছেন ওই তিন কর্মকর্তা।
মার্কিন প্রশাসন মনে করছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মজুদ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিষয়ে অবস্থান কি হবে বা এ নিয়ে আলোচকদের কতটুকু ক্ষমতা দেওয়া হবে তা নিয়ে ইরানি নেতৃত্ব ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও মজুদ ইউরেনিয়ামই অন্যতম প্রধান ইস্যু।
নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মুজতাবা খামেনি তার অধীনস্তদের স্পষ্ট নির্দেশনা দিচ্ছেন কিনা, নাকি আলোচকরা নির্দেশনা ছাড়াই সর্বোচ্চ নেতা কী চান, তা অনুমান করে কাজ করছেন—এ নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের।
লুকিয়ে থাকতে মুজতাবার যে চেষ্টা, তাও ইরানি সরকারের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে বলে মনে করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
এতসব বাধা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি আলোচকদের শিগগিরই বসার সম্ভাবনা রয়েছে, বলেছেন এক কর্মকর্তা।
তবে আদৌ তা হবে কিনা, হলেও কখন তা কল্পনা করাও মুশকিল।
ফের সামরিক হামলার পথে না গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা বাড়ানোর বিষয়ে মনস্থির করেন। তবে এবার আর তিনি কবে এ বিরতি শেষ হবে, তা ঠিক করে দেননি।
ইরানি সরকারি কর্মকর্তাদের ‘গুরুতর বিভক্ত’ আখ্যা দিয়ে মঙ্গলবার বিকালে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর কথা জানিয়ে ট্রুথ সোশালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্পকে এখনও যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানে বেশি আগ্রহী দেখা গেছে। দেশে-বিদেশে খুবই অজনপ্রিয় এ সংঘাত পুনরায় শুরু করার ব্যাপারেও তিনি সতর্ক, যে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে জিতে গেছে বলে তিনি সমানে দাবিও করে যাচ্ছেন।
কিন্তু এখন আলোচনা পুনরায় শুরু করতে না পারা মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য ব্যাপক অস্বস্তির। তিনি আবার এমন এক চুক্তি চাইছেন, যাতে তার অনেকগুলো দাবি পূরণও হয়।
এদিকে ইরান তার মুখের ওপর বলে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ না তুললে তেহরান নতুন দফার আলোচনায় বসবে না।
ট্রাম্প এ দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন।
“চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা প্রণালিটা খুলছি না,” মঙ্গলবার সকালে সিএনবিসি-কে এমনটাই বলেছিলেন তিনি।
মঙ্গলবার বিকালে ট্রাম্প এবং তার শীর্ষ উপদেষ্টারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এর মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাত্ত্বিকভাবে ইরানিদের খামেনির অনুমোদন নিয়ে একটি একক অবস্থানে আসার সুযোগ করে দিলেন; যদিও এমনটাই যে ঘটবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই বলে মনে করেন কর্মকর্তারা।
তারা বলছেন, ইরান আলোচনার টেবিলে ফিরতে প্রস্তুত এমন ইঙ্গিত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভ্যান্সসহ আলোচক দলের সফর দ্রুত আয়োজন করা সম্ভব।
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে উভয় দেশই যত দ্রুত সম্ভব একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী বলে বিশ্বাস ওই অঞ্চলের অনেক কর্মকর্তার।
ইরানকে আলোচনায় রাজি করাতে মঙ্গলবার দৌড়ঝাঁপ করা পাকিস্তানি কর্মকর্তারা একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতেও ট্রাম্পকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। তাতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আগে ট্রাম্প ‘ইরানের প্রস্তাব জমা পড়া ও আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত, তা সে সফল বা ব্যর্থ যাই হোক না কেন, যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর’ সিদ্ধান্ত নেন।
তাতেও ইরানি কর্মকর্তারা যে ‘আপ্লুত হয়েছেন’ তা মনে হচ্ছে না।
“ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর কোনো মানে নেই। পরাজিত পক্ষ শর্ত বেধে দিতে পারে না। অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে বোমাবর্ষণের কোনো পার্থক্যই নেই, এবং অবশ্যই একে সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে,” বলেছেন ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের কলিবফের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদী।
যুদ্ধবিরতি বহাল থাকছে—ট্রাম্পের এ ঘোষণার ভেতর দিয়ে অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা একটি দিনের পরিসমাপ্তি ঘটল। যার সূচনা হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের আরেক ঘোষণায়; যেখানে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানে খুব শিগগিরই ‘বোমা মারার প্রত্যাশা’ করছেন তিনি।
ইরানের ওপর থেকে চাপ সরিয়ে নিলে তারা আলোচনা দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পেতে পারে—নতুন কোনো সময়সীমা বেঁধে না দেওয়ায় উপদেষ্টারা ট্রাম্পকে এমন সতর্কবার্তাও দিয়েছেন বলে আলোচনা সম্বন্ধে অবগত একাধিক সূত্র সিএনএনকে বলেছে।
আলোচকরা আশা করছেন, তারা এ সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার রূপরেখা ঠিক করে ফেলতে পারবেন। সেটা হলে আসছে সপ্তাহগুলোতে চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে বলে আশা মার্কিন কর্মকর্তাদের।
যদিও অনেক সমালোচক মনে করছেন, সময়ক্ষেপণের কৌশল হিসেবে ইরানই আলোচনাকে টেনে লম্বা করতে চাইতে পারে, যেন যুদ্ধের সময় হামলায় মাটির নিচে চাপা পড়া ক্ষেপণাস্ত্রের সিংহভাগ তারা উদ্ধার করে পরবর্তী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
এদিকে আলোচনায় দুই পক্ষের একমত হওয়াও বেশ দুরূহ। ইরান ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে কিনা, এখনকার মজুদ কোথায় থাকবে, কী কী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে—এগুলো নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনও বিপরীত মেরুতে, বলছেন আলোচনা সম্বন্ধে অবগত কর্মকর্তারা।
নিজ নিজ শর্তে কে কতটা ছাড় দিতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন-তেহরানের কোনো চুক্তি আদৌ হবে কিনা।
ট্রাম্পের জন্য আরেক জটিলতা হল—তিনি এমন কোনো চুক্তিতে রাজি হতে পারবেন না, যা বারাক ওবামা আমলে স্বাক্ষরিত জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশনের (জেসিপিওএ) মতো দেখতে মনে হয়। ট্রাম্প নিজেই ২০১৮ সালে ওই চুক্তি থেকে বের হয়ে এসেছিলেন, এবং চুক্তিটি যে ‘দুর্বল’ ছিল তা বারবার বলে যাচ্ছেন।
গত কিছুদিন ধরে ট্রাম্পকে ‘একটি ভালো চুক্তি করার ব্যাপারে’ বেশ আত্মবিশ্বাসীও মনে হচ্ছিল। মঙ্গলবার তিনি এমন দাবিও করেছেন, যে তিনি প্রেসিডেন্ট থাকলে ‘ভিয়েতনামেও দ্রুত জয়ী হওয়া যেত’।
“আমার মনে হয়, আমরা শেষ পর্যন্ত একটি ভালো চুক্তি করতে যাচ্ছি। তাদের কোনো উপায় নেই বলেই মনে হয় আমার। আমরা তাদের নৌবাহিনী, বিমান বাহিনীকে শেষ করে দিয়েছি, তাদের নেতাদের সরিয়ে দিয়েছি, সত্যি বলতে কি এটা একরকম পরিস্থিতিকে আরও জটিলও করে দিয়েছে,” বলেছেন তিনি।
একই মার্কিন প্রেসিডেন্টই কয়েক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউসের স্টেট ডাইনিং রুমে কলেজের খেলোয়াড়দের পুরস্কৃত করার সময় দেওয়া বক্তৃতায় যুদ্ধ নিয়ে একেবারেই চুপ ছিলেন, যা একেবারেই তার স্বভাববিরুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট রুম ছেড়ে যাওয়ার আগে যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন করার চেষ্টা করা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যেও কেবল হাত নাড়তেই দেখা গেছে তাকে।